rabbhaban

মায়েদের নিরানন্দ ঈদ


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৫:৫৯ পিএম, ১২ আগস্ট ২০১৯, সোমবার
মায়েদের নিরানন্দ ঈদ

ঈদ মানে খুশি আর ঈদ মানে আনন্দ। তবে এ ঈদের খুশি বা আনন্দ নেই হতভাগিনী মায়েদের। ঈদের খুশিতে সবাই যখন কর্মকান্ড নিয়ে ব্যস্ত তখনই সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় নীরবে কাঁদে মা। অপেক্ষায় প্রহর গুনেন প্রিয় সন্তানকে যারা নির্মম ভাবে হত্যা করেছে তাদের বিচার দাবিতে। আর কেউ কেউ এখনও আশায় থাকেন নিখোঁজ সন্তান ফিরে পাবেন। প্রিয় সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ঈদ উদযাপন করবেন। যার জন্য এখনও প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানান তাঁরা। মায়েদের মধ্যে কেউ চান বিচার আবার কেউ চান সন্তানকে। তবে সে আশাও কি পূরণ হবে কিনা সেটাও নিশ্চিত করতে বলতে পারেন না তাঁরা।

পবিত্র ঈদ উল আজহা উদযাপিত হয়েছে সোমবার ১২ আগস্ট। ওইদিন সকালে ছোট বড় সবাই নতুন জামা কাপড় পড়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। পরে দিয়েছেন পশু কোরবানী।

তবে ঈদের খুশি ভাগাভাগি করলেও বেদনা ও বিচারের অপেক্ষায় সেসব মিয়ে দিয়েছে। অনেক মা ঈদের সেমাইও খায়নি। শুধু সন্তানের কথা মনে করে চোখের জল ফেলেছেন। আর সেইসব মায়েদের মধ্যে আলোচিত নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর মা রওনক রেহেনা, তরুন নাট্যকার দিদারুল ইসলাম চঞ্চলের মা খালেদা আক্তার রুবিনা ও ১৬ মাস ধরে নিখোঁজ সাদমান সাকির মা হাবিবা খানম লিপি।

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর মা

তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটি জেলা শাখার আহবায়ক ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। সে শহরের চাষাঢ়ায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ছাত্র ছিল। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেলে ত্বকী শহরের শায়েস্তাখান সড়কের বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি। নিখোঁজের একদিন পর (৭ মার্চ) এ লেভেল পরীক্ষার রেজাল্টে পদার্থ বিজ্ঞানে ৩০০ নম্বরের মধ্যে ২৯৭ পেয়েছিল যা সারাদেশে সর্বোচ্চ। এছাড় সে ও লেভেল পরীক্ষাতেও সে পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়ন পরীক্ষাতে দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিল। পরে ৮ মার্চ সকালে চাড়ারগোপে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে তার মরদেহ পাওয়া যায়। ত্বকী হত্যা মামলার আসামিদের মধ্যে ৮জনই পলাতক। আর ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্ধেহে ৫জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে দুইজন আসামি ইউসুফ হোসেন লিটন ও সুলতান শওকত ভ্রমর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। কিন্তু এ হত্যাকান্ডের ৬ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও পর্যন্ত এ মামলার অভিযোগ পত্র দেয়া হয়নি।

কয়েকবছর ধরে রফিউর রাব্বির জন্য ঈদ এখন উৎসব হয়ে আসেনা, ঈদ এলেই বিষাদে ছেয়ে থাকে বাবা রফিউর রাব্বি ও মা রওনক রেহানার অন্তর। পুরো রমজানে সেহরী আর ইফতারীতে থাকতো ত্বকী। বিগত কয়েক বছর যাবৎ ঈদ উৎসবে বাবা-মায়ের সঙ্গে এখন মেধাবী কিশোর পুত্র ত্বকী থাকেনা। প্রিয় সন্তানের ছবি আর শুধুই স্মৃতি তাঁদের সঙ্গী। ঈদের নামাজ শেষে আর কোনদিন ত্বকীকে স্নেহে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলিও করতে পারবেনা রফিউর রাব্বি। মা রওনক রেহানা আজও ত্বকীর ব্যবহৃত জায়নামাজটি সযত্নে রেখে দিয়েছেন। ঈদ আসবে প্রতিবছর কিন্তু মা ঈদের জামাতে যাওয়ার আগে ত্বকীর হাতে তুলে দিতে পারেনি না প্রিয় জায়নামাজটি। কিনে দিতে পারেনি ত্বকীকে পছন্দের নতুন টুপি-পাঞ্জাবী।

সেই ত্বকীর মা রওনক রেহানা প্রায় সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের আইডি থেকে ত্বকীর পুরানো দিনের ছবি আপলোড করেন। এতে অনুভব করা যায় ত্বকী প্রতি মায়ের ভালোবাসা আর তাকে হারিয়ে স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা।

দিদারুল ইসলাম চঞ্চলের মা

নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার মো. আওলাদ হোসেনের ছেলে দিদারুল ইসলাম চঞ্চল। ৪ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে চঞ্চল দ্বিতীয়। চঞ্চল নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের অনার্স বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিল। মাত্র ২০ বছর বয়সেই চঞ্চল একজন সফল নাট্যকার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। সে নারায়ণগঞ্জ ঐকিক থিয়েটারের একজন সক্রিয় সদস্যও ছিল। ক্ষণজন্মা এই নাট্যকার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ‘শত মানুষের হাজার স্বপ্ন’, ‘হাড় তরঙ্গ’ এবং ‘বক্তাবলী’ নামে তিনটি নাটক রচনা করে। নিখোঁজ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে ২০১২ সালের ১৩ জুলাই মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর উপলক্ষে ঢাকা শিল্পকলা একাডেমিতে যে ১০০টি মুক্তিযুদ্ধের নাটক মঞ্চস্থ হয় তার মধ্যে চঞ্চলের রচিত ‘বক্তাবলী’ নাটকটিও মঞ্চস্থ হয়। ওই নাটকের জন্য শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে পুরস্কৃত করা হয় তাকে। ২০১২ সালের ১৬ জুলাই গভীর রাতে শহরের পশ্চিম দেওভোগ এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় চঞ্চল। ওই রাত ৩টায় চঞ্চল, তার বন্ধু মীম প্রধান, রাকিব ও শফিক একত্রে নগরীর ২নং রেলগেট এলাকার একটি দোকানে চা-নাশতা খেয়েছিল। নিহত চঞ্চলের মোবাইলে রাত ৩টা ৯ মিনিটে সর্বশেষ কল করেছিল মীম প্রধানের আত্মীয় মেহেদী হাসান রোহিত। সে মীমের সঙ্গে তাকে দেখা করতে বলে। এরপর থেকে চঞ্চল নিখোঁজ হয়। পরে ১৮ জুলাই শীতলক্ষ্যা নদীতে বন্দর উপজেলার শান্তিনগর এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে চঞ্চলের লাশ উদ্ধার করে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে ফেলে পুলিশ। খবর পেয়ে ১৯ জুলাই লাশের ছবি ও পরিধেয় কাপড় দেখে উদ্ধার করা লাশটি চঞ্চলের বলে শনাক্ত করে নিহতের বড় ভাই জোবায়ের ইসলাম পমেল। পরে নারায়ণগঞ্জ আদালতে চঞ্চলের মা খালেদা আক্তার রুবিনা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।

দিদারুল ইসলাম চঞ্চলের মা খালেদা আক্তার রুবিনা বলেন, সেই দিন রাতে রান্না প্রায় শেষ না হতেই অল্প কিছু খেয়ে বের হয়ে যায়। আমি বলেছি, ‘রান্না হয়ে গেছে খেয়ে যা’ কিন্তু আমাকে বলে গেছে মা কিছুক্ষণ পরে এসে আবার ভাত খাবো আর এসে বাপ আমার ভাত খাই নাই। কেন আমার ছেলেকে মারলো? কোন অপরাধে তাকে মারলো? কি দোষ ছিলো তার, যে তাকে মারতে হবে? কোন পাষন্ড আমার ছেলেকে মারলো? আমার ছেলে ভাত খাবে বলে গেলে কিন্তু পাষন্ডরা না জানি কত কষ্ট দিয়ে আমার ছেলে মেরেছে। কত বার জানি বাপ আমার মা, মা, বলে ডাকছে?

তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে চঞ্চল লেখাপড়ায় অনেক ভালো ছিলো। কখন লেখাপড়া নিয়ে তেমন কিছু বলতে হয়নি। তার স্বপ্ন ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হওয়ার। কিন্তু সেটা আর হলো না।’

সাদমান সাকির মা

শহরের দেওভোগ কাঠের দোতলা বড় জামে মসজিদ এলাকার সৈয়দ ওমর খালেদ এপনের ছেলে সাদমান সাকি। ২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর দুপুর দেড়টায় নিজ বাসার সামনে থেকে নিখোঁজ হয় দেড় বছরের শিশু সাকি। যা এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজের ১৩ দিন পর নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় সাদমান সাকির বাবা সৈয়দ ওমর খালেদ এপন একটি অপহরণ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এ ঘটনার চলতি বছরের ২৭ মার্চ সাকির বাবা এপন কাউন্সিলর নজমুল আরম সজল সহ ৬জনকে অভিযক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা পুলিশ সুপারে কাছে আবেদন করেন। এছাড়াও ধারাবাহিক ভাবে মানববন্ধন সহ বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাকির মা হাবিবা আক্তার লিপি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, দেড় বছরের ফুটফুটে শিশু সাদমান সাকি ঠিকমতো কথা বলতে পারতো না। সবে মাত্রই মাকে ‘মা’ ডাকতে শুরু করে। এর মধ্যে অপরাধীদের হাতে অপহৃত হতে হলো তাকে। মা এখনও বিশ্বাস নিয়ে আছে সাকিকে ফের তার কোলে ফিরে আসবে।

মা হাবিবা খানম খালেদ লিপি কান্না ছাড়া কোন কথা বলতে পারেন না। তিনি ক্ষণে ক্ষণেই স্মৃতি হিসেবে রেখে যাওয়া সাদমান সাকির বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির কথা স্মরণ করেন আর কাঁদেন। কিছুক্ষণ পরপরই তার কানে ভেসে আসে অপহৃত হয়ে যাওয়া শিশুর আওয়াজ। এই মনে হয়, তার আদরের সন্তান ফিরে এসেছে।

কান্নজড়িত কন্ঠে লিপি বলেন, আমি আমার সন্তানকে ফিরে পেতে চাই। আর কিছু চাই না। সকলের কাছেই আমার শুধু একটাই চাওয়া, আমি আমার অবুঝ শিশুটিকে আমার কোলে ফিরে পেতে চাই। আমি আমার সন্তানের মা ডাকের অপেক্ষায় আছি। আমার সাকি আমাকে মা বলে ডেকে জড়িয়ে ধরবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর