তিন দাপুটে নারী ইউএনও (ভিডিও সহ)


হাফসা আক্তার, স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১২:২৯ এএম, ০৮ মার্চ ২০২০, রবিবার
তিন দাপুটে নারী ইউএনও (ভিডিও সহ)

পাঁচটি উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ জেলায় তিনটি উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে বেশ দাপটের সহকারে সামলাচ্ছেন তিনজন নারী। তাঁদের কেউ কেউ এর আগেও নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। নারী হলেও ইউএনও’র মত গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রশাসন সামলাতে গিয়ে  ভয়-ভীতি আর প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তাঁরা একের পর এক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। নারী হয়েও শক্ত ঝান্ডায় একের পর এক অভিযান চালিয়ে সমাজে শুদ্ধতা আনার চেষ্টা করছেন। ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসে তাঁদেরকে নিয়ে নিউজ নারায়ণগঞ্জের বিশেষ প্রতিনিধি হাফসা আক্তারের বিশেষ প্রতিবেদন।


নারী কাজ করে যত্ন আবেগ ভালোবাসায় : সদর ইউএনও

‘নারীর সৌন্দর্য তার রূপে নয়, বরং তার কাজে।’ এমনটাই মনে করেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা বারিক। এক কন্যা সন্তানের মা হিসেবে নিজেকে গর্বিত মা বলে উল্লেখ করেন তিনি।

৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষ্যে কথা হয় নাহিদা বারিকের সঙ্গে। তাঁর কথায় উঠে আসে এ পর্যন্ত উঠে আসার সেই পেছনের অজানা কাহিনী, বর্তমান অবস্থান থেকে সবকিছু।

২০০৭ সালে ব্যবসায়ী স্বদেশ সাহাকে বিয়ে করার পর স্বামীর ব্যবসার সাথে যুক্ত হন তিনি। এভাবেই তার কর্মজীবনের শুরু। পাশাপাশি স্বামীর সহায়তায় বিসিএসের জন্যও তিনি প্রস্তুতি নেন। পরবর্তীতে ২০১১ সালে বরিশাল ডিসি অফিসে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পদে প্রথম সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন ২৯ তম ব্যাচের এ বিসিএস ক্যাডার।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?
নাহিদা বারিক : অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নকে আমি ৩ ভাগে ভাগ করবো। নারীকে অর্থনৈতিক মূলধারায় অংশগ্রহণ করতে হবে। সামাজিক ক্ষমতায়নের কথা বলতে গেলে নারীর অধিকার ভোগের কথা শুরুতে আসে। আর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বলতে আমরা যা বুঝে থাকি তা হলো রাজনীতিতে নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহন এবং রাজনৈতিক চর্চা করা। আর আমাদের দেশে যে তা খুব সফলভাবেই হচ্ছে তা আমরা সকলেই জানি। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পিকার একজন নারী।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : বর্তমান প্রেক্ষিতে নারী ক্ষমতায়নের যে চিত্র রয়েছে, সে চিত্রকে আপনি কতটা সন্তোষজনক বলে মনে করেন?
নাহিদা বারিক : নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট যদি চিন্তা করি তবে বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। তা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হোক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হোক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার জ্বলন্ত প্রমান। তিনি বিশ্বের অনেক নারীর জন্যই রোল মডেল। তবে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাও রয়েছে, যেখানে নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এ ঘটনার সাথে শিক্ষ জরিত, সমাজের বিভিন্ন দিক জরিত। যতদিন পর্যন্ত না আমরা সমাজের সকল মানুষকে শিক্ষার মধ্যে নিয়ে আসতে না পারবো। সকলের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারবো, ততদিন শতভাগ নারী ক্ষমতায়ন সফল আমি বলবো না।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : সদর উপজেলায় পরপর তিনজন নির্বাহী কর্মকর্তাই নারী। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?
নাহিদা বারিক : বিষয়টিকে আমি উপজেলার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখি। কারণ একজন পুরুষ যখন কাজ করে তা শুধু কাজ হিসেবেই করে। কিন্তু একজন নারী যখন কোনো কাজ করে তা আবেগ এবং ভালোবাসা দিয়ে যতেœর সাথে করে। আর এ বিষয়টি নারী ক্ষমতায়নের প্রতিক হিসেবেও দেখছি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু কর্মপরিবেশ কতটা নারীবান্ধব?
নাহিদা বারিক : বর্তমানে কর্মপরিবেশ অনেকাংশেই নারীবান্ধব বলে আমি মনে করি। কারণ, বর্তমানে স্বামী-স্ত্রী দুজনই যেকানে সরকারি চাকরিজীবি, সেখানে তাদের কাছাকাছি পোস্টিং দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ৬ মাসের মাতৃত্বকালিন ছুটির ব্যবস্থা করা হয়। অন্যদিকে বর্তমান সরকার কর্মস্থলগুলোতে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার এবং ডে কেয়ারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছে। যা বাস্তবায়নের জন্য কার হচ্ছে। আশা করি খুব শীঘ্রই কর্মপরিবেশ শতভাগ নারীবান্ধব হিসেবে বাস্তবায়িত হবে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : একদিকে নারীর ক্ষমতায়ন যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে নারী নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। এ বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?
নাহিদা বারিক : এটা খুবই দুঃখজনক যে এ সময়ে এসেও নারী নির্যাতন বাড়ছে। আমরা দেখছি যে যৌন হয়রানির বিষয়টি উঠে এসেছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এ ঘটনা দেখা যায়। এ ঘটনায় নির্যাতিত এবং নির্যাতনকারী উভয়ের পরিবারও অনেকাংশে ভূমিকা পালন করে। কেননা, আমারও দায়িত্ব আমার সন্তান কিভাবে মানুষ হচ্ছে সে বিষয়ে খেয়াল রাখা। শুধুমাত্র সমাজের দোষ দিয়েই একটি সন্তান একদিনে মাদকাসক্ত বা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পরছে না। একটি পরিবার থেকেই প্রাথমিক নৈতিক শিক্ষাদান আবশ্যক। বিচ্ছিন্ন যে ঘটনা ঘটছে সে বিষয়ে আমি বলবো, পরিবার এবং সমাজের উভয়েরই প্রয়োজন নিজেদের সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা। এবং পরিবার থেকেই সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আমাদের সমাজে গৃহিনীদের ভূমিকা নিয়ে আপনার অভিমত কি?
নাহিদা বারিক : আমাদের সমাজে গৃহিনীদের ভূমিকা অসামান্য। আমরা যারা বাইরে কাজ করি, তারা পরিবারের পাশাপাশি নিজেদের জন্যও কাজ করি। আমরা বাইরে কাজ করার জন্য পারিশ্রমিক পাই। তবে গৃহিনীরা তাদের সম্পূর্ন সময় পরিবারকে দিলেও অর্থদন্ডে তাদের শ্রমের মূল্যায়ন করা হয়না। যেমন আমার মা তার পাঁচ সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে কখনো নিজের জন্য কিছু করতে পারেনি। আমরা পাঁচ ভাই-বোন আজ শুধুমাত্র তার জন্যই নারী বা পুরুষ নয়, মানুষ হয়েছি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারী উন্নয়নে পুরুষের ভূমিকা কতটুকু?
নাহিদা বারিক : নারী উন্নয়নে পুরুষের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ন। কারণ, ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি আমার সরকারি কর্মকর্তা বাবা পরিবারে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ না করে আমার গৃহিনী মাকে পরিবারে সহায়তা করেছে এবং সম্মান করেছে। যে পুরুষটির সঙ্গে আমি সংসার করছি, সে একজন ব্যস্ত ব্যবসায়ি হয়েও সব সময় আমার অনুভূতির সম্মান করেছে। সে আমার প্রত্যেকটি পদক্ষেপে পাশে থেকেছে। ফলে আমি বলবো, পুরুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা ছাড়া নারী উন্নয়ন সম্ভব নয়।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : সমাজে যেসব নারীরা এখনো সমাজে এগিয়ে আসতে ভয় পায়, তাদের উদ্যেশ্যে আপনি কি কোনো বার্তা দিতে চান?
নাহিদা বারিক : আমি বলতে চাই, আপনি আপনাকে তুলে ধরুন। নারীর প্রশ্ন আসলেই আমরা দেখি সবার আগে সৌন্দর্যের প্রশ্ন আসে। তবে সে সৌন্দর্য বাহ্যিক নয়, কাজে থাকতে হবে। আপনাকে কাজের মধ্যে নিজের সৌন্দর্য তুলে ধরতে হবে। আপনাকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, আপনি নারীর আগে একজন মানুষ। আমার নিজেরও একটি কন্যা রুশদা নুব্হা ভাষা। তাকে আমি মানুষ হিসেবে বড় করতে চাই। তাকে বলবো; নারী নয়, মানুষ হও। আমি গর্বিত, কারণ আমি এক কন্যা সন্তানের মা।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আপনার উপজেলায় নারী উন্নয়ন বিষয়ক কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।
নাহিদা বারিক : সদর উপজেলায় নারী উন্নয়ন বিষয়ক বেশ কিছু প্রকল্প এ বছর হাতে নিয়েছি। আমাদের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা আরও একটি বিষয় নিয়ে কাজ করেছি। তা হলো, সদর উপজেলায় ৯টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। সে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে মায়ের ডাক নামে একটি করে ভ্যান দিয়ে দেয়া হয়েছে। যে কোনো সময় গর্ভবতী মায়ের প্রয়োজনে ভ্যানটি তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে। আমরা একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইতোমধ্যে তা বাস্তবায়ন করেছি। আমরা জয়যাত্রা নামেও একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। আমাদের উপজেলায় একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা কারুকার্য নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সেখানে নারীদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষন দেয়া হতো। তা বিগত তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে আমরা জয়যাত্রা  নামে পুনরায় সে প্রকল্পের যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ :  আপনাকে ধন্যবাদ।
নাহিদা বারিক : আপনাকেও ধন্যবাদ।


নারীর সিদ্ধান্ত নারীর নিজের হওয়া উচিত : ইউএনও রূপগঞ্জ

‘‘নারীরা দুর্বল নয় উল্লেখ করে বার বার আমরাই প্রমাণ করছি যে নারীরা দুর্বল। সৃষ্টির শুরু থেকেই নারী এবং পুরুষ সমান ভাবে সমাজে ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে নারীদের এই করুন অবস্থার জন্য সমাজ দায়ী। কারণ বর্তমান সমাজ নারীদের শিখিয়েছে, নিজের সিন্ধান্ত নিজে না নিয়ে তা পুরুষ সঙ্গির উপর ছেড়ে দিতে। যেদিন নারীরা আবারও নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখবে, সেদিন পুনরায় বিশ্বে নারী-পুরুষের সমতার দেখা মিলবে।’’ এমন মতাদর্শে বিশ্বাসী রূপগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগম।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নিউজ নারায়ণগঞ্জের বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের মতাদর্শ প্রকাশ করেন মমতাজ বেগম।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারী ক্ষমতায়নের বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?
মমতাজ বেগম : জন্মলগ্ন থেকেই সৃষ্টিকর্তা নারীদের বিশেষ ক্ষমতা দিয়েই পাঠিয়েছেন। তবে আমরা বর্তমানে নারীদের যে করুন পরিস্থিতি দেখছি তা আমাদের সমাজেরই তৈরি। ইসলামের দৃষ্টিতে যদি আমরা দেখি তৎকালিন সময়ে খাদিজা (রা) একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ছিলেন। বলা যায়, অনেক পুরুষের চেয়েও ভালোভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতেন তিনি। অথচ পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে আমরা এই সময়ে এসেও নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলছি। যা সত্যিই লজ্জাজনক। তবে আমরা দেখতে পাই বর্তমান সরকার নারীদের উন্নয়নের জন্য নানা প্রকল্প গ্রহণ করছেন, যা নারীদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করছে। তবুও বলবো; যতদিন না নারীরা স্বশিক্ষিত হয়ে উঠছে, সমাজ এবং পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা গ্রহন করে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার ক্ষমতা অর্জন না করছে, ততদিন আমাদের নারী উন্নয়নের গতি ধীর থাকবে। ক্ষমতায়ন বলতে আমরা যদি শুধু উঁচু পর্যায়ে কাজ করাকে বুঝাই তবে তা ঠিক নয়। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে গ্রহণ করতে পারার ক্ষমতাকেই আমি ক্ষমতায়ন বলে মনে করি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : একদিকে যেমন নারীর উন্নয়ন হচ্ছে, অন্যদিকে নির্যাতনের মাত্রাও বাড়ছে। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
মমতাজ বেগম : এ ঘটনার সবচেয়ে বড় কারণ হলো সচেতনতার অভাব। আমাদের সমাজে এখনো অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। যার ফলে মেয়েটি প্রয়োজনীয় শিক্ষার সুযোগ পায়না। ফলে একটি মেয়ে স্বনির্ভর হতে পারেনা। তাকে অন্যের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়। একজন নারী যখন তার বাবা, স্বামী বা ভাইয়ের উপর নির্ভর করে, তখন পুরুষটির ধারণা থাকে যে মেয়েটির সাথে আমি যেমন ব্যাবহারই করিনা কেন সে অন্য কোথাও যাবে না বা তার যাওয়ার যায়গা নেই। ফলে সে পুরুষটি নিজেকে উক্ত নারীর কর্তা বা মালিক হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে। এ পরিস্থিতি থেকে যদি আমাদের বের হতে হয়, তবে আমাদের সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন। এবং অবশ্যই নারীকে স্বশিক্ষিত এবং স্বনির্ভর হতে হবে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আমাদের সমাজে নারীদের শিশুকাল থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখিন হতে হয়। ব্যক্তিগতভাবে আপনার তেমন কোনো অভিজ্ঞতা আছে কিনা?
মমতাজ বেগম : আমার পরিবারে আমাকে কখনোই তেমন কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়নি। আমরা ৪ বোন ১ ভাই একত্রে বড় হয়েছি। আমাদের মধ্যে কখনো কোনো ভেদাভেদ সৃষ্টি হতে দেয়নি আমার পরিবার। মা-বাবা আমাদের ছেলে সন্তান বা মেয়ে সন্তান হিসেবে নয়, বরং মানুষ হিসেবে বড় করেছে। ছোট বেলা থেকেই পরিবারের ছোট ছোট বিষয়ে আমার মতামতের প্রাধান্য দেয়া হতো।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারীর উন্নয়নে পুরুষের ভূমিকা কতটুকু?
মমতাজ বেগম : নারী উন্নয়নে নারীর পাশাপাশি পুরুষের ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক দিক দিয়েও যদি চিন্তা করি, তবে দেখা যায়, পরিবারে নারী এবং পুরুষ উভয়ে পারষ্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে ভূমিকা রাখলে পরিবারই অনেক বেশি সুন্দর হয়। সমাজের ক্ষেত্রেও তাই। আমার মায়ের নেয়া যে কোনো সিদ্ধান্তকে আমার বাবা গুরুত্ব সহকারে দেখতেন এবং সকল পরিস্থিতিতে তাকে সহায়তা করতেন। এমনকি আমার পরিবারেও তাই দেখা যায়। আমার স্বামী এবং আমি, উভয়ই বাইরে কাজ করি। আমরা কেউ কারও সিদ্ধান্তকে কখনো অসম্মান করি না বরং সমর্থন করার চেষ্টা করি। আমি যে যার মতো নিজের সিদ্ধান্ত নিজে গ্রহণ করি, সেখানে বিপরীতে থাকা লোকটির কোনো আপত্তি থাকে না। ফলে সমাজে নারী এবং পুরুষের মধ্যে মানসিক সমতা এলেই নারীর জন্য সুন্দর একটি সমাজ আমরা পাব।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারী উন্নয়নে আপনার উপজেলার কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।
মমতাজ বেগম : আমাদের সমাজে নারী উন্নয়নের সবচেয়ে বড় যে বাধা তা হলো বাল্যবিবাহ। সে বাল্যবিবাহ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে আমরা জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করছি। এছাড়াও নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা এবং যেসব নারীরা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার, তাদের কর্মসংস্থানের তৈরির উদ্দেশ্যে  উপজেলার বিভিন্ন দপ্তর কাজ করছে। যেমন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন, ইজিপিপিসহ নারা দপ্তর নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আন্তর্জাতিক নারী দিবস নিয়ে আপনার অভিমত কি?
মমতাজ বেগম : আন্তর্জাতিক নারী দিবস অত্যন্ত বিশেষ একটি দিন। আসলে সারাবছর নানা ব্যস্ততায় আমাদের সময়গুলো পাড় হয়ে যায়। এই বিশেষ একটি দিন আমাদের বছর একদিন একটু আনন্দের বা একটু স্পেশাল অনুভূতি দেয়। যেমন সারাবছরই আমাদের জীবনযাত্রার মান সমান ভাবেই চলে, কিন্তু জন্মদিনটা আমাদের জন্য বিশেষ। নারী দিবসও আমাদের জন্য ঠিক তেমন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আপনি নারীদের জন্য কি বার্তা দিতে চান?
মমতাজ বেগম : নারীরা কখনোই দুর্বল হিসেবে জন্ম নেয় না। অশিক্ষা এবং অসচেতনতাই আমাদের দুর্বল হিসেবে তৈরি করে। ফলে আমাদের স্বশিক্ষিত এবং স্বনির্ভর হতে হবে। যদি আমরা স্বনির্ভর হই এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে গ্রহণ করতে শিখি, তবে কখনোই সমাজের দোহাই দিয়ে কেউ আমাদের পেছনে ধরে রাখতে পারবে না।

 

কঠিন সংগ্রামে বেড়ে উঠেন শুক্লা সরকার

আধুনিক সমাজে পদার্পন করেও আমরা ভাবতে পারি না যে, হাজারো প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে একজন নারী নিজ যোগ্যতায় তার অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। ফলে আজও পুত্র সন্তানকেই পরিবারের আলো হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু সমাজের এ চিরাচরিত নিয়ম ভেঙ্গেছেন শুক্লা সরকার। বর্তমানে তিনি বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯৯৮ সালে বাবা সরকারি কর্মকর্তা জাফর ওয়াজেদুল সরকারের মৃত্যুর সময় সবে অষ্টম শ্রেণিতে পড়তেন শুক্লা। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্য বলতে তখন শুধু মা মাকসুদা সরকার ও চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্রী ছোট বোন ওয়াজিদা। তখন থেকেই টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেকে বহন করতে হয় তার। কিছু সময় পরে একই ভাবে নিজের খরচের পাশাপাশি পরিবারেরও হাল ধরেন তিনি।

২০০৮ সালে পড়াশোনা শেষ করে নিজ জেলা রংপুরেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হিসেবে চাকরি জীবনের শুরু হয় শুক্লার। তখন থেকেই যেন আলোর মুখ দেখতে শুরু করে তাদের পরিবার। পরবর্তীতে লালমনিরহাট সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়েও শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১২ সালে ৩০ তম বিসিএস ক্যাডার হিসেবে ঝিনাইদহে সহকারী কমিশনারের পদ লাভ করেন শুক্লা। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন তিনি। ব্যাক্তিগত জীবনে শুক্লা সরকার বিবাহিত এবং এক কন্যা সন্তানের মা। তার স্বামী গোলাম সাকলায়েন শিথিল বাংলাদেশ পুলিশ ডিপার্টমেন্টে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্বরত আছেন।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নিউজ নারায়ণগঞ্জের বিশেষ আয়োজনে শুক্লা সরকারের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে নারীদের নিয়ে তার ভাবনা।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে নারী ক্ষমতায়নের বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?
শুক্লা সরকার : বর্তমানে নারী ক্ষমতায়নের বিষয়টি আমাদের সমাজের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। আমরা সমাজের উচ্চ পর্যায়ে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখতে পাচ্ছি। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী থেকে শুরু করে স্পিকার নারী। এই যে আমি একজন নারী হয়ে এই বিশেষ চেয়ারটিতে বসেছি, এই বিষয়টিকেও আমি নারী ক্ষমতায়ন হিসেবে দেখছি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আমাদের সমাজে শিশুকাল থেকে নারীদের নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। এ বিষয়ে আপনার ব্যাক্তিগত কোনো অভিজ্ঞতা ছিল? আপনার সেই লড়াইয়ের গল্পটা আমাদের বলুন।
শুক্লা সরকার : ১৯৯৮ সালে আমাদের দুই বোনকে রেখে আমার বাবা মারা যান। সে সময়ে আমি মাত্র অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি এবং আমার ছোট বোন চতুর্থ শ্রেণীতে পরে। স্বাভাবিক ভাবেই এমন কোনো পরিস্থিতি হলে বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়ার পরামর্শ দেয় সকলে। আমার ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। কিন্তু আমার মা তখন সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাকে সমর্থন করেন। তিনি প্রতিক‚ল পরিস্থিতিতেও আমার জন্য লড়াই করেন। আমি বলবো আজ আমার মায়ের কারণেই আমি এই অব্দি আসতে পেরেছি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : একদিকে নারীর ক্ষমতায়ন যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে নারী নির্যাতনও বাড়ছে। এ বিষয়টি নিয়ে আপনি কি ভাবেন?
শুক্লা সরকার :  যতদিন না আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হবে, আমরা সুশিক্ষিত হবো ততদিন এ বিষয়টির প্রতিকার পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সংবিধানে যে আইনগুলো আছে তা যদি কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়, তবে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ নিয়ন্ত্রনে আনা সম্ভব। তবুও বলবো যতদিন না মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হবে ততদিন এ পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন হবে না।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নানা সময়ে কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রতি নির্যাতনের চিত্র দেখা যায়। এ বিষয়টি নিয়ে আপনার মতামত কি?
শুক্লা সরকার : আমার চাকরিজীবনে আমি এখনো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হইনি। তবে আমি হইনি বলে যে অন্য কেউও হয়নি তা বলবো না। তবে আমি মনে করি এর মাত্রা অনেক কমে এসেছে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : ১৯৯৮ পর্যন্ত বন্দর উপজেলায় কোনো নারী নির্বাহী কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি। পরবর্তীতে ১৯৯৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ৫ জন পুরুষ এবং ৬ নারী নির্বাহী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
শুক্লা সরকার : এটি খুবই ইতিবাচক একটি বিষয়। দীর্ঘ একটা সময় কোনো নারী এ পদের দায়িত্ব পালন করেনি। পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে পুরুষ কর্মকর্তা থেকে নারী কর্মকর্তাই বেশি ছিলেন। তবে আমি মনে করি, একজন কর্মকর্তা একজন কর্মকর্তাই। এখানে নারী কর্মকর্তা আর পুরুষ কর্মকর্তা নিয়ে কথা বলে আমরাই নারী পুরুষের ভেদাভেদকে অগ্রসর করি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারী উন্নয়ন নিয়ে আপনার উপজেলার পদক্ষেপ সম্পর্কে কিছু বলুন।
শুক্লা সরকার : আমার উপজেলায় যুব উন্নয়ন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, বিআরটিবিসহ বিভিন্ন দপ্তর নারী উন্নয়ন নিয়ে নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে থাকে। তারা নারীদের সচেতন করার লক্ষ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে গিয়ে উঠান বৈঠক করে থাকে। নারীদের উন্নয়নের জন্য তাদের করণীয় সম্পর্কে সচেতন করে থাকে। নারীদের সাবলম্বী হয়ে উঠতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। এর মধ্যে মোবাইল সার্ভিসিং, মৎস চাষ, পশুপালন, শেলাইসহ নানা প্রশিক্ষণ রয়েছে। পাশাপাশি স্বনির্ভর হতে স্বল্প সুদে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যাবস্থা করা হয়। এরই মধ্যে `তথ্য আপা` নামে বাংলাদেশ সরকারের একটি নতুন প্রকল্প চালু হয়েছে। আমাদের সমাজে এখনো অনেক নারীরা রয়েছেন যারা পুরুষদের সঙ্গে যে কোনো বিষয়ে আলোচনা করতে ইতস্তত বোধ করেন তাদের সাথে কথা বলা এবং তাদের নানা বিষয়ে পরামর্শ দেন তথ্য আপা। তিনি সকল দপ্তরের তথ্য সংগ্রহ করেন এবং প্রত্যেকের প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের তথ্য সরবরাহ করে থাকেন। কোনো নারীর জন্য কোথাও কোনো চাকরির সুযোগ থাকলে সে বিষয়েও নারীদের অবগত করেন তিনি। অন্যদিকে নারীরাও একজন নারীর কর্মীর সাথে খোলামেলাভাবে সকল বিষয়ে আলোচনা করে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। বন্দর উপজেলায় এই মুহূর্তে তথ্য আপার ভুমিকা নারীদের মধ্যে ব্যাপক সারা ফেলেছে। তথ্য আপা মাসে তিনটি ইউনিয়ন গিয়ে তিনটি উঠান বৈঠক করে থাকেন। প্রত্যেকটি উঠান বৈঠকে একশ` থেকে দেরশ` নারী উপস্থিত থাকেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারী উন্নয়নে শিক্ষার ভুমিকা কতটুকু?     
শুক্লা সরকার : আমাদের সমাজে অনেক শিক্ষিত লোক আছে, যারা সমাজে নিজেদের ভুমিকা রাখছেন না। সুতরাং আমি বলবো শিক্ষা নয়, সুশিক্ষা আমাদের প্রয়োজন। আমাদের সকলের শিক্ষিত নয়, সুশিক্ষিত হতে হবে। সুশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারী উন্নয়নে পুরুষের ভুমিকা নিয়ে আপনি কি বলবেন?
শুক্লা সরকার : একজন সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন বলেই তো একজন বেগম রোকেয়া তৈরি হয়েছেন। সুতরাং আমি মনে করি নারীর একার পক্ষে কখনোই নিজের উন্নয়নের জন্য লড়াই করা সম্ভভ নয়, যদি না তার পুরুষরাও সমানভাবে এগিয়ে এসে নারীর এ লড়াইকে সমর্থন করেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : বন্দর উপজেলায়  মেয়েদের বাল্যবিবাহের প্রবনতা ব্যাপক হারে লক্ষ্য করা যায়। এ বিষয়টির প্রতিকার হিসেবে আপনি কি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
শুক্লা সরকার : বাল্যবিবাহের বিষয়টি আসলে শুধুমাত্র এই উপজেলায় নয়, প্রত্যেক জায়গায় একই রকম। আমি ৬ মাসের মতো হলো এ উপজেলায় এসেছি। এরই মধ্যে ৭ থেকে ৮টি বাল্যবিবাহ আমি বন্ধ করেছি। তবে আমার সবচেয়ে যেই বিষয়টি খারাপ লেগেছে তা হল যে; যাদের বাল্যবিয়ে আমি বন্ধ করতে গিয়েছি, তাদের প্রত্যেকের মা-বাবাই শিক্ষিত ছিল। আবারও বলবো যে, আমাদের সমাজ শিক্ষিত হচ্ছে কিন্তু সুশিক্ষিত হয়নি এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে নি। নয়তো কিভাবে তারা নিজেদের ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছে? আমদের প্রয়োজন একত্রে এই বিষয়গুলো মোকাবিলা করা। আমরা এই নেতিবাচক বিষয়টিতে নিরুৎসাহিত করতে নানা ভাবে প্রচার প্রচারণা করে থাকি। আমরা মাসে যে তিনটি উঠান বৈঠক করি, সেখানে আমি নিজেও যাই। সেখানে গিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে আমরা তাদের সচেতন করার চেষ্টা করি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : সমাজে নারীদের অগ্রগতিতে উপার্জনের ভূমিকা কতটুকু? তাছাড়া গৃহিণীদের ভূমিকা নিয়ে আপনার অভিমত কি?
শুক্লা সরকার : সমাজে নারীদের পিছিয়ে থাকার জন্য উপার্জন না করাটা একমাত্র কারণ নয়, তবে এটাও একটা কারণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপার্জন না করার কারণে একজন গৃহিণীকে অবমূল্যায়ন করা হয়। আমি যদি উপার্জন না করতাম, তবে আমার সকল ছোট ছোট প্রয়োজনে আমার স্বামীর কাছে টাকা চাইতে হতো। তার উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকাটা হয়তো এক সময় আমার কাছেও খারাপ লাগতো। তাছাড়া যখন পরিবারের একজন ব্যাক্তি উপার্জন করেন, তখন তিনি নিজেকে অন্যজনের চেয়ে বড় করে দেখতে দেখা যায়। অন্যদিকে আমরা একজন গৃহিণীকে কখনোই ছোট করে দেখতে পারিনা। কারণ সে তার সম্পুর্ন সময়টাই তার পরিবারকে দিচ্ছে। এর মাধ্যমে তিনি অনেক বড় বড় ত্যাগ স্বীকার করেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : বর্তমানে কর্মপরিবেশ কতটা নারীবান্ধব বলে আপনি মনে করেন?
শুক্লা সরকার : আমার বাচ্চাটা যখন হয় তখন আমি ৬ মাসের একটি কর্মবিরতিতে থাকি। কিন্তু সেই কর্মবিরতি শেষ হওয়ার পরেও কিন্তু আমার বাচ্চার মায়ের দুধের প্রয়োজন। আমি যে তাকে অফিসে নিয়ে আসবো, তাকে খাওয়াবো, তার খেয়াল রাখবো, সেই ব্যবস্থা ছিল না। আমাকে মাঝে মধ্যেই এ নিয়ে লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পরতে হয়েছে। অনেকেরই আবার বাসায় বাচ্চাকে রাখার কোনো ব্যাবস্থা নেই। সেসব কর্মজীবী মায়েদের নানা বিরম্বনায় পরতে হয়। ফলে প্রত্যেকটি কর্মসংস্থানে একটি করে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার থাকা উচিৎ। আমাদের উপজেলায় ইতোমধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্রেস্ট ফিডিং স্থাপনের প্রকল্প চালু করা হয়েছে। উপজেলা অফিসে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারের পাশাপাশি চাইল্ড কেয়ার সেন্টার তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। তা শুধুমাত্র কর্মকর্তাদের জন্যই নয় উপজেলায় যেসব নারীরা সেবা নিতে আসেন তারাও এ সুবিধা নিতে পারবেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আন্তর্জাতিক নারী দিবস সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?
শুক্লা সরকার : আমরা (নারী) বছরে নিজেদের জন্য একটি দিন পাচ্ছি। এটা একটা বিশাল ব্যাপার, তাই নয় কি? আমরা সারাবছর নিজ নিজ দায়িত্ব নিয়ে ব্যাস্ত থাকি। কর্মক্ষেত্র, পরিবারকে নিয়ে ব্যাস্ততা, সন্তানকে নিয়ে ব্যাস্ততার মধ্য দিয়ে নিজেদের জন্য সময় বের করা হয়ে ওঠে না। সেখানে আমরা নিজেদের অস্তিত্ব উপভোগ করার জন্য বিশেষ একটি দিন পাই, তবে তা তো ভালো। আর সারাবছর কোনো প্রকার সম্মান না পেয়ে এই একটি দিনকে সম্মান পাওয়ার দিন বলতে আমি নারাজ। সম্মান তো অর্জন করে নিতে হয়, তাই না?

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর