স্ত্রী আর দুই মেয়ের রক্তাক্ত লাশের পাশে বাকরুদ্ধ বাবা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৩:২২ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার
স্ত্রী আর দুই মেয়ের রক্তাক্ত লাশের পাশে বাকরুদ্ধ বাবা

‘মেয়ে দুটি আমার খুব আদরের ছিল। এভাবে তাদের হত্যা করা হবে কল্পনাও করতে পারি নাই। আমার সব শেষ করে দিছে। বউকে মারছে আবার দুইটা মেয়েকেও মারছে। একবারও কি নিস্পাপ দুই সন্তানকে হত্যার সময়ে হাত কাপে নাই। এত পাষাণ মানুষ হয় কিভাবে।’’

নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জে স্ত্রী ও দুই মেয়ের লাশের পাশে এভাবেই বলছিলেন বাবা সুমন মিয়া। অনেকটাই বাকরুদ্ধ অনেকটা তিনি।’

‘‘রুমের ভেতরে একটি খাট। বিপরীতে একটি ওয়ার্ডড্রপ। সেখানেই নিথরভাবে পড়ে আছে তিনটি লাশ। একজন গর্ভধারিনী মায়ের। পাশে দুই সন্তানের। তিনজনকেই হত্যা করেছে ধারালো চাকু দিয়ে আঘাত করে। তাদের রক্তে ভরে গেছে পুরো রুমটি। ছোট একটি চাকুর পাশেই ছিল একটি খেলনা। ধারণা করা হচ্ছে ওই চাকু দিয়েই হত্যা করা হয়েছে তিনজনকে। চাকুর পাশেই ছিল একটি পুতুলও।

১৯ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সকালে সিদ্ধিরগঞ্জের ১নং ওয়ার্ডের সিআই খোলা এলাকার বহুতল ভবনের ৬ তলার বাসা থেকে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ।

নিহতরা হলো সুমন মিয়ার স্ত্রী নাসরিন বেগম (২৬), তাঁর মেয়ে নুসরাত (৮) ও খাদিজা (২)। নাসরিনের বোনের মেয়ে সুমাইয়াকে (১৫) ছুরিকাঘাত করা হয়। তাকে আশংকাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘মূলত পারিবারিক কলহের জের ধরেই তিনটি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। আজ (বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টায় ঘটনাটি ঘটেছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে এ হত্যাকান্ডের ঘাতক হলেন আব্বাস। আব্বাসের সাথে তার স্ত্রীর বিরোধ ছিল। ওই বিরোধের কারণে জিদ করে আব্বাসের শ্যালিকার বাসায় স্ত্রী চলে আসে। সে একটি গার্মেন্টে চাকরি করে। বৃহস্পতিবার সকালে কারখানায় চলে যায়। শ্যালিকার সঙ্গে আলাপকালে কোন বিরোধের জের ধরেই শ্যালিকা ও তার দুই মেয়েকে হত্যা করেছে। আর আব্বাস তার প্রতিবন্ধী মেয়েকেও জখম করেছে। ইতোমধ্যে আব্বাসকে ধরতে অভিযান শুরু হয়েছে।’

সুমাইয়া হাসপাতালে পুলিশকে বলেছেন, ‘আমার বাবা আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। আমার বাবাই খালামনি নাসরিন বেগম ও তার দুই মেয়েকে হত্যা করেছে। বাবা মাদকাসক্ত ছিলেন। গতকালও আমাকে মারধর করেছে। সে কারণেই গতকাল আমি ও আমার মা খালামনির বাসায় চলে আসি।’

নিহতের স্বামী সুমন জানান, তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকার পেট্রোল পাম্পে রাতে ডিউটি শেষে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় বাসায় ফিরেন। ওইসময় বাসার দরজা খোলা ছিল। ভিতরে প্রবেশ করতেই স্ত্রী সন্তানদের লাশ দেখতে পায়। আর আহত অবস্থায় আত্মীয় সুমাইয়া পড়ে আছে। পরে অন্য ভাড়াটিয়া ও আত্মীয় স্বজনকে সহ পুলিশকে খবর দেয়। পড়ে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার শুরু করে। তবে কে বা করা করেছে এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কিছুই বলতে পারছে না।

নিহতের ছোট ভাই হাসান জানান, প্রায়ই মাদক সেবন করে আমার বড় বোনের স্বামী আব্বাস মিয়া বাড়িতে এসে মারধর করতো সকলকে। এ ঘটনায় আমার ভাগ্নি সুমাইয়া বাড়ি থেকে লুকিয়ে পালিয়ে খালার বাসায় বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) চলে আসে। পরে রাতের কোন এক সময় তাকে নিতে আসে আব্বাস। আব্বাসই তিনজনকে গলাকেটে হত্যা করে নিজের মেয়েকেও কুপিয়ে আহত করেছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক সাজ্জাদ রোমন জানান, মা ও দুই সন্তান সহ তিনজনের লাশ উদ্ধার ও আহত একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়েছে। প্রাথমিক ধারণা পারিবারিক কলহের জের ধরে ছুরিকাঘাতে তিনজনকে হত্যা করেছে। আরেকজনকে আঘাত করলে সে আহত হয়। তাকেও আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর