নারায়ণগঞ্জে ৭ দিনে ৯ লাশ


সিটি করেসপন্ডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:৪৩ পিএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, শুক্রবার
নারায়ণগঞ্জে ৭ দিনে ৯ লাশ

নারায়ণগঞ্জে লাশের মিছিল ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। লাশ উদ্ধার, হত্যাকা-ের সাথে তাল মিছিলে নানা ঘটনায় লাশের মিছিলে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সংখ্যা যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে মৃত্যুপুড়িতে পরিণত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ।

৮ ফেব্রুয়ারী থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ড, লাশ উদ্ধার, সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা সহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় লাশের মিছিলের সচিত্র তুলে ধরা হল। ৫টি লাশ উদ্ধার, বিদ্যুৎ স্পৃষ্টে একজন, আত্মহত্যা একজন এবং সড়ক দুর্ঘটনা সহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ২ জন মৃত্যুবরণ করেছে, এ সপ্তাহে মোট ৯টি লাশ ঝরেছে।

১৩ ফেব্রুয়ারী বন্দরে শুভকরদী চরধলেশ^রী নদীতে অজ্ঞাত যুবকের (৩২) মরদেহ উদ্ধার করেছে কলাগাছিয়া নৌ-ফাঁড়ি পুলিশ। বিকেল সাড়ে ৩টায় বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া চরধলেশ^রী নদীতে এ মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বন্দর কলাগাছিয়া চরধলেশ^রী নদীতে গোসলের উদ্দেশ্যে অজ্ঞাত যুবক পানিতে ডুব দেয়। পরে নদীর ধারে এমভি নাহাতাজ-০ বাল্কহেড’র লস্কর মোঃ আরিফুল ইসলাম দেখতে পায় গোসল করতে নামা যুবকটি নদীর পানিতে হাবুডুবু খেয়ে গভীর পানিতে নিমজ্জিত হয়ে তলিয়ে যায়।

১২ ফেব্রুয়ারী সিদ্ধিরগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসমান নবজাতকের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গোদনাইল মিরপাড়া এলাকায় স্থানীয়রা শীতলক্ষ্যা নদীতে লাশটি ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দিলে দুপুর আড়াইটায় পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করে।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এসআই মির্জা শফি জানান, শিশুটির মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, দুই একদিন আগে শিশুটির জন্ম হয়েছে এবং কেউ নবজাতকটিকে হত্যার উদ্দেশ্যে নদীতে ফেলে দিয়েছে।

১১ ফেব্রুয়ারী রূপগঞ্জে অজ্ঞাত (৩২) যুবকের লাশ উদ্ধার করেছেন রূপগঞ্জ থানা পুলিশ। রাত ৮ টায় তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়া বটতলা খেয়াঘাট এলাকার শীতলক্ষ্যা নদী থেকে অজ্ঞাত লাশটি উদ্ধার করা হয়।

রূপগঞ্জ থানার ওসি মাহমুদ হাসান জানান, নোয়াপাড়া এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে অজ্ঞাত যুবকের লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে লাশ উদ্ধার করে। এখন পর্যন্ত নিহতের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে থানায় মামলা হয়েছে। ময়না তদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হবে।

১১ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার ভূইগড় এলাকায় এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে ফতুল্লার ভূইগড়ে নিজ বাড়ি থেকে জসিমউদ্দিনের (৪২) লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ। মৃত জসিমউদ্দিন ভূইগড় উত্তরপাড়া এলাকার নিজ বাড়িতে থাকতেন। সে নোয়াখালী চাটখিল শ্রীনগর এলাকার মৃত নুরুল হক মৃধার পুত্র।

ভূইগড় উত্তরপাড়া এলাকার বাসিন্দারা জানান, যুবকটির পিতা মৃত নুরুল হক মৃধা সিআইডির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি এখানে ৪ শতাংশ জমির উপরে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। মৃত জসিমউদ্দিন ৮/১০ বছর পূর্বে সাউথ আফ্রিকা থেকে দেশে ফিরে আসেন। তার স্ত্রী ও সন্তান ছিল। কিন্তু জসিমউদ্দিন কোন কাজকর্ম করতোনা। যে কারণে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। বাবার পেনশনের টাকার উপরেই জসিমউদ্দিন চলতো। সম্প্রতি জসিমউদ্দিন তার বাড়ি বিক্রির জন্য সাইনবোর্ড সাটিয়েছিল। তবে দামে বনিবনা না হওয়ায় বিক্রি করতে পারেনি। মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় লোকজন জসিমউদ্দিনের বাড়ির পাশের ডোবা পরিস্কার করে মাছ ধরতে গেলে দুর্গন্ধ পায়। পরে জসিমউদ্দিনের ঘরে ঢুলে ঘরের ভেতর লাশ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেয়।

১০ ফেব্রুয়ারী নিখোঁঁজ বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার করেছে বন্দর থানা পুলিশ। রাতে বন্দর উপজেলার হড়িবাড়ি একটি পুকুর থেকে ওই মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত বৃদ্ধের নাম আলী আজম (৫৪)। তিনি হড়িবাড়ি গ্রামের মৃত হাসমত আলী ডাক্তারের ছেলে। লাশ উদ্ধারের সংবাদ পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন বন্দর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শুল্কা সরকার।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অসুস্থ বৃদ্ধ আলী আজম গত সোমবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হয়। প্রতিবেশী নারী বৃদ্ধাকে পুকুর পাড় দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে বিষয়টি নিখোঁজের পরিবারকে জানায়। এলাকাবাসী পুকুরে নেমে বৃদ্ধাকে খুঁজতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুজির পর না পেয়ে রাতে বন্দর থানা পুলিশকে অবগত করে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বন্দর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল দিয়ে পুকুরে তল্লাসী চালিয়ে ব্যর্থ হয়। পরে ঢাকা ফায়ার সার্ভিসের ৩ সদস্য একটি ডুবুরী দল ওই রাতে পুকুরে তল্লাশী চালিয়ে রাত সাড়ে ১০ টার দিকে নিহত বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার করেন। পরিবারের কোন অভিযোগ না থাকায় বন্দর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শুল্কা সরকার লাশ দাফন করার অনুমতি প্রদান করেন।

১০ ফেব্রুয়ারী ফতুল্লায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মফিজ মৃধা (৪৫) নামে এক ব্যক্তি মারা গেছে। বিকেলে ফতুল্লার বক্তাবলী এলাকায় এনবিএম ব্রিক ফিল্ড নামে ইটভাটায় ওই ঘটনা ঘটে। নিহত মফিজ মৃধা বরগুনা জেলার আমতলী এলাকার মৃত সোনালী মৃধার ছেলে। সে ওই ব্রিক ফিল্ডের শ্রমিক।

ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আসলাম হোসেন জানান, বিকেল ৩টায় ইটভাটার মোটরের সুইচ অন করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় মফিজ মৃধা। পরে অন্য সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে শহরের খানপুর এলাকার ৩০০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

১০ ফেব্রুয়ারী রূপগঞ্জে তারাব পৌরসভা যুবলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল আউয়ালের রাখা সয়াবিনের গরম বর্জ্যে পড়ে গিয়ে দগ্ধ হয়ে আশরাফুল মিয়া (১৩) নামে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়।

নিহতের বাবা বাবুল মিয়া জানান, গত ৬ ফেব্রয়ারী রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আশরাফুল ইসলাম গরম সয়াবিনের বর্জ্যে পড়ে যায়। আশরাফুলের চিৎকারে বন্ধু নাজিম মিয়া (১৩) বাচাঁতে গেলে সেও বর্জ্যে পড়ে দগ্ধ হন। পরে পরিবারের লোকজন আশরাফুল ইসলাম ও নাজিম মিয়াকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সোমবার ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আশরাফুল মিয়ার মৃত্যু হয়।

৯ ফেব্রুয়ারী বন্দরে আমির হোসেন (৩৫) নামে মাদকসেবী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। রাতে বন্দর থানার নবীগঞ্জ নোয়াদ্দা এলাকায় এ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।

নিহতের বোন হাসনা বেগম জানান, তার ভাই একজন মাদকসেবী। বিভিন্ন সময় সে মাদক সেবন করে বাড়িতে এসে উৎপাত করতো। রোববার রাতে প্রতিদিনের মতো সে তার ঘরে ঘুমাতে যায়। রাতের যে কোন সময় নিহত আমির হোসেন নিজের পড়নের লুঙ্গি ছিঁড়ে গলায় পেচিয়ে ঘরের আড়ার সাথে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে। পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। এ ব্যপারে বন্দর থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।

৯ ফেব্রুয়ারি আড়াইহাজার উপজেলায় সিএনজি ধাক্কায় আলী হোসেন নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তার স্ত্রী আহত ঝর্না বেগম আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন। সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। তিনি স্থানীয় ফতেপুর ইউপির বগাদী মোল্লাপাড়া এলাকার জসিম উদ্দিনের ছেলে।

এর আগে (৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় আড়াইহাজার দক্ষিণপাড়া জোলাপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর সিএনজি চালক পালিয়ে গেলেও এলাকাবাসী সিএনজিটি আটক করে। অন্যদিকে নিহতের স্ত্রী আহত ঝর্না বেগমের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন আছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর