rabbhaban

এখনও নীরবে কাঁদে মা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:০৭ পিএম, ১৫ মে ২০১৯, বুধবার
এখনও নীরবে কাঁদে মা

‘মা’ শব্দটি পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে সুন্দর ও মধুর একটি বাক্য। সন্তান যেমন মা ডেকে মমতা খুঁজে পায় তেমনি মাও সন্তানের কাছ থেকে ‘মা’ ডাক শুনতে অধির আগ্রহে থাকেন। শত দুঃখ কষ্ট ও অভিমান ভুলে যান সন্তানের মা ডাকের সঙ্গে সঙ্গে। তবে নারায়ণগঞ্জে এমনও মা আছেন যারা এখনও কাঁদেন সন্তানের মা ডাক শোনার জন্য। কেউ এখনও সন্তানের জন্য পথে চেয়ে আছেন আবার কেউ সন্তানের হত্যার বিচার দাবি করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন।

১২ মে রোববার ছিল আন্তর্জাতিক ‘মা’ দিবস। এমন দিনটি কেটেছে সন্তান হারানোর বেদনার মধ্যে দিয়ে। আর সেইসব মায়েদের মধ্যে আলোচিত নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর মা রওনক রেহেনা, তরুন নাট্যকার দিদারুল ইসলাম চঞ্চলের মা খালেদা আক্তার রুবিনা ও ১৫ মাস ধরে নিখোঁজ সাদমান সাকির মা হাবিবা খানম লিপি।

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর মা
তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটি জেলা শাখার আহবায়ক ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। সে শহরের চাষাঢ়ায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ছাত্র ছিল। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেলে ত্বকী শহরের শায়েস্তাখান সড়কের বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি। নিখোঁজের একদিন পর (৭ মার্চ) এ লেভেল পরীক্ষার রেজাল্টে পদার্থ বিজ্ঞানে ৩০০ নম্বরের মধ্যে ২৯৭ পেয়েছিল যা সারাদেশে সর্বোচ্চ। এছাড় সে ও  লেভেল পরীক্ষাতেও সে পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়ন পরীক্ষাতে দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিল। পরে ৮ মার্চ সকালে চারারগোপে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে তার মরদেহ পাওয়া যায়। ত্বকী হত্যা মামলার আসামিদের মধ্যে ৮জনই পলাতক। আর ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ৫জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে দুইজন আসামি ইউসুফ হোসেন লিটন ও সুলতান শওকত ভ্রমর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। কিন্তু এ হত্যাকান্ডের ৬ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও পর্যন্ত এ মামলার অভিযোগ পত্র দেয়া হয়নি।

সেই ত্বকীর মা রওনক রেহানা প্রায় সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের আইডি থেকে ত্বকীর পুরানো দিনের ছবি আপলোড করেন। এতে অনুভব করা যায় ত্বকী প্রতি মায়ের ভালোবাসা আর তাকে হারিয়ে স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা।

রওনক রেহানা বলেন, ‘একজন সচেতন মা সন্তানের মঙ্গল ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না, সচেতনতার সাথে সাথে একজন মায়ের সক্ষমতা ও পারঙ্গঁমতা জরুরী। অপারগতা ও অক্ষমতা যে ‘মা’ এর জন্য কত কষ্ট আজকে তা আমি প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করছি। আমার পক্ষে তো আমার সন্তানকে কোন নিরাপদ রাষ্ট্র, নিরাপদ জনপদ দেয়া সম্ভব হল না, এটা আমার, আমাদের মায়েদের অনিবার্য অক্ষমতা।’

তিনি বলেন, ‘আমার পক্ষে তো আমার সন্তানকে সন্ত্রাসমুক্ত শহর, জন্মস্থান দেয়া সম্ভব হলই না। যে জন্মভূমিকে আমি ভালোবাসতে শিখিয়েছি ও ভালোবেসেছে, ভালোবেসে এ দেশের উন্নয়নের আশায় ও বেঁচে থাকতে চেয়েছে, বিদেশ যেতে চায়নি, দেশে থেকে দেশের জন্য ভাবতে, করতে, বাড়তে, চেয়েছে; বলেছে, “মা দেখো আমি এদেশেই একজন বড় স্থপতি-প্রকৌশলী হয়ে তোমাকে দেখাবো, আমি বাংলাদেশের সম্মান রাখবো। কিন্তু দেশের কিছু মানুষরূপ পশু ওর বড় হওয়া বন্ধ করে দিল। আমার আর বড় ইঞ্জিনিয়ারের মা হওয়া হল না।

ত্বকীর মা রওনক রেহানা বলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানদের নিরাপদ পথচলা কামনা করি মনে প্রাণে। এখন ত্বকী’র জীবনের এক পর্যায় ঘর থেকে বেরিয়ে বৃহৎ জগতে ঘুরে বেড়াবার সময় এসেছিল, আমি ওকে আমার মাতৃছায়ার বন্ধন থেকে আস্তে আস্তে মুক্ত হয়ে পৃথিবীর উন্নয়নের বড় রাস্তায় হাঁটার জন্য এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করতে চাইছিলাম। আমার ত্বকী জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে এই আশায়। এ সময় হতভাগ্য দেশের কিছু শত্রু আমাদের বুক খালি করে ত্বকী`কে নির্মমভাবে হত্যা করল। ত্বকী অর্থ আলো। আমার আলো একদিন ছড়িয়ে যেত সবখানে সবখানে। নির্দয় খুনীর দল তা হতে দিল না। আমাদের সব সস্তানই আমাদের জন্য আলো আজকে ওরা একটি আলো নিভিয়ে দিয়ে যদি পার পেয়ে যায়, আমাদের অন্য আলো সর্বত্র ছড়িয়ে যেতে আমরা কিভাবে আশংকামুক্ত থাকবো!’

দিদারুল ইসলাম চঞ্চলের মা
নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার মো. আওলাদ হোসেনের ছেলে দিদারুল ইসলাম চঞ্চল। ৪ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে চঞ্চল দ্বিতীয়। চঞ্চল নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের অনার্স বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিল। মাত্র ২০ বছর বয়সেই চঞ্চল একজন সফল নাট্যকার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। সে নারায়ণগঞ্জ ঐকিক থিয়েটারের একজন সক্রিয় সদস্যও ছিল। ক্ষণজন্মা এই নাট্যকার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ‘শত মানুষের হাজার স্বপ্ন’, ‘হাড় তরঙ্গ’ এবং ‘বক্তাবলী’ নামে তিনটি নাটক রচনা করে। নিখোঁজ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে ২০১২ সালের ১৩ জুলাই মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর উপলক্ষে ঢাকা শিল্পকলা একাডেমিতে যে ১০০টি মুক্তিযুদ্ধের নাটক মঞ্চস্থ হয় তার মধ্যে চঞ্চলের রচিত ‘বক্তাবলী’ নাটকটিও মঞ্চস্থ হয়। ওই নাটকের জন্য শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে পুরস্কৃত করা হয় তাকে। ২০১২ সালের ১৬ জুলাই গভীর রাতে শহরের পশ্চিম দেওভোগ এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় চঞ্চল। ওই রাত ৩টায় চঞ্চল, তার বন্ধু মীম প্রধান, রাকিব ও শফিক একত্রে নগরীর ২নং রেলগেট এলাকার একটি দোকানে চা-নাশতা খেয়েছিল। নিহত চঞ্চলের মোবাইলে রাত ৩টা ৯ মিনিটে সর্বশেষ কল করেছিল মীম প্রধানের আত্মীয় মেহেদী হাসান রোহিত। সে মীমের সঙ্গে তাকে দেখা করতে বলে। এরপর থেকে চঞ্চল নিখোঁজ হয়। পরে ১৮ জুলাই শীতলক্ষ্যা নদীতে বন্দর উপজেলার শান্তিনগর এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে চঞ্চলের লাশ উদ্ধার করে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে ফেলে পুলিশ। খবর পেয়ে ১৯ জুলাই লাশের ছবি ও পরিধেয় কাপড় দেখে উদ্ধার করা লাশটি চঞ্চলের বলে শনাক্ত করে নিহতের বড় ভাই জোবায়ের ইসলাম পমেল। পরে নারায়ণগঞ্জ আদালতে চঞ্চলের মা খালেদা আক্তার রুবিনা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।

দিদারুল ইসলাম চঞ্চলের মা খালেদা আক্তার রুবিনা বলেন, সেই দিন রাতে রান্না প্রায় শেষ না হতেই অল্প কিছু খেয়ে বের হয়ে যায়। আমি বলেছি, ‘রান্না হয়ে গেছে খেয়ে যা’ কিন্তু আমাকে বলে গেছে মা কিছুক্ষণ পরে এসে আবার ভাত খাবো আর এসে বাপ আমার ভাত খাই নাই। কেন আমার ছেলেকে মারলো? কোন অপরাধে তাকে মারলো? কি দোষ ছিলো তার, যে তাকে মারতে হবে? কোন পাষন্ড আমার ছেলেকে মারলো? আমার ছেলে ভাত খাবে বলে গেলে কিন্তু পাষন্ডরা না জানি কত কষ্ট দিয়ে আমার ছেলে মেরেছে। কত বার জানি বাপ আমার মা, মা, বলে ডাকছে?

তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে চঞ্চল লেখাপড়ায় অনেক ভালো ছিলো। কখন লেখাপড়া নিয়ে তেমন কিছু বলতে হয়নি। তার স্বপ্ন ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হওয়ার। কিন্তু সেটা আর হলো না।’

সাদমান সাকির মা
শহরের দেওভোগ কাঠের দোতলা বড় জামে মসজিদ এলাকার সৈয়দ ওমর খালেদ এপনের ছেলে সাদমান সাকি। ২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর দুপুর দেড়টায় নিজ বাসার সামনে থেকে নিখোঁজ হয় দেড় বছরের শিশু সাকি। যা এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজের ১৩ দিন পর নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় সাদমান সাকির বাবা সৈয়দ ওমর খালেদ এপন একটি অপহরণ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এ ঘটনার চলতি বছরের ২৭ মার্চ সাকির বাবা এপন কাউন্সিলর নজমুল আরম সজল সহ ৬জনকে অভিযক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা পুলিশ সুপারে কাছে আবেদন করেন। এছাড়াও ধারাবাহিক ভাবে মানববন্ধন সহ বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাকির মা হাবিবা আক্তার লিপি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, দেড় বছরের ফুটফুটে শিশু সাদমান সাকি ঠিকমতো কথা বলতে পারতো না। সবে মাত্রই  মাকে ‘মা’ ডাকতে শুরু করে। এর মধ্যে অপরাধীদের হাতে অপহৃত হতে হলো তাকে। মা এখনও বিশ্বাস নিয়ে আছে সাকিকে ফের তার কোলে ফিরে আসবে।

মা হাবিবা খানম খালেদ লিপি কান্না ছাড়া কোন কথা বলতে পারেন না। তিনি ক্ষণে ক্ষণেই স্মৃতি হিসেবে রেখে যাওয়া সাদমান সাকির বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির কথা স্মরণ করেন আর কাঁদেন। কিছুক্ষণ পরপরই তার কানে ভেসে আসে অপহৃত হয়ে যাওয়া শিশুর আওয়াজ। এই মনে হয়, তার আদরের সন্তান ফিরে এসেছে।

কান্নজড়িত কন্ঠে লিপি বলেন, আমি আমার সন্তানকে ফিরে পেতে চাই। আর কিছু চাই না। সকলের কাছেই আমার শুধু একটাই চাওয়া, আমি আমার অবুঝ শিশুটিকে আমার কোলে ফিরে পেতে চাই। আমি আমার সন্তানের মা ডাকের অপেক্ষায় আছি। আমার সাকি আমাকে মা বলে ডেকে জড়িয়ে ধরবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর