নারী কাজ করে যত্ন আবেগ ভালোবাসায় : সদর ইউএনও


হাফসা আক্তার, স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১২:৩৩ এএম, ০৮ মার্চ ২০২০, রবিবার
নারী কাজ করে যত্ন আবেগ ভালোবাসায় : সদর ইউএনও

পাঁচটি উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ জেলায় তিনটি উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে বেশ দাপটের সহকারে সামলাচ্ছেন তিনজন নারী। তাঁদের কেউ কেউ এর আগেও নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। নারী হলেও ইউএনও’র মত গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রশাসন সামলাতে গিয়ে  ভয়-ভীতি আর প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তাঁরা একের পর এক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। নারী হয়েও শক্ত ঝান্ডায় একের পর এক অভিযান চালিয়ে সমাজে শুদ্ধতা আনার চেষ্টা করছেন। ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসে তাঁদেরকে নিয়ে নিউজ নারায়ণগঞ্জের বিশেষ প্রতিনিধি হাফসা আক্তারের বিশেষ প্রতিবেদন।

‘নারীর সৌন্দর্য তার রূপে নয়, বরং তার কাজে।’ এমনটাই মনে করেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা বারিক। এক কন্যা সন্তানের মা হিসেবে নিজেকে গর্বিত মা বলে উল্লেখ করেন তিনি।

৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষ্যে কথা হয় নাহিদা বারিকের সঙ্গে। তাঁর কথায় উঠে আসে এ পর্যন্ত উঠে আসার সেই পেছনের অজানা কাহিনী, বর্তমান অবস্থান থেকে সবকিছু।

২০০৭ সালে ব্যবসায়ী স্বদেশ সাহাকে বিয়ে করার পর স্বামীর ব্যবসার সাথে যুক্ত হন তিনি। এভাবেই তার কর্মজীবনের শুরু। পাশাপাশি স্বামীর সহায়তায় বিসিএসের জন্যও তিনি প্রস্তুতি নেন। পরবর্তীতে ২০১১ সালে বরিশাল ডিসি অফিসে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পদে প্রথম সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন ২৯ তম ব্যাচের এ বিসিএস ক্যাডার।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?
নাহিদা বারিক : অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নকে আমি ৩ ভাগে ভাগ করবো। নারীকে অর্থনৈতিক মূলধারায় অংশগ্রহণ করতে হবে। সামাজিক ক্ষমতায়নের কথা বলতে গেলে নারীর অধিকার ভোগের কথা শুরুতে আসে। আর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বলতে আমরা যা বুঝে থাকি তা হলো রাজনীতিতে নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহন এবং রাজনৈতিক চর্চা করা। আর আমাদের দেশে যে তা খুব সফলভাবেই হচ্ছে তা আমরা সকলেই জানি। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পিকার একজন নারী।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : বর্তমান প্রেক্ষিতে নারী ক্ষমতায়নের যে চিত্র রয়েছে, সে চিত্রকে আপনি কতটা সন্তোষজনক বলে মনে করেন?
নাহিদা বারিক : নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট যদি চিন্তা করি তবে বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। তা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হোক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হোক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার জ্বলন্ত প্রমান। তিনি বিশ্বের অনেক নারীর জন্যই রোল মডেল। তবে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাও রয়েছে, যেখানে নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এ ঘটনার সাথে শিক্ষ জরিত, সমাজের বিভিন্ন দিক জরিত। যতদিন পর্যন্ত না আমরা সমাজের সকল মানুষকে শিক্ষার মধ্যে নিয়ে আসতে না পারবো। সকলের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারবো, ততদিন শতভাগ নারী ক্ষমতায়ন সফল আমি বলবো না।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : সদর উপজেলায় পরপর তিনজন নির্বাহী কর্মকর্তাই নারী। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?
নাহিদা বারিক : বিষয়টিকে আমি উপজেলার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখি। কারণ একজন পুরুষ যখন কাজ করে তা শুধু কাজ হিসেবেই করে। কিন্তু একজন নারী যখন কোনো কাজ করে তা আবেগ এবং ভালোবাসা দিয়ে যতেœর সাথে করে। আর এ বিষয়টি নারী ক্ষমতায়নের প্রতিক হিসেবেও দেখছি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু কর্মপরিবেশ কতটা নারীবান্ধব?
নাহিদা বারিক : বর্তমানে কর্মপরিবেশ অনেকাংশেই নারীবান্ধব বলে আমি মনে করি। কারণ, বর্তমানে স্বামী-স্ত্রী দুজনই যেকানে সরকারি চাকরিজীবি, সেখানে তাদের কাছাকাছি পোস্টিং দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ৬ মাসের মাতৃত্বকালিন ছুটির ব্যবস্থা করা হয়। অন্যদিকে বর্তমান সরকার কর্মস্থলগুলোতে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার এবং ডে কেয়ারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছে। যা বাস্তবায়নের জন্য কার হচ্ছে। আশা করি খুব শীঘ্রই কর্মপরিবেশ শতভাগ নারীবান্ধব হিসেবে বাস্তবায়িত হবে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : একদিকে নারীর ক্ষমতায়ন যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে নারী নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। এ বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?
নাহিদা বারিক : এটা খুবই দুঃখজনক যে এ সময়ে এসেও নারী নির্যাতন বাড়ছে। আমরা দেখছি যে যৌন হয়রানির বিষয়টি উঠে এসেছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এ ঘটনা দেখা যায়। এ ঘটনায় নির্যাতিত এবং নির্যাতনকারী উভয়ের পরিবারও অনেকাংশে ভূমিকা পালন করে। কেননা, আমারও দায়িত্ব আমার সন্তান কিভাবে মানুষ হচ্ছে সে বিষয়ে খেয়াল রাখা। শুধুমাত্র সমাজের দোষ দিয়েই একটি সন্তান একদিনে মাদকাসক্ত বা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পরছে না। একটি পরিবার থেকেই প্রাথমিক নৈতিক শিক্ষাদান আবশ্যক। বিচ্ছিন্ন যে ঘটনা ঘটছে সে বিষয়ে আমি বলবো, পরিবার এবং সমাজের উভয়েরই প্রয়োজন নিজেদের সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা। এবং পরিবার থেকেই সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আমাদের সমাজে গৃহিনীদের ভূমিকা নিয়ে আপনার অভিমত কি?
নাহিদা বারিক : আমাদের সমাজে গৃহিনীদের ভূমিকা অসামান্য। আমরা যারা বাইরে কাজ করি, তারা পরিবারের পাশাপাশি নিজেদের জন্যও কাজ করি। আমরা বাইরে কাজ করার জন্য পারিশ্রমিক পাই। তবে গৃহিনীরা তাদের সম্পূর্ন সময় পরিবারকে দিলেও অর্থদন্ডে তাদের শ্রমের মূল্যায়ন করা হয়না। যেমন আমার মা তার পাঁচ সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে কখনো নিজের জন্য কিছু করতে পারেনি। আমরা পাঁচ ভাই-বোন আজ শুধুমাত্র তার জন্যই নারী বা পুরুষ নয়, মানুষ হয়েছি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : নারী উন্নয়নে পুরুষের ভূমিকা কতটুকু?
নাহিদা বারিক : নারী উন্নয়নে পুরুষের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ন। কারণ, ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি আমার সরকারি কর্মকর্তা বাবা পরিবারে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ না করে আমার গৃহিনী মাকে পরিবারে সহায়তা করেছে এবং সম্মান করেছে। যে পুরুষটির সঙ্গে আমি সংসার করছি, সে একজন ব্যস্ত ব্যবসায়ি হয়েও সব সময় আমার অনুভূতির সম্মান করেছে। সে আমার প্রত্যেকটি পদক্ষেপে পাশে থেকেছে। ফলে আমি বলবো, পুরুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকা ছাড়া নারী উন্নয়ন সম্ভব নয়।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : সমাজে যেসব নারীরা এখনো সমাজে এগিয়ে আসতে ভয় পায়, তাদের উদ্যেশ্যে আপনি কি কোনো বার্তা দিতে চান?
নাহিদা বারিক : আমি বলতে চাই, আপনি আপনাকে তুলে ধরুন। নারীর প্রশ্ন আসলেই আমরা দেখি সবার আগে সৌন্দর্যের প্রশ্ন আসে। তবে সে সৌন্দর্য বাহ্যিক নয়, কাজে থাকতে হবে। আপনাকে কাজের মধ্যে নিজের সৌন্দর্য তুলে ধরতে হবে। আপনাকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, আপনি নারীর আগে একজন মানুষ। আমার নিজেরও একটি কন্যা রুশদা নুব্হা ভাষা। তাকে আমি মানুষ হিসেবে বড় করতে চাই। তাকে বলবো; নারী নয়, মানুষ হও। আমি গর্বিত, কারণ আমি এক কন্যা সন্তানের মা।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ : আপনার উপজেলায় নারী উন্নয়ন বিষয়ক কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।
নাহিদা বারিক : সদর উপজেলায় নারী উন্নয়ন বিষয়ক বেশ কিছু প্রকল্প এ বছর হাতে নিয়েছি। আমাদের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা আরও একটি বিষয় নিয়ে কাজ করেছি। তা হলো, সদর উপজেলায় ৯টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। সে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে মায়ের ডাক নামে একটি করে ভ্যান দিয়ে দেয়া হয়েছে। যে কোনো সময় গর্ভবতী মায়ের প্রয়োজনে ভ্যানটি তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে। আমরা একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইতোমধ্যে তা বাস্তবায়ন করেছি। আমরা জয়যাত্রা নামেও একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। আমাদের উপজেলায় একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা কারুকার্য নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সেখানে নারীদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষন দেয়া হতো। তা বিগত তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে আমরা জয়যাত্রা  নামে পুনরায় সে প্রকল্পের যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ :  আপনাকে ধন্যবাদ।
নাহিদা বারিক : আপনাকেও ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর