rabbhaban

জিকে শামীমে গ্রেপ্তারে অনিশ্চয়তায় নারায়ণগঞ্জ ৫০০ শয্যা!


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৩৫ পিএম, ০২ অক্টোবর ২০১৯, বুধবার
জিকে শামীমে গ্রেপ্তারে অনিশ্চয়তায় নারায়ণগঞ্জ ৫০০ শয্যা!

সদ্য গ্রেফতারকৃত টেন্ডার মুঘল খ্যাত যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ঠিকাদার জিকে শামীম ইস্যুতে অশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুর এলাকার ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করণ প্রকল্পের কাজ। জি কে শামীম গ্রেফতার এবং তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ হওয়ার পর থেকে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা যে ১২টি প্রকল্পের বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে তার মধ্যে এই প্রকল্পটিও রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরেই প্রকল্পটির কার্যক্রমে মন্থরগতি। যদিও গণপূর্ত নারায়ণগঞ্জ বিভাগের দাবি এই প্রকল্পে জিকে শামীমের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ছিল সহকারী ঠিকাদার। তার সঙ্গে এই প্রকল্পে গণপূর্তের কোন সম্পৃক্ততা নেই। তবে জিকে শামীমের সম্পৃক্ততা সরাসরি না থাকলেও সরকারের সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করছে প্রকল্পের অগ্রগতি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে জাপানের অর্থায়ন ও প্রযুক্তিতে নির্মিত হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ দুই’শ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল। এর পর সেটি বর্তমান সরকারের প্রথমদিকে ২০১৩ সালে তিনশ শয্যায় উন্নীত হয়। তিনশ শয্যায় উন্নীত হলেও দুই’শ শয্যার জনবল দিয়েই এতো দিন চলানো হয়েছে চিকিৎসা সেবা। এছাড়াও হাসপাতালে বর্তমানে বেড সংখ্যা রয়েছে ২৭১টি। তবে ২০১৭ সালের ২১ মার্চ একনেকের বৈঠকে খানপুর হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করতে ৯০ কোটি টাকার অর্থ বরাদ্দ অনুমোদন করেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২১ মার্চ একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালকে ৫০০ শয্যা হাসপাতালে রূপান্তরিত করণে আধুনিক ১৫ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পের কাজের অনুমোদন দেন। প্রথম ধাপে ১৫ তলা ফাউন্ডেশনে ভবনটি ৭তলা পর্যন্ত নির্মিত হবে। যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩০ কোটি টাকা। পরে হাসপাতালের উন্নয়নে ৭ তলা ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। ২০১৮ সালের মাঝামাঝিতে সরকারী অর্থায়নে শুরু হয়। নতুন ভবনের সঙ্গে সেবায় যুক্ত হবে রেডিওলজি, আইসিইউ, কার্ডিওলজি ও বার্ন ইউনিট। নির্মিত হতে যাওয়া নতুন ৭ তলা ভবনের নিচতলায় থাকবে গাড়ি পার্কিং, জরুরি বিভাগ, রেডিওলজি এবং সার্ভিস ব্লক, দ্বিতীয় তলায় কনসালন্টেন্ট প্যাথলজি, তৃতীয় তলায় প্রশাসনিক কার্যালয় ও প্যাথলজি, চতুর্থ তলায় অপারেশন থিয়েটার ও আইসিইউ, পঞ্চম তলায় কার্ডিওলজি ইউনিট, যষ্ঠ ও সপ্তম তলায় রোগীদের ওয়ার্ড, কেবিন, চিকিৎসকদের কক্ষ। এছাড়াও থাকবে মুমুর্ষ রোগী ও সাধারণ রোগীদের ব্যবহারের জন্য পৃথক লিফট। দ্বিতীয় ধাপে ভবনটি বাকি অংশ নির্মিত হলে সেখানে আরো অন্যান্য বিভাগ চালু করা হবে।

এদিকে নির্মাণ কাজ শুরুর এক বছর পেরিয়ে গেলেও অদ্যাবধি হাসপাতালটির নির্মাণ কাজের অগ্রগতি হতাশাজনক। পাইলিং এর কাজ শেষ হলেও অদ্যাবধি অবকাঠামো নির্মাণ শুরুই হয়নি।

এই ৩০০ শয্যা হাসপাতালকে ৫০০ শয্যা হাসপাতালে রূপান্তরিত করণ প্রকল্পটি কাগজে কলমে পেয়েছে ঢালি কনস্ট্রাকশনের মালিক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। তবে তার সহযোগী হিসেবে ছিলেন বর্তমানের আলোচিত ঠিকাদার জিকে শামীম। প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি হয়েছে ১৩ শতাংশ।

যে কারণে প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। কারণ জিকে শামীমের গণপূর্তের যে ১২টি প্রকল্পের বিষয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে এই নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যা হাসপাতালকে ৫০০ শয্যা হাসপাতালে রূপান্তরিত করণ প্রকল্পটিও রয়েছে। প্রকল্পটির কাজ এক বছরের অধিক সময় পূর্বে শুরু হলেও নির্মাণ কাজ চলেছে অনেক ধীরগতিতে। যে কারণে হাসপাতালটির কর্মকর্তা কর্মচারী ও রোগীদের দুর্ভোগের অন্ত নেই। এছাড়া বিগত দিনে ঠিকাদার জিকে শামীমের দাপটে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন হাসপাতালের সুপারকেও ঠিকমতো পাত্তা দিত না।

নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (সুপার) ডা. আবু জাহের জানান, সাধারণত যেকোন প্রকল্পের পরিচালক সাধারণত ওই বিভাগের একজন কর্মকর্তা থাকেন। তবে আমাদের এই হাসপাতাল ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণের প্রকল্প পরিচালক গণপূর্তের প্রকৌশলী। যে কারণে আমাদের সঙ্গে প্রকল্পের ঠিকাদারের সমন্বয় খুবই কম। এই প্রকল্পটি ঢালি কনস্ট্রাকশনের রফিকুল ইসলাম পেয়েছেন। তবে তার সঙ্গে জিকে শামীমের কোন সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা আমার জানা নেই। তবে প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ খুবই মন্থর গতিতে চলছে। যে কারণে নির্ধারিত সময়ে ভবনটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে কিনা সেটা নিয়ে আমরা অনিশ্চয়তায় আছি। আর জিকে শামীমের কারণে নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে গেলে রোগীরা অনেক দুর্ভোগে পড়বে।

নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যা হাসপাতালকে ৫০০ শয্যা হাসপাতালে রূপান্তরিত করণ প্রকল্পটির মূল ঠিকাদার ঢালি কনস্ট্রাকশনের প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। জিকে শামীমের জেকেবি কনস্ট্রাকশন ছিল সহযোগী লিফট পার্টনার। আমরা এ বিষয়ে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে সরকারকে অবহিত করেছি। এখন সরকার যেটা সিদ্ধান্ত নিবে সেটাই আমাদের সিদ্ধান্ত। প্রকল্পের ধীরগতির বিষয়ে তিনি জানান, প্রকল্পটির নকশার কিছুটা পরিবর্তন করতে হয়েছে। প্রকল্পে একটি র‌্যাম্প ছিল। কিন্তু জায়গার সঙ্কটের কারণে র‌্যাম্প দেয়া যাচ্ছিলনা। যে কারণে র‌্যাম্প চেঞ্জ করে সেটার স্থলে ৮টি লিফট লাগানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারী সিদ্ধান্ত হলে শীঘ্রই ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু হবে।

উল্লেখ্য সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জে আলোচিত কেন্দ্রীয় যুবলীগের কথিত নেতা ও জেলা আওয়ামীলীগের প্রস্তাবিত সহসভাপতি গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম এবং তার স্ত্রী ও মায়ের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে এনবিআর। ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক এই নির্দেশনা জারি করে। জি কে শামীমের তাঁর ব্যাংক হিসাবে ৩০০ কোটি টাকা আছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান এই তথ্য জানান। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়, জি কে শামীম, তাঁর স্ত্রী ও মা-বাবার নামে থাকা সব ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করতে হবে। এ-সংক্রান্ত সব তথ্য পাঁচ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে বলা হয়।

এস এম গোলাম কিবরিয়া ওরফে শামীম নিজের নাম সংক্ষেপ করে বলতেন জি কে শামীম। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জি কে বিল্ডার্সের মালিক তিনি। জি কে শামীম নিজেকে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক বলে পরিচয় দিতেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের প্রস্তাবিত সহসভাপতি ছিলেন। জিকে শামীমের বাড়ি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায়।

গত ২০ সেপ্টেম্বর র‍্যাব সদস্যরা জি কে শামীমের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে হানা দিয়ে তাঁকে ও তাঁর সাত দেহরক্ষীকে গ্রেপ্তার করেন। এরপর সেখান থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) কাগজপত্র (তাঁর মায়ের নামে ১৪০ কোটি), ৯ হাজার ইউএস ডলার, ৭৫২ সিঙ্গাপুরি ডলার, একটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং মদের বোতল জব্দ করে র‍্যাব। অস্ত্র ও মাদক মামলায় জি কে শামীমকে গ্রেফতারের পরে রিমান্ডে নেয়ার পর থেকে তোলপাড় শুরু হয়। বেরিয়ে আসতে থাকে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর