rabbhaban

১৪১ দিনের কারাভোগে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে ছাত্রদল সভাপতি


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৫:৩০ পিএম, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, শুক্রবার
১৪১ দিনের কারাভোগে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে ছাত্রদল সভাপতি

নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মশিউর রহমান রনি দীর্ঘ ১৪১ দিন কারাভোগ করে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে মুক্ত হয়েছেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। দীর্ঘ এই কারাবাসের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন নিউজ নারায়ণগঞ্জের প্রতিবেদকের কাছে। নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে এই কারাবাস আরও সমৃদ্ধ করেছে বলেও অভিহিত করেন তিনি।

গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ফতুল্ল­ার দাপা ইদ্রাকপুর এলাকার সাহারা সিটির মাঠ থেকে পুলিশ রনিকে অস্ত্র সহ উদ্ধার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করে। গ্রেফতারের ২দিন আগে থেকেই ঢাকা হতে নিখোঁজ ছিল রনি।

মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথেই যোগাযোগ করেছেন দলীয় বিভিন্ন নেতাকর্মীদের সাথে। বিএনপি ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা পেয়েছেন প্রচুর। কারাবাসের দিনগুলোতে দলের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিয়ে একই সাথে কৃতজ্ঞতা ও লিয়াজোকারীদের চিনতে পেরেছেন।

১৪১ দিনের সংক্ষিপ্ত অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে নিউজ নারায়ণগঞ্জকে রনি বলেন, ‘আদালতে উঠার সময়েই আমি ছিলাম প্রচন্ড আহত। মানসিক শারীরিক ভাবে এতটাই বির্ধ্বস্ত ছিলাম যে আমার চলার শক্তি ছিল না। তারপরেও আমাকে ৩দফায় রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। আর রিমান্ডে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সাথে কেমন আচরণ করা হয় সেটা আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। আপনারা সবই জানেন।’

রনি বলেন, ‘কারাগারে নিয়েই আমাকে রাখা হয় ফাঁসির আসামীদের কনডেম সেলে। আমি বের হতে পারতাম না। কারো সাথে কথা বলতে পারতাম না। টানা রিমান্ড আর আদালতে প্রেরণের আগের ঘটনায় এতটা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিলাম যে আমাকে প্রথম দেখায় কারারক্ষী থেকে শুরু করে সকলেই পাগল বলতো। আমার আচরণে অনেক পরিবর্তন এসেছিলো। কারও সাথে কথা বলতে পারিনি ২০/২৫ দিন। নিজেকে মনে হয়েছে যেন আমি পাগল আর আমাকে খাঁচায় পুরে রাখা হয়েছে।’

‘‘প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আমাকে দেখতে সেলের সামনে ভীড় করতো। চিড়িয়াখানায় যেমন মানুষ বাঘ-সিংহ দেখতে যায় তেমনই প্রতিটি নতুন আসামী এসেই দেখতে আসতো রনি ছেলেটা কে? এরপর জেল সুপার আমাকে অনুরোধ করলে আমি সবাইকে একদিন ডেকে বক্তব্য দেই। সেদিন আমার ডাকে প্রায় দুই আড়াইশ মানুষ জড়ো হয়েছিলো। তাদের সাথে কথা বলে বুঝানোর চেষ্টা করি যাতে আমার সেলে ভীড় যাতে না করে। তবে জামিন সংক্রান্ত কোন সমস্যা থাকলে তারা আমাকে যেন জানায়। আমি অনেক ছাত্রদল নেতাকর্মীদের জামিন করিয়েছি।’’ কারাগারের বন্দীদশায় বর্ণনায় বলেন রনি।

তিনি আরো বলেন, ‘এর মাঝে সাখাওয়াত হোসেন খান, মামুন মাহমুদ, মাইনুদ্দিন সাহেবের আগমনের পর অনেকটা একাকিত্ব কেটে যায়। একসাথে নামাজ পড়া হতো। মাইনুদ্দিন সাহেব নামাজ পড়াতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর কখনও সাখাওয়াত ভাই আবার কখনও মামুন ভাই পড়াতেন। তখন একত্রে থাকায় দলের সাংগঠনিক শিক্ষা পেয়েছিলাম। এছাড়া শিমুল বিশ্বাসের সাথে সাক্ষাতেও অনেক আলাপ আলোচনা হয়েছে সকলের সাথে।

কারাবাসের দিনগুলিতে অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে রনি বলেন, ‘অসুস্থ হয়ে পড়লেও খুব একটা সেবা পেতাম না। ৭খুনের আসামীরা প্রায়শই মন্তব্য করতো। এছাড়া সার্বক্ষনিক আটক থাকায় মানসিক ভাবে কষ্টে থাকতাম। অনেক নেতাকর্মী এসে বলতো তাদের আজাদ বিশ্বাস, আজহারুল ইসলাম মান্নান জামিন করানোর কথা। কিন্তু জামিন করছেনা। তাদের আমি জামিনের ব্যবস্থা করেছি। কর্মীদের প্রতি নেতাদের এমন আচরণ কষ্ট দিয়েছে অনেক।’

এর আগে রনি গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘১৫ সেপ্টেম্বর আমি রাজধানীর আরামবাগে অবস্থান করছিলাম। মাগরিবের একটু পরে পরিচিত এক ব্যক্তির বাসার দিকে যাওয়ার জন্য বের হলে ফতুল্ল­া থানার এসআই তারেক পরিচয়ে একজন আমার নাম ধরে ডাক দেয়। একই সাথে সেখানে এসআই এনামুল পরিচয়ে আমাকে আটক করে। তাদের সাথে থাকা সোর্সের সহায়তায় আমাকে মাইক্রোবাসে তোলে। এসময় পল্টন থানার পুলিশ টিম দেখতে পেলে তারা আমার পরিচয় ও নিজেদের সাথে আলাপ করে দ্রুত সটকে পড়ে।’’

রনি বলেন, ‘গাড়িতে উঠার পরেই আমার চোখ বেঁধে ফেলা হয়। সেখান থেকে সোজা নিয়ে যাওয়া হয় কোন একটি থানায়। গাড়িতে বসিয়ে রেখে পুলিশ সদস্যরা চলে যায়। রাত ১১দিকে আমাকে ফতুল্ল­া থানায় প্রবেশ করে ভেতরের একটি কক্ষে বসানো হয়। পড়ানো হয় কালো কাপড়, যা অনেকটা বোরখার মত। কিন্তু আমি থানায় কোন পরিচিত পুলিশদের দেখতে পাইনি। বিশালদেহী কয়েকজন এসে আমাকে অশ্রাব্য গালিগালাজ ও নির্যাতন করে। চলতে থাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। খাবার দেয়া হয় খুবই সামান্য। প্রচুর ভয়ভীতি আর নির্যাতন করে অসুস্থ করে ফেলা হয়। সারারাত দুইহাত পেছনে রেখে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাখা হয়। মশার কামড়ে দুই হাতে শত শত ফুটো তৈরী হয়। সারারাত আমি চোখের পানি ফেলতে থাকি।’

ঘটনার বর্ণনায় কিছুটা আবেগ আপ্লুত হয়ে রনি বলেন, ‘পরদিন সকালে একইভাবে আমাকে কক্ষে বন্দি রাখা হয়। তীব্র পানির তৃষ্ণায় অর্ধমৃত হয়ে পরি। এরপর পানি ও খাবার দিলে একজন নারী পুলিশ আমাকে দেখে চিৎকার করে বলে একে এমন অমানবিক ভাবে কেন রাখা হয়েছে? ৯০ টাকার খাবার প্রতিদিন তার প্রাপ্য কিন্তু এখানে কেন নোংরা খাবার দেয়া হয়েছে? এরপর তিনি চলে যান। সেদিনও আমাকে আদালতে চালান দেয়া হয়নি। ভেবে নিয়েছিলাম তাহলে হয়ত আমি আর বেঁচে ফিরবো না। আমাকে বার বার এসে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে চলে যেত আর আমি আতংকে ভীত হয়ে থাকতাম। এক মুহূর্ত ঘুমাতে পারিনি, প্রতি মুহূর্তে আল্ল­াহকে স্মরণ করতাম।’

পরদিন ১৭ তারিখ সকালে আমার চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। বলা হয় র‍্যাব-১১ তে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর চোখ খুলে দেখি ফতুল্লার দাপা সাহারা সিটির মাঠে আমি দাঁড়িয়ে আছি। কিছুক্ষন অবস্থান করে আবার গাড়িতে করে ফতুল্লা থানায় নিয়ে আসা হয়। জানতে পারি অস্ত্র মামলা দেয়া হয়েছে আমার বিরুদ্ধে। সেই মুহূর্তে আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন বলে।

তবে ১৭ সেপ্টেম্বর ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মঞ্জুর কাদের দুইদিন আগে রনিকে গ্রেপ্তার ও আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি সেদিন জানান, সেদিন সকাল ৬টায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রনিকে ফতুল্লার দাপা ইদ্রাকপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ওই সময়ে রনির কাছ থেকে একটি বিদেশী তৈরি পিস্তল ও ৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

ওই সময়ে রনির ছোট ভাই মহিবুর রহমান রানা জানান, রনি গত ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় পারিবারিক কাজে ঢাকা যায়। আর রাত পর্যন্ত ফিরে আসেনি। তবে রাত সাড়ে ১০টায় অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ঢাকা থেকে টেলিফোনে জানায় যে একটি কালো মাইক্রোবাসে করে কয়েকজন সাদা পোষাকধারী নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয়ে রনিকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। এর পর থেকে নিখোঁজ ছিল রনি। তবে প্রশাসন যেসব অভিযোগ করছে সেগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট। কারণ আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে থানায় একটিও ব্যক্তিগত কোন অভিযোগ নেই। যেসব অভিযোগে মামলা হয়েছে সবই রাজনৈতিক কর্মকান্ড করতে গিয়ে হয়েছে। শনিবার রাতে আটক করার পর নাটক সাজাতে একদিন পর গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

মামলার এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে, এসআই শাফিউল ইসলাম সঙ্গীয় ফোর্স এসআই তাজুল ইসলাম, রোকনুজ্জামান ও শফিকুল ইসলামকে নিয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে ফতুল্লা থানাধীন বিভিন্ন এলাকায় মাদক দ্রব্য উদ্ধার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছিলেন। এমন সময় আলীগঞ্জ এলাকায় অবস্থানকালে আনুমানিক ১৭ সেপ্টেম্বর ভোর পৌনে ৫ টায় তাদের কাছে একটি গোপন খবর আসে। তারা জানতে পারেন দাপা ইদ্রাকপুর এলাকার শাহারা সিটি বালুর মাঠে আরিয়ান গ্রুপের জমিতে কেউ অস্ত্রসহ অবস্থান করছে। তথ্যটির সত্যতা যাচাই করতে ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে তারা ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়ে আনুমানিক ভোর ৫ টায় সেখানে উপস্থিত হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অস্ত্রধারী পালানোর চেষ্টা করে। এসময় সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে তারা আসামীকে আটক করতে সফল হন। জিজ্ঞাসাবাদের পর নাম পরিচয় জানতে পারেন তারা। এ সময় সাক্ষী মোঃ সাইফুল ইসলাম খোকন, মোঃ ইমদাদুল হক স্বপন ও রোকনুজ্জামানের মাধ্যমে মশিউর রহমান রনির দেহ তল্লাশী করা হয়। তল্লাশীর সময় তার জিন্সের প্যান্টে কোমরের পিছনের দিকে ডান পাশে গুঁজে রাখা অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। অস্ত্র সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে সে সন্দেহজনক উল্টাপাল্টা কথা বলতে থাকে। এরপর উপস্থিত স্বাক্ষীদের স্বাক্ষর নিয়ে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়।

১৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে রনিকে নারায়ণগঞ্জের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে কথা জানান আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খানের কাছে। সাখাওয়াত বর্তমানে মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি ও আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি। এর আগেরদিন নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে রনির সন্ধান চেয়ে সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন সাখাওয়াত।

সাখাওয়াত বলেন, ‘রনিকে আদালতে আনার পর আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। সে দুইদিনের ঘটনা আমাকে বর্ণনা করেছেন। রনি জানিয়েছেন গত ১৫ তারিখ ঢাকার আরামবাগ থেকে ৭ থেকে ৮জন ডিবি সদস্য পরিচয়ে তাকে আটক করা হয়। তাদের পাশে থাকা একটি মাইক্রোবাসে উঠেই তার হাত, পা এবং চোখ বেঁধে ফেলে ডিবির পরিচয় দানকারী সদস্যরা। আটকের পর ২দিন ধরে তাকে সীমিত পরিমাণ খাবার সরবরাহ করা হত। এছাড়া ছাত্রদলের সাথে জড়িত থাকা এবং সরকার ও তার নেতাদের বিরুদ্ধে কথা বলার অপরাধে ব্যাপক নির্যাতন করা হয় বলেও জানান।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর