rabbhaban

খোলা আকাশের নিচে হাসপাতালের মেডিক্যাল বর্জ্যে ঝুঁকিতে নগরবাসী


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:১০ পিএম, ৩০ অক্টোবর ২০১৯, বুধবার
খোলা আকাশের নিচে হাসপাতালের মেডিক্যাল বর্জ্যে ঝুঁকিতে নগরবাসী

মানুষের জন্য সব থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে মেডিক্যাল তথা বিভিন্ন হাসপাতালের বর্জ্য। যে কারণে ২০০৮ সালে রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য শহরে হাসপাতাল বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় হাসপাতাল বর্জ্য বিধিমালা তৈরি করে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোন উদ্যোগ না থাকায় বিধিমালাটি বাস্তব রূপ পায়নি। ফলে নারায়ণগঞ্জে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো যত্রতত্র ফেলছে জনস্বাস্থ্যের জন্য অতি ঝুঁকিপূর্ণ মেডিক্যাল বর্জ্য। আর এ ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি এগিয়ে আছে নারায়ণগঞ্জের সরকারি হাসপাতাল দুইটি।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের দেওয়া তথ্য মতে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আওতায় সিদ্ধিরগঞ্জে হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার মোট ৪০টি, সদরে বন্দরে ৬টি এবং সদরে ৫৫টি লিপিবদ্ধ আছে আরো কয়েকটি লিপিবদ্ধ করার জন্য আবেদন জমা পরেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০০টির উপরে সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক স্টেন্টার রয়েছে শুধু নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আওতায়।

শুরুতে এসব ক্লিনিকের মেডিক্যাল বর্জ্য অপসারণের জন্য গৃহস্থলির বর্জ্য অপসারণের কাজে নিয়োজিত দুটি এনজিওকে দেওয়া হয়। যেখানে শর্ত দেওয়া হয়েছিল যাতে এই বর্জ্যগুলো যথাযথ সুরক্ষিতভাবে অপসারণ করা হয়। এবং এগুলো ধ্বংস করার জন্য আলাদাভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু তাঁরা এই শর্তপূরণে ব্যর্থ হলে সিটি কর্পোরেশন মেডিক্যাল বর্জ্য অপসারণের সাথে যুক্ত প্রিজম বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের সাথে চুক্তি করে। যারা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মেডিক্যাল বর্জ্য অপসারণ করে। একই সাথে ক্লিনিকগুলোর প্রিজমের সাথে চুক্তি বাধ্যতামূলক করে নাসিক।

কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আওতাভুক্ত ১০১টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ৮৬টি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান প্রিজমের সাথে চুক্তিবদ্ধ আছে এবং বাকিগুলো এখনো নিজেদের মত করে বর্জ্য অপসারণ করছে। আর এসবের মধ্যেই রয়েছে নারায়ণগঞ্জের সরকারি দুই হাসপাতাল ৩০০শয্যা বিশিষ্ট খানপুর হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতাল। এই দুইটি হাসপাতালেই লক্ষ্য করা হয়েছে সব থেকে বেশি অব্যবস্থাপনা।

সরেজমিনে সরকারি হাসপাতাল দুটি (৩০০ শয্যা ও ১০০ শয্যা) ঘুরে দেখা গেছে ভয়াবহ এক চিত্র। খানপুর ৩০০শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে মেডিক্যাল বর্জ্য সহ গৃহস্থলি অন্যান্য বর্জ্য হাসপাতালের বর্হিবিভাগের সামনে ইটের দেয়াল ঘেরা ফাঁকা জায়গায় খোলাভাবে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্যরে ভেতর রয়েছে, সিরিঞ্জ, সূচ, রক্ত, পুঁজযুক্ত তুলা, টিউমার, ব্যান্ডেজ-গজ, হ্যান্ডগ্ল­াভস, ওষুধ ‍ও ওষুধের বোতল-শিশি, ব্লাড ব্যাগ, স্যালাইন ব্যাগ সহ বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য। আর এভাবে খোলা জায়গায় এসব বর্জ্য ফেলায় যক্ষ্মা, চর্মরোগসহ নানা সংক্রামক রোগে ভুগছে মানুষ। পাশাপাশি ডিপথেরিয়া, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইসিস সি এবং এইডসের ঝুঁকিতেও পড়ছে।

৩০০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু জাহের নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম বলেন, যেকোন ময়লা আবর্জনাই জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। আর সেটা মেডিকেল বর্জ্য হলে আরো বেশি হুমকি। জায়গা না থাকায় এভাবে ফেলতে হয়। কিন্তু সিটি করপোরেশনকে আমরা জানিয়েছি যাতে এখান থেকে পরিস্কার পরিচ্ছন্নভাবে ময়লা আবর্জনা নেয়। কিন্তু তারা সেটা নেয় না। যার জন্য ময়লা আবর্জনা পড়ে থাকে। তবে আমাদের নতুন ভবনের কাজ শেষ হলে এ বিষয়ে আমরা আলাদা ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

আরোও ভয়াবহ অবস্থা ১০০ শয্যা বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায়। সেখানে ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। অন্যান্য বর্জ্যরে সাথে হাসপাতালের মেডিক্যাল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে হাসপাতালের সামনের সড়কের উপরে। নিয়মিত সড়ক দিয়ে মানুষের যাতায়াত হওয়ায় মরণব্যাধি সব সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। যদিও নীতিমালায় উল্লেখ আছে গৃহস্থলির বর্জ্য ও মেডিক্যাল বর্জ্য আলাদা করে সুরক্ষিত জায়গায় ফেলতে হবে। এবং মেডিক্যাল বর্জ্য কোথাও না ফেলে সেগুলো ধ্বংস করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার আসাদুজ্জামান নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘‘মেডিক্যাল বর্জ্য ফেলার জন্য আমাদের নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। সব ময়লা হাসপাতালের সামনে রাস্তার উপর ফেলে আসি। সেখান থেকে সিটি কর্পোরেশন নিয়ে যায়।’’

হাসপাতালের মেডিক্যাল বর্জ্য সিটি কর্পোরেশন নেয় না জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরশনের মেডিক্যাল অফিসার শেখ মোস্তফা আলী নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘‘মেডিক্যাল বর্জ্য নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের না। শুধুমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় আমরা সরকারি হাসপাতাল দুইটির অন্যান্য বর্জ্য (খাবারের উচ্ছিষ্ট ও এরকম আবর্জনা) সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা নিয়ে আসে। কিন্তু আমরা মেডিক্যাল বর্জ্য নিয়ে আসি না।’’

তিনি আরো বলেন, এই দায়িত্ব সম্পূর্ণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। আমরা প্রিজমের সাথে চুক্তি করার জন্য বলেছি। চুক্তির পর প্রিজম থেকে ময়লা নেওয়া হবে।

প্রিজম বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘‘নারায়ণগঞ্জের বেশিরভাগ হাসপাতাল, ক্লিনিক আমাদের সাথে চুক্তি করলেও সরকারি দুই হাসপাতাল সহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আমাদের সাথে চুক্তি করেনি। আমরা তাদের সাথে প্রতিনিয়ত কথা বলছি। প্রায় এক মাস আগে সরকারি দুই হাসপাতালে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। যদি কেউ আমাদের সাথে চুক্তি করতে চায় তাহলে আমরা অতিদ্রুত সেসব জায়গা থেকে মেডিক্যাল বর্জ্য সংগ্রহ শুরু করব।’’

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর