rabbhaban

তিন খুন এক ঘণ্টার মধ্যে!


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:১১ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার
তিন খুন এক ঘণ্টার মধ্যে!

নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জে তিন খুনের ঘটনাটি ঘটেছে মাত্র এক ঘন্টার মধ্যে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাড়ির নিচ তলার ভাড়াটিয়া নারী বলেন, নতুন ভবন তাই সব ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়াও নেই। ৬ তলার বাম পাশের ফ্ল্যাটে পরিবারটি থাকে। তাই চিৎকারের কোন শব্দ পাওয়া যায়নি। এমনিতে নির্দিষ্ট কিছু সময় ছাড়া সব সময় বাড়ির কলাপসিবল গেট তালা দেওয়া থাকে। সকালে সবাই কাজে যায় তাই সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত তালা থাকে না। এরপরই দাড়োয়ান তালা দিয়ে রাখে। আর চাবি সকলের কাছেই আছে। ধারণা ওই এক ঘণ্টার মধ্যেই হত্যা করেছে পালিয়েছে ঘাতক।

বৃহস্পতিবার সকালে নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জের ১নং ওয়ার্ডের সিআই খোলা এলাকার আনোয়ার হোসেনের মালিকানাধীন ছয় তলার ভবনের ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাটে নৃশংস ওই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। পুলিশ লাশ তিনটি উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য ১০০ শয্যা বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে।

নিহতরা হলো সুমন মিয়ার স্ত্রী নাসরিন বেগম (২৬), তাঁর মেয়ে নুসরাত (৮) ও খাদিজা (২)। গুরুতর জখম নাসরিনের বোন ইয়াসমিনের মেয়ে সুমাইয়াকে (১৫) আশংকাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

মা ও দুই মেয়েকে গলাকেটে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আব্বাস মিয়াকে আটক করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় সিদ্ধিরগঞ্জের পাওয়ার হাউজের সামনে থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

নিহত নাসরিনের বড় বোন ইয়াসমিন বলেন, প্রতিবন্ধী মেয়ে সুমাইয়াকে মারধরের কারণেই সে বুধবার রাতে ছোট বোন নাসরিনের বাসায় চলে আসি। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় আমি বাসা থেকে বের হয়ে গার্মেন্টে চলে যাই। সকাল ১০টার পরে জানতে পারি মার্ডার হয়েছে।

জানা গেছে, নাসরিন বেগম ও ইয়াসমিন দুই বোন। তাদের বাড়ি বরিশালের পটুয়াখালীতে। নাসরিনের স্বামীর নাম সুমন মিয়া। সে সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকার জোনাকি নামের একটি পেট্রোল পাম্পে চাকরি করেন। আর ইয়াসমিন সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীতে সুপ্রীম গার্মেন্টের অপারেটর। ইয়াসমিনের স্বামী আব্বাস মিয়া কিছু করেন না। মূলত তিনি মাদকাসক্ত। তাদের সুমাইয়া নামের ১৫ বছরের মেয়ে আছে। সে শারীরিক ও কিছুটা মানসিক প্রতিবন্ধী। মাদকের টাকার জন্য প্রায়শই বাড়িতে সুমাইয়াকে মারধর করতো আব্বাস। এছাড়া স্ত্রী ইয়াসমিনকেও মারধর করতো। এসব কারণে প্রায়শই মেয়ে সুমাইয়াকে নিয়ে নাসরিনের বাসায় চলে আসতো।

ইয়াসমিন বলেন, ‘আমার স্বামী নেশা করতো। এসব নিয়ে আমাদের মধ্যে নিয়মিত ঝগড়া হতো। কোন কাজ করতো না। আমার বেতনের টাকা নিয়ে নেশা করতো। মেয়েকেও মারধর করতো। প্রতিবন্ধী মেয়ে সুমাইয়াকে মারধরের কারণেই সে বুধবার রাতে ছোট বোন নাসরিনের বাসায় চলে আসি। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় আমি বাসা থেকে বের হয়ে গার্মেন্টে চলে যাই। সকাল ১০টার পরে জানতে পারি মার্ডার হয়েছে।’

নিহত নাসরিনের ছোট ভাই হাসান মিয়া বলেন, ‘মাদক সেবন করে আমার বড় বোনের স্বামী আব্বাস মিয়া বাড়িতে সকলকে মারধর করতো। এর আগে এ নিয়ে অনেক কিছু ঘটেছে। বার বার তাকে বলার পরেও সঠিক পথে আসেনি। বুধবার পরে জিদ করে আমার বোন ভাগ্নি সুমাইয়াকে নিয়ে আরেক বোন নাসরিনের বাসায় চলে আসে।’

দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘মূলত পারিবারিক কলহের জের ধরেই তিনটি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। আজ (বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টায় ঘটনাটি ঘটেছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে এ হত্যাকান্ডের ঘাতক হলেন আব্বাস। আব্বাসের সাথে তার স্ত্রীর বিরোধ ছিল। ওই বিরোধের কারণে জিদ করে আব্বাসের শ্যালিকার বাসায় স্ত্রী চলে আসে। সে একটি গার্মেন্টে চাকরি করে। বৃহস্পতিবার সকালে কারখানায় চলে যায়। শ্যালিকার সঙ্গে আলাপকালে কোন বিরোধের জের ধরেই শ্যালিকা ও তার দুই মেয়েকে হত্যা করেছে। আর আব্বাস তার প্রতিবন্ধী মেয়েকেও জখম করেছে।’

রাতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইনে সংবাদ সম্মেলনে তিন খুনের ঘাতক আব্বাস মিয়াকে হাজির করা হয়। ওই সময়ে জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ গণমাধ্যমকে জানান, ‘বৃহস্পতিবার সকালে হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুপুরে আব্বাসকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে ইতোমধ্যে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবদে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। ইতোমধ্যে সে জানিয়েছে শ্যালক ভায়রা তাকে একদিন চড় মারছে। এ কারণেই জিদ ছিল। প্রায়শই আব্বাসের স্ত্রী ও মেয়ে নাকি শ্যালক ও শ্যালিকার বাসায় চলে যেত। তাই সে মনে মনে ঠিক করে এ বাড়ির অস্তিত্বই রাখবেনা যাতে করে আর এ বাড়িতে না আসতে পারে তার পরিবার।

এসপি জানান, তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে স্থান শনাক্ত করে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার হাউসের পাশের একটি কমিউনিটি সেন্টারের পর্দা ঘেরা টেবিলের নিচ থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে জানায় প্রথমে শ্যালিকাকে গলা কেটে হত্যা করে পরে একে একে শ্যালিকার দুই সন্তানকে হত্যা করে সে। সবার শেষে নিজের প্রতিবন্ধী মেয়েকে সামনে পেয়ে তাকেও কুপিয়ে জখম করে দ্রুত পালিয়ে যায় সে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর