rabbhaban

যেভাবে ৭জনকে হত্যা করা হয়


সিটি করেসপন্ডেন্ট | প্রকাশিত: ০৫:৫৩ পিএম, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, শুক্রবার
যেভাবে ৭জনকে হত্যা করা হয়

নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের এর অনুলিপি পাওয়ার এক মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে দন্ডপ্রাপ্তদের আপিল করতে হবে। ১৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট ওই রায় প্রকাশ করেন।

বহুল আলোচিত সাত খুনের নৃশংসতা শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় পুরো বাংলাদেশবাসীকেও নাড়া দেয়। আলোচিত হয় বিশ্বব্যাপীও। সাত জনকে হত্যা করা হয়েছিল বেশ নৃশংসভাবে। সাতজনেক একই স্টাইলে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। যাতে করে লাশ ভেসে উঠতে না পারে। উদ্ধার করা লাশের সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল, পেটে ছিল ফাঁড়া। ১২টি করে ইট ভর্তি সিমেন্টের বস্তার দুটি বস্তা বেঁধে দেওয়া হয় প্রতিটি লাশের সাথে। তাদের সবার লাশের মুখ ছিলো ডাবল পলিথিন দিয়ে মোড়ানো।

সাত খুনের ঘটনায় ১২৭জনের মধ্যে ১০৬ জন সাক্ষ্য প্রদান করেছে। আদালতে দেওয়া ২১ জন আসামীর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়। এসব আসামীদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতেও উঠে আসে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা। সেখানে তাঁরা হত্যাকান্ডের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। ৩০ এপ্রিল বিকেলে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল। পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দুটি করে বস্তা বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

মামলার নথি, চার্জশীট, জবানবন্দী ও সুরতহাল রিপোর্ট সূত্রে জানা গেছে, সাত জনের পায়ে ২৪টি করে ইট বোঝাই সিমেন্টের ব্যাগ দিয়ে বাঁধা অবস্থায় ছিল নদীতে ডোবানো ছিল। পা ছিল দড়ি দিয়ে বাঁধা। হাত পেছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। মুখমন্ডল ডাবল পলিথিন দিয়ে গলার কাছে বাধা ছিল। পেট ধারালো অস্ত্র দিয়ে সোজাসুজি ফাড়া ছিল। নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকা সংলগ্ন নদীতে কয়েকটি লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। এরপর পুলিশ গিয়ে নদীর এক কিলোমিটারের মতো এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে একে একে ছয়টি লাশ তুলে আনে। পরে যার যার স্বজনরা লাশগুলো সনাক্ত করে।

যেভাবে অপহরণ ও হত্যা
নাসিক কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে অপহরণের দিনক্ষণ আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ থানার একটি চাঁদাবাজির মামলায় স্থায়ী জামিন নিতে নজরুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জ আদালতে আসবে। এ সম্পর্কে মেজর (অব.) আরিফ হোসেন নিশ্চিত হন। নিশ্চিত হয়েই সকালেই অপহরণ পার্টিকে বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড় করানো হয়। সাদা পোশাকে একটি টিম নারায়ণগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থান নেয়। তারা সার্বক্ষণিক মেজর আরিফের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। নজরুল ইসলাম সেদিন তার গাড়ি না এনে তার সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপনের গাড়ি ব্যবহার করেন। স্বপনের সাদা রঙের এক্স করোলা প্রাইভেটকার যোগে নজরুল ইসলাম আদালত প্রাঙ্গণে আসেন।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে অন্তবর্তীকালীন জামিন নিয়ে আদালত থেকে একটি সাদা প্রাইভেটকারযোগে নজরুল ইসলাম বের হওয়ার পরপরই মেজর আরিফের কাছে খবর পৌঁছে দেয় আদালতের আশপাশে অবস্থান নেয়া সাদা পোশাকের র‌্যাব সদস্যরা। নজরুলের সঙ্গে একই গাড়িতে নজরুলের সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, সিরাজুল ইসলাম লিটন, তাজুল ইসলাম। গাড়ি ড্রাইভ করে স্বপনের ব্যক্তিগত গাড়িচালক জাহাঙ্গীর। নজরুলদের গাড়ির পেছনে ছিল আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়ি।

নজরুলদের বহনকারী গাড়িটি নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোড হয়ে উত্তর দিকে যাওয়ার পথে ফতুল্লা স্টেডিয়ামের সন্নিকটে (ময়লা ফেলার স্থান) পৌঁছার পর মেজর আরিফের নেতৃত্বে গাড়ির গতি রোধ করা হয়। নজরুলের গাড়ির পেছনে ছিল আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়ি। পরে দু’টি গাড়ি থেকে সাত জনকে র‌্যাবের দু’টি গাড়িতে তুলে নেয়া হয় অস্ত্র দেখিয়ে। গাড়িতে তাদের ওঠানোর পর একে একে প্রত্যেকের শরীরে ইনজেকশন পুশ করে অচেতন করা হয়। অচেতন হওয়া সাত জনকে কয়েক ঘণ্টা তাদের গাড়িতেই রাখা হয়। নিয়ে যাওয়া হয় নরসিংদীতে।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে পরিকল্পনা মতে কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিম পাড়ে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরভূমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বালু-পাথর ব্যবসাস্থল জনমানুষ শূন্য করার জন্য নূর হোসেনকে ফোন দেয় মেজর (অব.) আরিফ হোসেন। গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর র‌্যাবের গাড়ি ওই স্থানে পৌঁছায়। গাড়ির ভেতরই অচেতন প্রত্যেকের মাথা ও মুখ পলিথিন দিয়ে মোড়ানো হয়। পরে গলা চেপে ধরার পর একে একে শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যায় সাত জন।

পরে সাত জনের নিথর দেহ গাড়ি থেকে নামানো হয়। পরে নারায়ণগঞ্জ শহরের ৫ নম্বর ঘাট থেকে র‌্যাবের নির্দিষ্ট নৌকা নিয়ে যাওয়া হয় কাঁচপুর ব্রিজের নিচে। লাশগুলো নৌকায় উঠিয়ে শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে যাওয়ার পথে ‘নির্দিষ্ট স্থান’ থেকে লাশ গুমের উপকরণ নৌকায় তোলা হয়। নৌকার মধ্যেই একে একে প্রত্যেকটি লাশের সঙ্গে ইট বাঁধা হয়। একটি করে ফুটো করে দেয়া হয় নাভির নিচে-গ্যাস বের হয়ে যাতে লাশ ভেসে না ওঠে। তারপর শীতলক্ষ্যা নদীর নির্দিষ্ট স্থানে লাশগুলো ফেলে দেয়া হয়। পুরো অপারেশনে র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাসহ অনেকেই অংশ নেয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর