rabbhaban

শ্রাবণ ও রবীন্দ্রনাথ


রণজিৎ মোদক | প্রকাশিত: ১০:০৬ পিএম, ০৫ আগস্ট ২০১৮, রবিবার
শ্রাবণ ও রবীন্দ্রনাথ

২২ শ্রাবণ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহা প্রয়াণ দিবস। শ্রাবণের সাথে কবির নাড়ীর সম্পর্ক, সেই সম্পর্ক কবি বহুদেশ পর্যটন করেও ছিন্ন করতে পারেননি। বৈশাখী মেঘের রথে যার পৃথিবীতে আগমন আর শ্রাবণের বর্ষণে যার ছুটি আজ তার সেই ছুটি কবিতার কথা মনে পড়ছে। “মেঘের কোলে রোদ হেসেছে/ বাদল গেছে টুটি/ আজ আমাদের ছুটিরে ভাই/ আজ আমাদের ছুটি।”

যিনি জগতের আনন্দ যজ্ঞের আমন্ত্রণে এসেছিলেন তিনি তার সমস্ত মানব জীবন ধন্য করে গেছেন মর্তের প্রীতিরসে। ময়ূরের মত হৃদয় যার, মেঘ দেখলেই নেচে উঠে তাঁর প্রাণ। তাই সারাটা জীবন মেঘের পাতায় অদেখা প্রেমিকার কাছে লিখেছেন পত্র প্রেমিক যক্ষের মতো। শ্রাবণের সাথে কবির কি যে মিল ছিল, সেই টানেই বার বার কবি কদম কেয়ার পথ পেরিয়ে শাপলা শালুর দৃশ্য দেখে তন্ময় হয়ে পড়তেন। কবি নতুন করে ছন্দে ছন্দে আবিস্কার করলেন বাংলার বর্ষাকে। কবির ‘গীতাঞ্জলি’তে মোট ১শ’ ৫৬টি কবিতা রয়েছে। তার মধ্যে আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসের লিখিত কবিতার সংখ্যা ৭৮টি। এ থেকেই আমরা ধরে নিতে পারি আষাঢ়-শ্রাবণ মাস দু’টো কবিকে দারুণভাবে আকর্ষণ করতো। এক কথায় আষাঢ়-শ্রাবণ-বর্ষাকাল আর এ বর্ষা রবীন্দ্রনাথ আবিস্কার করেছেন কবিতায়, গানে তাঁর শিল্প সাধনায়। “মেঘের পরে মেঘ জমেছে/ আঁধার করে আসে/ আমায় কেন বসিয়ে রাখ/ একা দ্বারের পাশে। আঁধার ঘরের দ্বারে কবি বসে থাকতে রাজি নন। তিনি বর্ষার যৌবনদীপ্ত পদ্মার বুকে ঠাঁই নিয়েছেন বার বার। প্রেমিক মন তাঁর প্রেয়সীর চরণ তলে পড়ে থাকে মনের অজান্তে কবির খর¯্রােত পদ্মার ফেনপুঞ্জ দেখে বিশ্বের অদৃশ্য গতিবেগ অনুভব করেন। আকাশের তারাপুঞ্জের ফেনাগুলি থেকে বিশ্ব গতিকে অনুভব করা যায় বলে উল্লেখ করেন। বিশ্বের অন্তরালে এই প্রচন্ড গতিকে কবি রূপ দিয়েছে তাঁর ‘বলাকা’ কাব্যের চঞ্চলা কবিতায়। সেই উন্মত্ত অন্ধকারে তোমার গতির ছন্দে গ্রহ তারাময় তোমার বক্ষোহার ঘন ঘন দুলতো আর দীপ্যমান নক্ষত্রের মানপুঞ্জ ছড়িয়ে যাচ্ছ্।ে নীহারিকার মধ্যে ঝড়ের মত বিক্ষিত তোমার কেশ পাল এলিয়ে ছুটছে।  কি অপরূপ বিরাট অভিসারে তুমি নিরন্তর চলেছ ধেয়ে। কি সর্বনাশ সেই প্রেম যে একটু দাঁড়াবারও সময় নেই। সব ফুল-ফল ছড়িয়ে চলছে, তোমার কন্ঠহার হতে পুঞ্জ পুঞ্জ নক্ষত্রের মনি ঝরে ঝরে পড়ছে- দাঁড়াবার জো নেই।

মহাকালের যাত্রার মানুষের অস্তিত্বের সার্থকতা কোথায়? কবি মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত। কবির মনে বার বার প্রশ্ন ধ্বনিত হয়ে উঠেছে। কবি মন দূরে বহু দূরে চলে যায় রহস্যের এক দেশে। যার মধ্যে জীবন মরণের তাৎপর্য রয়েছে প্রচ্ছন্ন, সেই তাৎপর্যের মধ্যে রয়েছে কোনো একটা চিরন্তন অর্থ- যে অর্থবহন করে চলছে অসীমের অভিমুখে সমস্ত ব্রহ্মান্ড। কবি সত্য সুন্দরের পূজারী, তাই সুন্দরের মাঝে সত্যকেই অনুভব করেছেন। কবির কাছে এ জগৎ রঙ্গময় জগতের ভালবাসা মিথ্যা নয়। তাই তিনি এ মর্তের ভালবাসা সমস্ত অন্তর দিয়ে গ্রহন করেছেন। সকল সত্তা দিয়ে অনুভব করেছেন। তাই পৃথিবীর সমগ্র রূপটি কবির মনের মধ্যে ধরা পড়েছিলো। ধরা পড়ার কারণ জগৎকে কবি ভালোবেসে, প্রেমের আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিয়ে ছিলেন। ফলে কবির জীবন ও কবির ভূবন এক হয়ে গেছে। জীবন ও জগৎকে কবি আর আলাদা বা বিচ্ছিন্ন করে ভাবতে পারেননি। কবির ভালবাসা ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত জীবন জগৎ একাকার হয়ে গেছে কবির প্রেমে।

কবির জীবন ও ভূবনতো স্বতন্ত্র নয়। তবে চন্দ্র, সূর্য-তারাময় কবির ভূবন যদি হারিয়ে যায়। তবে তাঁর জীবন কিসে ভাল লাগবে? চৈতন্য ছাড়া এ জগতে কোন অর্থ নেই। কবির জীবন ও ভূবন একে অপরকে সার্থক করেছে, পরিপূর্ণ করেছে। জগৎকে কবি ভালবাসেন সত্য। কবি একথাও জানেন- এ জগৎ ছেড়ে তাঁকে একদিন চলে যেতে হবেই হবে।

“যা হারিয়ে যায় তা আগলে

                          বসে

             রইবো কত আর।

আর পারিনে রাত জাগতে হে

                           নাথ

             ভাবতে অনির্বার।”

কবি চরম সত্যের উপলব্ধি করেছেন, জীবন যেমন সত্য, মৃত্যুও তেমনি প্রত্যক্ষ। মৃত্যুকে ভেদ করে জীবন বিকশিত হয়ে উঠে। মানুষ তার জীবনকে সত্য করে, বড় করে পেতে চাচ্ছে। কবি তার ‘ফাল্গুনী’ নাটকে সেই পরম সত্য কথার ইঙ্গিত দিয়েছেন, মৃত্যুর মধ্য দিয়েই জীবন নিত্য নতুন রূপে বিকাশ লাভ করে। মৃত্যু না থাকলেতো জীবন স্থবির হয়ে যেতো; জীবনের চারপাশে জমে যেন পংকিলতা, আবিলতা, মুত্য¯্রােতে জীবন রুচি¯œাত হয়ে নিত্য নতুন রূপ লাভ করে।

“দূর হতে কি শুনিস

মৃত্যুর গর্জন, ওরে দ্বীন”

বিশ্ব ভূবনের সাথে মানুষের সম্পর্ক হৃদয়ে ‘ভালবাসার’ ভালবাসায় বিশ্ব ভূবনে সৌন্দর্য পরিপূর্ণ এবং মানুষের জীবন সফল হয়ে উঠে। মানুষের এই ভালবাসার জন্মেই বিশ্ব প্রকৃতি যুগ যুগ ধরে কাল থেকে কালান্তরে প্রতীক্ষা করে আছে। এসত্য! রবীন্দ্রনাথের হৃদয় বীণায় বার বার ঝংকৃত হয়েছে।

“কত যুগ যুগান্তরের জন্মে

জন্মেছি আজ মাটির পরে

ধুলা মাটির মানুষ।”

ধুলা মাটির মানুষ না হলে এই ফুল, ফল, নদীর জল, বনের শোভ, সব কিছুই মিথ্যা যেতো তাই কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর ফুল প্রিয়জন করে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ জীবন সরোবর থেকে পুষ্প চয়ন করে জীবন দেবতার স্তব করেছেন আর অনন্ত সৌন্দর্য সাগরে নিজকে বিলিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে বর্ষার প্রতি কবির অনুরাগ জীবনের প্রথম থেকেই লক্ষ্য করা যায়। আর তাই বর্ষার রূপ বর্ণনায় কবি পঞ্চমুখ। কদম কেয়ার পথ বেয়ে বেয়ে কবি একেবারে সোনার তরীর সম্মুখে-

“শ্রাবণ গগণ ঘিরে/

ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে/

শূন্য নদী তীরে/

রহিনু পড়ি/

যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।”

কবির প্রেমের পূণ্য ফল আজ সোনার তরীর মাঝি কাল থেকে কালান্তরের ঘাটে ঘাটে পৌঁছে দিচ্ছে। কিন্তু কবি দাঁড়িয়ে আছেন সৈকতে এ যেন কর্তব্যের মহান কর্মী। ছুটির প্রতীক্ষায়-

“ছিন্ন করে লও হে মোরে

          আর বিলম্ব নয়।”

ভারতীয় রেনেসাঁসের সুন্দরতম ব্যাক্তি হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে শুধু লেখক বা কবি হিসেবে বিচার করা কঠিন। ভারতীয় ধারণায় একজন সম্পূর্ণ মানুষের তিনিই সর্বোত্তম উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথ মন্দিরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ না থেকে জীবন দেবতাকে আহবান জানিয়েছেন বাস্তব সংগ্রামের ধুলি মলিন রাস্তায় নেমে আসতে- যেখানে শ্রমিকরা পাথর ভাঙ্গছে সভ্যতার ইমারত গড়বে বলে।

ভাল লাগার পৃথিবীকে, শেষ বিদায় জানাবার আগে মানুষের মরণশীলতা চুড়ান্ত পর্যায় সম্পর্কে নিজের সঙ্গে নিজেই কবি হিসেবে মিলিয়ে নিচ্ছেন জীবনের শেষ প্রহরের দিনগুলোতে। কবি মৃত্যুকে, মৃত্যু যন্ত্রণাকে স্বেচ্ছায় আলিঙ্গন করলেন কারণ তিনি জীবন পত্রের অপর পৃষ্ঠায় বাস্তব সত্যকে অনুভব করেছিলেন, অস্ত্রপচারের পূর্বে যে কবিতাটি তিনি লিখলেন সেখানে বললেন ‘মৃত্যুর নিপুণ হস্তকর্ম সম্পর্কে যা কেবল বিক্ষিপ্ত অন্ধকারের অলঙ্কার দিয়েই সাজানো।’ যারা জীবন ও মৃত্যুর এই খেলায় জয়ী হতে পেরেছেন তারাই কেবল এই সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে পারেন। অসুস্থ কবিকে পরীক্ষা করে দেখার জন্য কলকাতা থেকে নিয়ে এলেন একদল ডাক্তার। তারা ঠিক করলেন কবিকে কবে অপারেশন করা যায়। ডাক্তার বিধান রায় দলপতি হয়ে হাস্য রসিকতায় কবির মনের ভয় দূর করার জন্য বললেন, অপারেশন অতি সামান্য এখনই প্রকৃত সময় অপারেশন করলেই জ্বর আর আহারের অরুচি চলে যাবে। ঠিক হলো ১ মাসের মধ্যেই অস্ত্রপচার করা হবে। ১০ শ্রাবণ কবিকে গ্লুকোজ ইন্জেকশন দেয়া হলে কবির অসম্ভব কাপুনী দিয়ে জ্বর এলো। ডাক্তার বললেন, ওটা রিয়্যাক্শন। পরদিন সকাল বেলা, কবি আশ্চর্য কি দারুণ খুশি। কারণ কি? বললেন, একটা কবিতা লিখেছেন এরই মধ্যে।

“প্রথম দিনের সূর্য

প্রশ্ন করেছিল

সত্তার নূতন আবির্ভাবে,

কে তুমি-

মেলেনি উত্তর।”

১৪ শ্রাবণ কবির দেহে অস্ত্রপচার! খুব সকালেই শুয়ে শুয়েই বলে গেলেন কবিতা শ্রীমতি রাণী চন্দ কলম দিয়ে তা লিপিবদ্ধ করেন। “তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি/ বিচিত্র ছলনা জালে হে ছলনাময়ী।” ১৯ শ্রাবণ কবি কিছুটা ভাল। সকালে সামান্য আহার করে ছিলেন। ২০ শ্রাবণ কবি সম্পূর্ণ অজ্ঞান। কিডনীও ঠিকমতো কাজ করছে না। রাতে কবিকে স্যালাইন দিতে হলো। ২১ শ্রাবণের সন্ধ্যা। পূবের আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ রাখি পূর্ণিমা। শান্তি নিকেতনের চীনা ভবনের অধ্যাপক এসেছেন, কবির বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের তসবী গুনতে গুনতে উপাসনা করলেন। কবিকে পূর্ব দিকে মাথা রেখে শায়িত অবস্থায় রাখা হয়েছে। শান্ত সৌম এক নীরব শিশু ‘ছুটি’ গল্পের নায়ক দুরন্ত ফটিক শান্ত সুশীল বালক যেন বিশ্ব মায়ের কাছে যাচ্ছে।

২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ সাল। শ্রাবণের সাথে কবির নাড়ীর সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক কবি বহু দেশ পর্যটন করেও ছিন্ন করতে পারেননি। বৈশাখী মেঘের রথে যার পৃথিবীতে আগমন আর শ্রাবণের বর্ষণে যার ছুটি আজ তাঁর সেই কবিতার কথা মনে পড়ছে। যে কবিতা পড়ে পড়ে ছুটির আনন্দে স্কুল জীবনে বাড়ী ফিরতাম, আজ সেই কবিতার চরণ স্মরণ করে বেদনাবোধ করছি।

“মেঘের কোলে রোদ হেসেছে

বাদল গাছে টুটি

আজ আমাদের ছুটিরে ভাই

আজ আমাদের ছুটি।”

দীর্ঘ জীবনের কর্ম ব্যস্ততার মধ্য থেকে কবি বিদায় নিলেন শ্রাবণে। এপার ওপার দু’পার সংযোগের সনাতনী পথের সন্ধানে কবি তাঁর জীবন দেবতার সাথে-

“কথা ছিল এক তরীতে কেবল তুমি-আমি

যাব অকারণে ভেসে

ত্রিভূবনে জানবে না কেউ

আমরা তীর্থ গামী

কোথায় যেথেছি কোন

দেশে সে কোন দেশে।”

আপনার মন্তব্য লিখুন:
rabbhaban
আজকের সবখবর