নারায়ণগঞ্জে অর্ধলাখ চলন্ত বোমা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৭:০১ পিএম, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, সোমবার
নারায়ণগঞ্জে অর্ধলাখ চলন্ত বোমা

নির্দিষ্ট সময়ে পুনরায় পরীক্ষার নিয়ম থাকলেও তা মানছেন না বেশীরভাগ মালিকরাই। অনেকেই গাড়িতে ব্যবহার করছেন মেয়াদোত্তীর্ণ ও মানহীন গ্যাসের সিলিন্ডার। দিন যত গড়াচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডারের বয়স ততই বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। প্রায় ৮০ শতাংশ সিলিন্ডারই পুনরায় পরীক্ষার বাইরে রয়েছে। যে কারণে নারায়ণগঞ্জে চলাচলরত কয়েক হাজার গাড়ি পরিণত হয়েছে একেকটি চলন্ত বোমায়। গত কয়েক বছরেই নারায়ণগঞ্জের বেশ কিছু গাড়ির গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ঘটেছে হতাহতের ঘটনা। এখনই সচেতন না হলে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা সচেতন মহলের। তবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক রি টেস্ট সেন্টার ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমে এ বিপর্যয় মোকাবিলা করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ১৯ বছর আগে পরিবেশ রক্ষায় সবুজ জ্বালানি হিসেবে গাড়িতে সিএনজি ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সঠিক মনিটরিং এবং গাড়ির মালিকদের উদাসীনতার কারণে তা চলন্ত বোমায় পরিণত হচ্ছে, বেড়েছে ঝুঁকি এবং আতঙ্ক।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের পাশাপাশি গাড়িতে নি¤œমানের সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে। ভালো একটি সিলিন্ডারের দাম ৩০ হাজার টাকার বেশি। সেখানে কম দামে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় একটি সিলিন্ডার লাগাচ্ছে। লেগুনা ও ছোট গাড়িগুলোয় গাড়ির সিলিন্ডারের বদলে অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে যাত্রীদের জীবন।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) হিসাব অনুযায়ী, সিএনজি গ্যাসের সিলিন্ডারের বয়স ৫ বছরের বেশি সময় অতিক্রম করা গাড়ির সংখ্যা ৫ লাখেরও বেশি। এগুলোর ৮০ শতাংশই পুনঃপরীক্ষা করা হয়নি। প্রতিটি গ্যাসের সিলিন্ডার ৫ বছর পরপর রি-টেস্টের বিধান রয়েছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার নিয়েই কয়েক লাখ যানবাহন রাস্তায় চলাচল করছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ৫ বছর পর পর সিলিন্ডার রি-টেস্ট করার বিধান থাকলেও অনেক ব্যবহারকারী বিষয়টি এড়িয়ে যান। মাত্র ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকায় গ্যাসের সিলিন্ডার পরীক্ষা করা যায়। বিস্ফোরক অধিদপ্তরে এ পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা। তবে বেশীরভাগ গাড়ির গ্যাসের সিলিন্ডার রি টেস্ট করে দেখা হয়না। সিলিন্ডার পুনরায় পরীক্ষার সনদ ছাড়া সিএনজিচালিত গাড়িগুলোয় গ্যাস দেওয়া হবে না বলে গেল জুলাই মাস থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এ সিদ্ধান্ত মানা হচ্ছে না। পুনরায় পরীক্ষা ছাড়াই গাড়িতে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। তাই, বিস্ফোরক পরিদপ্তর সারা দেশের ৬০০টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনকে স¤প্রতি চিঠি দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৩ হাজার পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয়। এ চাপে ভরা গ্যাস সিলিন্ডার যথাযথ না হলে বড় রকমের অঘটন ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। বড় বাস-ট্রাকের বিস্ফোরণের ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ বাস-ট্রাক ছয় থেকে আটটি সিলিন্ডার থাকে। তারা বলেন, আইন করে যদি বিআরটিএ’র ফিটনেস নেওয়ার সময় সিলিন্ডার রি-টেস্ট করানো বাধ্যতামূলক করা যায়, তাহলে এ ধরনের ঝুঁকি কমবে। এখনই সঠিক পদক্ষেপ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করতে না পারলে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা মতামত দেন।

যানবাহন সিএনজিতে রূপান্তরের পর তা নিয়মিত রি-টেস্ট হয় কি না, দেখার দায়িত্ব বিস্ফোরক পরিদপ্তরের। এ প্রতিষ্ঠানটি রি-টেস্ট ওয়ার্কশপেরও অনুমোদনও দেয়। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান মো. সামসুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাসের সিলিন্ডারে বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়ে। আর গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটলে হতাহতের ঘটনা অনিবার্য। প্রাইভেট কারের গাড়ির মালিক নিজেই চলাচল করেন। তারপরও তিনি জেনে-বুঝে নিয়মিত সিলিন্ডারটি পরীক্ষা করাচ্ছেন না। ফলে ঝুঁকিতে থাকছেন তিনি নিজেই। বিস্ফোরক অধিদপ্তর সচেতন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন কৌশল নিচ্ছে। তিনি আরও জানান, ৫ বছর পর সিলিন্ডার রি-টেস্ট করতে হয়। কিন্তু শুরুতে রি-টেস্টেও আগ্রহ ছিল না গাড়ির মালিকদের। কিন্তু এখন রিটেস্টের আগ্রহ বাড়ছে। তবে গাড়িতে সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের যে খবর আমরা দেখি সেগুলোর সবই আসলে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ নয়। কয়েকটি কারণে বিস্ফোরণ হয়। দুটি গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে ফেটে যেতে পারে। অথবা সিলিন্ডার ছাড়া অন্য যে ক’টি আছে, তার কারণে আগুন ধরে যেতে পারে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের ৫টি উপজেলায় কি পরিমাণ যানবাহন প্রতিদিন চলাচল করতে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও নারায়ণগঞ্জে চলাচলরত সব ধরনের যানবাহনের সংখ্যা অর্ধ লাখের বেশীই হবে। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও রায়েরবাগ এলাকায় দু’টি রি-টেস্ট বা পুনঃ পরীক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়াও আরো কয়েকটি রি-টেস্ট সেন্টার রয়েছে। তবে বেশীরভাগেরই মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে প্রাইভেটকার ছাড়াও বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা সিএনজিচালিত চলাচল করলেও এগুলোর মালিক কিংবা চালক গ্যাস সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার ব্যাপারে নির্বিকার ও উদাসীন। ফলে এসব যানবাহন গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে ধীরে ধীরে `বোমাবাহী` গাড়ির ন্যায় বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, যেগুলোর গ্যাস সিলিন্ডার যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে এবং ঘটছেও তাই।

সর্বশেষ গত ১৮ অক্টোবর সকালে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনপুরস্থ রাফি পেট্রোল পাম্পের সামনে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বরযাত্রী বাহি মেঘালয় ট্রান্সপোর্টের একটি বাসে (চট্ট মেট্রো জ ১১-১৮৮৮) অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। তবে এতে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

২০১৮ সালের ১৭ জুলাই রাজশাহী থেকে অপহৃত স্কুল ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বর্নাকে উদ্ধার শেষে ফিরে আসার সময় টাঙ্গাইল শহরের কুমুদিনী কলেজ মোড়ে একটি পুলিশবাহী মাইক্রোবাসের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ চারজন আহত হন। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও চৌধুরীবাড়ী এলাকার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বর্না (১৯), তার খালাতো ভাই ফারুক (৪২) এবং মামা সিরাজুল ইসলাম (৫৫)। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তানভীর আহমেদ জানান, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানা থেকে মাইক্রোবাস নিয়ে তারা কয়েকজন পুলিশ সদস্যসহ অপহৃত জান্নাতুল ফেরদৌস বর্নাকে উদ্ধার করতে রাজশাহী যায়। সেখান থেকে ফেরার পথে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড সিএনজি পাম্প থেকে গ্যাস নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের উদ্দেশে রওনা হয়। শহরের কুমুদিনী কলেজ মোড় সড়কে স্পিড ব্রেকারের প্রচ- ঝাঁকুনিতে মাইক্রোবাসের পিছনে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে মুর্হূতের মধ্যেই গাড়িতে আগুন লেগে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই জান্নাতুল ফেরদৌস বর্না ও তার খালাতো ভাই ফারুক নিহত হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় পাঁচজনকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে বর্নার মামা সিরাজুল ইসলামের মৃত্যু হয়। অন্য আহতরা হলেন, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানার এসআই তানভীর (৩৩), এএসআই হাবিব (৩০), পুলিশ কনস্টেবল আজাহার (৪৫) ও মাইক্রোবাস চালক মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া এলাকার আকতার (৩৫)। তাদের টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার কাঁচপুরের নয়াবাড়ি এলাকায় কুমিল্লাগামী জৈনপুর পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লেগে আহত হন ৩ জন।

২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে একটি কাভার্ড ভ্যানের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে চালক ও হেলপার দগ্ধ হন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ বিস্ফোরণ। কাভার্ড ভ্যানটির চারদিকে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। এরই মধ্যে চিৎকার, করুণ আর্তনাদ লোকজন ছুটে এসে টেনে বের করলো দুই ব্যক্তিকে। শরীরের অনেকাংশই পুড়ে গেছে তাদের। বাঁচার আকুতিকে তাড়াহুড়া করে তাদের নেয়া হলো হাসপাতালে। এদের একজন চালক সোহেল রানা অপরজন হেলপার সেলিম হোসেন। সোহেল রানা বলেন, কভার্ডভ্যানটি একটি কুরিয়ার সার্ভিসের। গাজীপুরের বিভিন্ন কারাখানা থেকে তৈরি পোশাক নিয়ে নারায়ণগঞ্জ আসার পথে লিংক রোডের লামাপাড়া ইকোপার্কের সামনে আসার পরপরই গ্যাস সিলিন্ডার বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। এতে ভ্যানের সামনের ২ চাকা এবং ভ্যানের বাম পাশের পুরো অংশ ও ভ্যানে থাকা তৈরি পোশাক পুড়ে যায়। আগুনে দগ্ধ হন তিনি ও হেলপার সেলিম হোসেন।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক (ইঞ্জি:) সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরী জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে ৫ হাজার ৬০০ টি সিএনজি চালিত বেবীট্যাক্সি রেজিষ্ট্রেশন নিয়েছেন। এছাড়া প্রাইভেটকার রেজিষ্ট্রেশন অনেক কম। গণপরিবহন অর্থাৎ বাসের সংখ্যাও অনেক কম। বেশীরভাগ প্রাইভেটকার, মাইক্রো, হাইএইস, বাস ও ট্রাক ঢাকা থেকে রেজিষ্ট্রেশন নেয়। আর গাড়িগুলো যেখান থেকে রেজিষ্ট্রেশন নেয় সেখানেই ফিটনেস দেখার সময় গ্যাসের সিলিন্ডারেরও পরীক্ষা করে দেখা হয়। যে কারণে নারায়ণগঞ্জে চলাচল করলেও বেশীরভাগ গাড়ির সিএনজি রি-টেস্ট আমরা করতে পারিনা।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর