rabbhaban

নারায়ণগঞ্জে ওয়াসার পানি শীতলক্ষ্যার চেয়েও নোংরা!


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৩৯ পিএম, ১২ মে ২০১৯, রবিবার
নারায়ণগঞ্জে ওয়াসার পানি শীতলক্ষ্যার চেয়েও নোংরা!

নদীর জল ঘোলা ভালো জাতের মেয়ে কালো ভালো। এই জল নিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে চলছে জলাঞ্জলি। শহরের কোল ঘেষে শীতলক্ষ্যা নদী রয়েছে। এর ঠিক উল্টোদিক দিয়ে চলে গেছে বুড়িগঙ্গা। ফতুল্লার পাশে বুড়িগঙ্গা হলেও শহর থেকে খুব একটা দূরে নয়। অথচ এই শহরে ওয়াসার কার্যক্রম জোড়ালো রয়েছে। নদীর পাশের শহর হলেও এই শহরে পানির সঙ্কট মেটাতে ওয়াসার কার্যক্রমের কোন জুড়ি নেই। এই পানি দিয়ে গ্রাহকরা যা করে করুক গিয়ে তাতে অসুবিধা নাই ওয়াসার কর্তৃপক্ষের। তাদের দায়িত্বের মধ্যে যেন শুধু বিতরণ কার্যক্রমই পড়ে। মানুষ কী খেল আর কী ফেলে দিল তা দেখার কোন প্রয়োজন নেই তাদের। ওয়াসার এই ঘোলা পানিতে রয়েছে দুর্গন্ধ, ময়লা আর কালচে কিছু ভারী বস্তু যা শীতলক্ষ্যার চেয়েও নোংরা বলে মন্তব্য নগরবাসীর।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে ঢাকা ওয়াসা শতকরা ১৫ ভাগ এলাকায় পানি সরবরাহ ঠিকমত করতে পারছেনা যার কারণে ৮৫ ভাগ জনগণ প্রয়োজনীয় পানি বঞ্চিত রয়েছে। আর যেখানে পানি সরবরাহ কর হয় সেখানে নর্দমা ও ড্রেনের দুর্গন্ধযুক্ত, নোংরা পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এ পানি খাওয়া তো দূরের কথা ব্যবহারেরও অনুপযোগী। এতে করে ডায়ারিয়াসহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা করছে এলাকাবাসী। এছাড়াও শহরের বিভিন্ন স্থানেও ওয়াসার পানি সরবরাহের লাইনে অসংখ্য লিকেজের কারণে নর্দমা ও ড্রেনের দুর্গন্ধযুক্ত, নোংরা পানি প্রবেশ করছে।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের আগষ্টের শুরুতে বন্দর থানার লক্ষণখোলায় ওয়াসার দূষিত পানি পান করে শিশুসহ ৫ জন মানুষের মৃত্যু হয়। অসুস্থ্য হয়েছিল অন্তত ৭ শতাধিক। ওই সময় বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলে ও বন্দরের সোনাকান্দা এলাকায় ওয়াসার পানি শোধনাগার রয়েছে। যেখানে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে সংগৃহীত পানি পরিশোধন করা হয়। কিন্তু নদীর পানিতে যা নেই তার চেয়ে বেশি কিছু রয়েছে এই শহরের ওয়াসার পানিতে। এটাকে বাড়তি কিছু দেনা পাওনা মনে করে বিল বেশি না নিলেও শহরবাসী কম বিল দিয়েও সন্তুষ্ট করতে পারেনি ওয়াসার কর্তৃপক্ষ। শহরবাসী বাড়তি কিছু নিতে অপারগতা প্রকাশ করছেন। তাদের ধারণা শীতলক্ষ্যার পানি নোংরা-দূষিত হয়ে গেছে। সেই নোংরা পানির চেয়েও নোংরা ওয়াসার পানি। এর থেকে যে কারেই হোক পরিত্রান চান তারা।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে নারায়ণগঞ্জে সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলে ও বন্দরের সোনাকান্দা এলাকায় ঢাকা ওয়াসার পানি শোধনাগারে যে বিপুল পরিমাণ ক্যামিকেল ব্যবহৃত হচ্ছে সেই ক্যামিকেল যাচ্ছে কোথায়। কারণ প্রতিদিন সরকার মোটা অংকের অর্থ খরচ করে ক্যামিকেল দিয়ে নদীর পানি পরিশোধন করছে। কিন্তু মোটা অংকের অর্থ ব্যয়ের সেই ক্যামিকেল ব্যবহার সত্বেও কেন ওয়াসার পানি পরিশোধন হচ্ছেনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এর আগে আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী নামের একটি সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে একাধিকবার ক্যামিকেল ব্যবহার নিয়ে কারচুপির অভিযোগ করা হয়েছিল। ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি সম্পর্কে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ বলেছিলেন, “ওয়াসার পানি দিয়ে লাশও গোসল করানো যায়না। ওয়াসার পানি পানে ডায়ারিয়াসহ পানিবাহিত রোগ বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকাতে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ, নদীর পানি সংরক্ষণ ও নির্গমনে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু এ ওয়াসা নারায়ণগঞ্জবাসীর বুকের উপর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেছে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ সরকার কর্তৃক পানি বিশুদ্ধ করনের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ও ক্যামিকেল সঠিক ভাবে ব্যবহার না করার কারণে জনদুর্ভোগ বাড়ছে।”

এদিকে নিজেদের পরিশোধিত পানি নিজেরাই পান করেন না ঢাকা ওয়াসার নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। নাগরিকদের সুপেয় পানি সরবরাহের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটিতে পান করা হয় বাইরে থেকে নিয়ে আসা জারের বিশুদ্ধ পানি। খবর দৈনিক প্রথম আলোর।

২৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সকালে নারায়ণগঞ্জ নগরের খানপুরে অবস্থিত ঢাকা ওয়াসার আঞ্চলিক কার্যালয়-১১ এর রাজস্ব বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, একটি কক্ষে দুটি বিশুদ্ধ পানির জার রাখা। সেখানেই বসে আছেন কার্যালয়ের অফিস সহায়ক সুফিয়া বেগম। সংবাদকর্মী পরিচয়ে খাওয়ার পানি চাইতেই তিনি বলেন, এখনো (সকাল সাড়ে ১০টা) বাইরে থেকে বিশুদ্ধ পানির জার আসেনি। খাওয়ার পানির জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। ট্যাব থেকে ওয়াসার পানি দিচ্ছেন কেন প্রশ্ন করলে মৃদু হেসে তিনি বলেন, ‘এই পানি কেউ খায় নাকি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কার্যালয়টির একজন কর্মকর্তা বলেন, ৩৫ টাকা দরে প্রতিদিন দুটি বিশুদ্ধ পানির জার এনে কার্যালয়ে রাখা হয়। সেই পানিই ঠান্ডা করে পান করেন কর্মকর্তারা। কার্যালয়ে শীতলক্ষ্যার পরিশোধিত পানি থাকলেও সেই পানিতে দুর্গন্ধ। ফলে কেউই সে পানি পান করেন না। তবে পাশের একটি গভীর নলকূপ থেকে নিয়ে আসা বোতলভর্তি পানি সব সময়ই কর্মকর্তাদের টেবিলের পাশে রাখা থাকে।

ওয়াসার পানি সম্পর্কে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের জামতলার গৃহিণী সালমা আক্তার বলেন, ‘এই পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ থাকে। পান করা তো দূরের কথা, আমরা রান্নার কাজেও ব্যবহার করি না।’

কার্যালয়টির রাজস্ব কর্মকর্তা সেকান্দার আলী বলেন, ১১ দশমিক ২ টাকা থেকে ৩৫ দশমিক ২৮ টাকা দরে প্রতি ইউনিট (১ হাজার লিটার) পানি সরবরাহ করে ওয়াসা। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার দুই পারে তাঁদের সক্রিয় গ্রাহক রয়েছেন প্রায় ২৭ হাজার।

আঞ্চলিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হাসেম বলেন, নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে দুটি শোধনাগারে পরিশোধিত ২ কোটি ৮০ লাখ লিটার এবং ৩১টি গভীর নলকূপ থেকে প্রায় ৬ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়। ওয়াসার পানি বিশুদ্ধ হলে বাইরে থেকে কেন বিশুদ্ধ পানির জার নিয়ে আসা হয়, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবাই ভালো পানি পান করতে চায়। এখানে (নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়) আমাদের ট্রিটমেন্টের পানি (শীতলক্ষ্যার পরিশোধিত পানি)। তাই কেউ পান করতে চায় না। তবে গভীর নলকূপের পানি অনেকেই পান করেন।’

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি এ বি সিদ্দিক বলেন, ওয়াসার এমডি দাবি করছেন, তাঁদের পানি শতভাগ সুপেয়। আর ওয়াসার কার্যালয়ে বাইরে থেকে পানি নিয়ে যাওয়া হয় পান করার জন্য। এটা খুবই হাস্যকর। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, যে কারণেই হোক, ওয়াসার পানি অন্তত পানযোগ্য নয়।

যে কারণে নারায়ণগঞ্জের রেস্তোরা থেকে শুরু করে ফুটপাতের টংজাতীয় দোকানেও এখন জারভর্তি ‘বিশুদ্ধ’ পানি বিক্রি হয়। গ্লাস প্রতি দাম এক টাকা। তার পরও তারা ওয়াসার পানি থেকে দূরে থাকতে চান।

আফসানা বিনতে হক বলেন, শীতলক্ষ্যার পানি শহরের পাশে খারাপ হলেও নাক বন্ধ করে থাকা যায়। কিন্তু বাসার মধ্যে যে পানি তাতো নাক বন্ধ করে ব্যবহার করা যায় না। আর শীতলক্ষ্যা নদীর কিছু দূরে পানি পরিষ্কার পাওয়া গেলেও কল থেকে কিছু পানি পড়লেও পানি পরিষ্কার পাওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রহিম মিয়া একই কথায় সূর মিলিয়ে বলেন, ওয়াসা যদি শীতলক্ষ্যার পানি সরবরাহ করে তাহলেও কিছুটা ব্যবহার করা যাবে কিন্তু যে পানি তারা দিচ্ছে তা ব্যবহার করার কোন যোগ্য না। অথচ তারা গলা ফুলিয়ে নিজেদের তারিফ করেন। লজ্জা তাদের লাগেনা। গ্রাহক হিসেবে আমাদের লজ্জা হয় বলে আক্ষেপ করেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর