rabbhaban

‘বাবা সৌদি আরব গেছে আমার জন্য খেলনা আনতে’


সিটি করেসপন্ডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:০৯ পিএম, ৩০ আগস্ট ২০১৯, শুক্রবার
‘বাবা সৌদি আরব গেছে আমার জন্য খেলনা আনতে’

‘বাবা সৌদি আরব গেছে। এখন আসবে না। আরো পরে আসবে। আমার জন্য অনেক বড় বড় খেলনা নিয়ে আসবে। অনেকগুলা খেলনা নিয়ে আসবে।’

বাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই ভাঙাভাঙা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিল পশ্চিম দেওভোগ পূর্ব নগর এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের হামলায় নিহত মো. শাকিলের আড়াই বছর বয়সের একমাত্র সন্তান তাওহিদ ইসলাম। কিন্তু তাওহিদ এখনো জানে না তার বাবা আর কখনই ফিরবে না।

প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে বেশ ধুমধামে বিয়ে হয় মো. শাকিল ও শ্রাবন্তি বেগমের। এক বছরের মাথায় তাদের ঘর আলোকিত করে পৃথিবীতে আসে তাওহিদ। জন্মের পর থেকেই খুব চঞ্চল। একাই পুরো ঘর মাতিয়ে রাখে সে। ছোট্ট তাওহিদের কাছে মায়ের থেকে বেশি বাবার সাথে সখ্যতা ছিল। কারণ মাঝে মাঝে মা নিষেধ করলেও এক কথায় ছেলের সব আবদার হাসি মুখে পূরণ করতেন বাবা। যে কারণে প্রায় সময় বাবার কাছে নালিশ করে তাওহিদ বলত ‘মাকে নানু বাড়ি পাঠিয়ে দাও, এখানে শুধু আমি আর তুমি থাকব।’

একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বেশ সুখে শান্তিতেই কাটতে থাকে তাদের সংসার। কিন্তু এই শান্তি বেশি দিন স্থায়ী হলো না শাকিলের ছোট পরিবারে। মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে নিহত হয়ে সব শান্তি বিনষ্ট হয়ে এখন অনিশ্চয়তায় কাটছে একমাত্র সন্তান তাওহিদ ও স্ত্রী শ্রাবন্তির ভবিষ্যৎ।

শাহিনের দেওভোগ এলাকায় একটি রিকশার গ্যারেজ আছে। ভাড়া তোলার জন্য তাই প্রতিদিন রাত ৮টার দিকে বাসা থেকে গ্যারেজে যেতেন এবং রাত ১২টার দিকে বাসায় ফিরতেন। প্রতিদিন রাতে বাবাকে বিদায় দিয়ে আবার সকালে বিছানায় নিজের পাশে পেত তাওহিদ। ছোট তাওহিদ শেষ বার বাবাকে দেখেছিল গত ২৭ জুলাই। প্রতিদিনের মত সেদিন রাতেও বাবাকে রাতে বিদায় দিয়ে ঘুমিয়ে যায় সে। অন্যান্য দিন সকালে বাবাকে নিজের পাশে পেলেও সেদিন সকালে আর বাবাকে পাশে পায়নি সে।

ঘুম থেকে উঠে প্রথম প্রশ্ন ছিল বাবা কোথায়? এমন প্রশ্œে মায়ের মুখে কোনো উত্তর ছিল না। কারণ এটুকু বয়সে তাওহিদের কাছে ‘মৃত্যু’ বোধগম্য নয়। বাধ্য হয়ে শান্তনা দিতে ছেলেকে বলেন, ‘তোমার বাবা সৌদি আরব গেছে। তোমার জন্য অনেকগুলো খেলনা আনতে।’ এখনো পর্যন্ত সেই বিশ্বাসেই বসে আছে তাওহিদ। তাঁর বাবা খেলনা নিয়ে আসবে।

শুক্রবার ৩০ আগস্ট দুপুরে বাসায় গিয়ে দেখা যায় তাওহিদ বেশ শান্ত। মলিন মুখ নিয়ে মায়ের কোলে বসে আছে। বিছানার উপর অনেক খেলনা থাকলেও কোনোটাতেই যেন তাঁর মন বসছে না। কারণ তাঁর সব থেকে প্রিয় খেলনা ছিল তার বাবা।

এসময় নিহত মো. শাহিনের স্ত্রী ও তাওহিদের মা শ্রাবন্তি বেগম নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, সবাইকে প্রশ্ন করে তাঁর বাবা কোথায়। আরমা কি বুঝ দিব ওকে? তাই বাধ্য হয়ে বলেছি তোমার বাবা সৌদি আরব গেছে। আর ও এই বিশ্বাস নিয়েই আছে। কিন্তু আমার ছেলেটার এখন কি হবে। ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।

তিনি আরো বলেন, ছেলে যখন বড় হয়ে জানতে পারবে ওর বাবাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। তখন ওর মনের উপর কি প্রভাব পরবে তা ভাবতেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। এর থেকে ভয়ংকর হবে যদি ও জানতে পারে যে ওর বাবার হত্যাকারীরা এখনো রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় তখন ওর কি অবস্থা হবে। বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিতে ও নিজেওতো কিছু করে বসতে পারে।

প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমি আমার স্বমীকে হারিয়েছি। আমার এখন একটাই দাবি যারা আমার স্বামীকে হত্যা করে আমাকে বিধবা করেছে। আমার সন্তানকে এতিম করেছে তাদের যাতে ফাঁসি হয়। আমার ছেলে যাতে বড় হয়ে জানতে পারে যে তার বাবার হত্যাকারীদের বিচার আমরা পেয়েছি। অন্তত এইটুকু সান্তনা যাতে আমি আমার বাবা হারা সন্তানকে দিতে পারি প্রশাসনের কাছে আমার এইটুকুই প্রত্যাশা।

যেভাবে হয় শাকিল হত্যা
শাকিলের খুব ঘনিষ্ট বন্ধু হচ্ছে সজিব প্রধান। শাকিল ও শ্রাবন্তির বিয়েতে উকিল বাবা হন সজিব। গত ২৭ জুলাই রাতে দেওভোগ মাদ্রাসা বাজারে তুহিন, নিক্সন ও চান্দু সহ অজ্ঞাত ৭ থেকে ৮ জন দুস্কৃতিকারী তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সজিবকে হত্যার উদ্দেশ্য চাপাতি, ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তাক্ত করে। ঘটনাস্থল থেকে সজিব জীবন বাঁচানোর উদ্যেশ্যে দৌড় দিয়ে কবরস্থান গলির রহমান স্টোরের সামনে পৌছালে শাকিলকে বাঁচানোর লক্ষ্যে বাধা দেয় শাহিন। এসময় দুস্কৃতিকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে শাকিল গুরুতর জখম হয়।

পরবর্তীতে এ ঘটনা দেখে শাকিলকে বাঁচানোর জন্য শাওন এগিয়ে আসলে তাকেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে দুস্কৃতিকারীরা। এই ঘটনা ঘটিয়ে দুস্কৃতিকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সটকে পরে। পরে এলাকাবাসী আহতদের উদ্ধার করে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নেন। আহতদের মধ্যে শাকিলের অবস্থা শোচনীয় দেখে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণের কথা বলা হয় এবং ঢাকা মেডিকেলে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক শাকিলকে মৃত ঘোষণা করেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর