জানাযা দিতে পারেনি দগ্ধরা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:৪২ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, মঙ্গলবার
জানাযা দিতে পারেনি দগ্ধরা

নারায়ণগঞ্জ সাইনবোর্ড সাহেবপাড়া এলাকার একটি ৫ তলার ভবনের নিচ তলায় বাসায় জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ হয় একই পরিবারের ৮ জন। ইতোমধ্যে মারা গেছে নূরজাহান বেগম (৭০) ও তার ছেলে কিরণ মিয়া (৫০)। এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন আরো ৬ জন। ১৮ ফেব্রুয়ারী কিরণ ও ১৭ ফেব্রুয়ারী ঘটনার পর মারা যান নূরজাহান। তাদের লাশ দাফনের সময় সন্তানেরা উপস্থিত থাকতে পারছেন না। উল্টো তারা যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন হাসপাতালের বেডে।

মানবজমিনের সংবাদে দগ্ধ নুরজাহান বেগমের মেয়ের জামাতা মো. ইলিয়াস জানান, নিহত নুরজাহানের স্বামীর গ্রামের বাড়ি নরসিংদী জেলার শীবপুর উপজেলার কুমড়াদি গ্রামে। ১৮ বছর আগে নুরজাহানের স্বামী মারা যান। এরপর থেকে দুই ছেলে, তাদের স্ত্রী ও নাতি-নাতনীর নিয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকার সাহেবপাড়ার একটি বাড়ির নিচ তলায় ১৪ বছর ধরে ভাড়া থাকেন। তার ছেলে হীরণ ও কিরণের সাইনবোর্ডে ‘নরসিংদী গার্মেন্টস’ নামে একটি গেঞ্জির কারখানা আছে। আর ওই কারখানারই শো-রুম রাজধানীর গুলিস্তানের ‘ঢাকা ট্রেড সেন্টারের’ আন্ডারগ্রাউন্ডে। পুরো ব্যবসাটি হীরণ, কিরণ ও কিরণের ছেলে ইমন সামলান। তারা সবাই একসঙ্গেই থাকেন। ৫ মাস আগে ইমন বিয়ে করেছেন। তার স্ত্রীর নাম শামীমা সিদ্দিকী। ঘটনার তিন দিন আগে তিনি বাবার বাড়িতে চলে যান।

নিহত নুরজাহানের প্রতিবেশী ও মেয়েদের সঙ্গে সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাহেবপাড়া এলাকায় দিনের বেলা গ্যাস থাকে না। মধ্যে রাত থেকে ভোরবেলা পর্যন্ত গ্যাস থাকে। বছরের বেশিরভাগ সময়ই ওই এলাকার বাসিন্দরা গ্যাস সংকটে ভোগেন। বেশিরভাগ সময় গ্যাস না থাকার কারণে অনেকই চুলার সুইচ সচল করে রাখেন। সোমবারও নুরজাহান বেগমদের চুলার সুইচ দেয়া ছিল। ভোরবেলা তড়িগড়ি করে রান্না শেষ করার জন্য নুরজাহান বেগম প্রথমে চুলায় যান। চুলার সুইচ দেয়া থাকায় পুরো ঘরে আগে থেকেই গ্যাস ছড়িয়ে যায়। কারণ ঘরের সবকটি দরজা জানালা বদ্ধ অবস্থায় ছিল। সেটি আন্দাজ করতে পারেননি বয়ষ্ক নুরজাহান। তাই তিনি আগুন ধরাতে গেলেই বিস্ফোরণ হয়ে যায়। আগুনের ধাক্কা এসে ড্রথমে তার ওপর লাগে। পরে তিনি চিৎকার করতে থাকেন। এছাড়া গ্যাসের আগুন হওয়াতে দ্রুত বাসা সবকটি কক্ষে আগুন ছড়িয়ে যায়। এতে করে বাসার অন্যান্য স্বজনরাও টের পেয়ে যান। পরে তারাও দগ্ধ হয়ে যান।

নাসিমা বেগম নামের এক প্রতিবেশী জানান, ছেলেরা তাদের বয়স্ক মাকে বাঁচানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু তিনিই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে যান। ভোর বেলা হওয়াতে আশেপাশের বাসিন্দাদের অনেকেই ঘুমের মধ্যে ছিলেন। তাই আগুন লাগার বিষয়টি অনেক দেরীতে টের পান সবাই।

হিরণ ও কিরণদের কারখানার কর্মচারী রাহেলা বেগম বলেন, আমি হিরণ ও কিরণদের কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করি এবং আমার বাসাও সাহেবপাড়া এলাকায়। ওই এলাকায় শীত-গরম সবসময়ই গ্যাসের সমস্যা। গ্যাসের চুলা চালু দিলেও গ্যাস আসে না। এজন্য ওই এলাকার সবাই রাতে ঘুমানোর আগে চুলার সুইচ বন্ধ করে না। তবে তাদের বাসায় গ্যাস আসার পর আর বন্ধ করা হয়নি। তাই গ্যাস ছড়িয়ে যায় বাসায়।

তিনি বলেন, আগুনের লাগার সময় ওই বাসায় কিরণের স্ত্রী লিপি বেগম ও মেয়ে ইকরাও ছিলো। ঘরে আগুন লেগে যাওয়ায় ইমন তাদেরকে দরজা দিয়ে না বের করে শাবল দিয়ে বারান্দার গ্রিল ভেঙে তার নিচ দিয়ে বের করেন। এজন্য তারা ২ জন দগ্ধ হয়নি। তবে তাদের বের করতে গিয়ে ইমন দগ্ধ হয়। পরে তাকেও রুম থেকে বের করা হয়। ইমনের ফুপাতো ভাই কাউছার স্থানীয় নিরাপদ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ৮ম শ্রেণিতে পড়ে। তার বাবা সৌদি প্রবাসি। তারা ৩ ভাই ২ বোন। মা বাকি ভাই বোনদের নিয়ে কুমিল্লাতে থাকেন। আর কাউসার নানি নুরজাহানের কাছে থাকতো।

নুরজাহানের তিন মেয়ে। তাদের প্রত্যেকেরই বিয়ে হয়েছে আরো অনেক আগে। আগুন লাগার খবর পেয়ে তারা সবাই ছুটে এসেছেন বার্ন ইউনিটে। একদিকে ভাই, ভাবী ও তাদের সন্তানদের আইসিইউসে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে দগ্ধ হয়ে তাদের মা না ফেরার দেশে চলে গেছেন। এই শোকে তারা নিজেদেরকে ধরে রাখতে পারছিলেন না। তাদের আহাজারিতে ঢামেকের পরিবেশ ভারী হয়ে আসছিলো। নুরজাহানের মেয়ে কুলসুম বলেন, আগুনে পুড়ে সব ছাই হয়ে গেছে। আমার ভাইদের আর কিছুই রইলো না। এখন আবার নতুন করে সবকিছু কিনতে হবে। আমাদের মাকেও আগুন কেড়ে নিয়েছে। আরেক মেয়ে পারভিন বলেন, খবর পেয়ে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে এসেছি। এ ঘটনায় আমার বড় ছেলে কাওসার আহমেদও দগ্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, কাউকে শান্তনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলেছেন, জমে থাকা গ্যাস থেকেই এই বিস্ফোরণ হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক সার্জন আ ফ ম আরিফুল ইসলাম নবীন বলেন, আহতদের শরীরের অবস্থা দেখে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর