১০০ টাকার মাল ১৫০০


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:৪৪ পিএম, ০৩ জুলাই ২০২০, শুক্রবার
১০০ টাকার মাল ১৫০০

করোনায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য নারায়ণগঞ্জ শহরের ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে (কোভিড ডেডিকেটেট হাসপাতাল) নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে রাজশাহীতে বদলী করা হলেও পার পাচ্ছেন না সেই আলোচিত পিএ সিদ্দিকুর রহমান।

বৃহস্পতিবার ২ জুলাই দুপুরে শহরের খানপুর এলাকায় হাসপাতালটিতে ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিটের উদ্বোধনকালে এ হুশিয়ারী দেন নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান। যিনি একই সঙ্গে ৩০০ শয্যা হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সভাপতি।

ওই সভায় এমপি সেলিম ওসমান বলেছেন, ‘এ হাসপাতালের একজন টাইপইস্ট থেকে তত্ত্বাবধায়কের পিএস হয়ে গেলেন। তার জন্য কোন তত্ত্বাবধায়কই স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারতো না। আমি তদন্ত চেয়ে ছিলাম। কিন্তু তাকে বদলী করে দেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের মানুষের চাহিদা হোক, কেন ওই চোরকে রাজশাহী পাঠিয়ে দেয়া হলো। কেন তার বিচার নারায়ণগঞ্জ শহরে হবে না? যার নাকি আমার জানা মতে, নারায়ণগঞ্জে ৩টি বাড়ি আছে, বিভিন্ন ক্লিনিকে শেয়ার রয়েছে। আমি যখন নিজে নিজে অডিট করেছি তখন দেখেছি ১০০ টাকার মাল ১৫০০ টাকা, রোগীদের খাবারের মধ্যে চুরি, আমি দুই বছরের গ্যারান্টি সহ ফ্যান দিয়েছি সেগুলো কোথায় গেল, একটি গভীর নলকূপ বসানোর পরও কেন আরেকটি গভীর নলকূপ বসানো হলো। কারণ ওইটার মধ্যে ঠিকাদারী আছে।’

পরে তিনি নিজ থেকে সাংবাদিকদের বলেন, ‘চুরি যারা করেছে তাদের প্রত্যেকের নাম তদন্তের পর প্রকাশ করা হবে।’

সেলিম ওসমানের আহবানের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আর হাসপাতাল পরিচালনা কমিটি তদন্ত করে পদক্ষেপ গ্রহন করবেন। যদি আমাদের কাছে লিখিত কোন অভিযোগ দেয় তাহলে আমরাও সেটা ডিজি হেলথের কাছে পাঠিয়ে দিবো। কিংবা হাসপাতালের সুপারকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলবো। কারণ হাসপাতালটি আমাদের অধীনে না।’

জানা গেছে, ওয়ান ইলেভেনের পরে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালের দুর্নীতিবাজ এবং লুটপাটকারী ঠিকাদার চক্রের হিসাবের রক্ষণাবেক্ষনকারী সুপারের পিএ সিদ্দিকসহ ১৯ জন কর্মকর্তা কর্মচারীদের দুদকের সুপারিশে নারায়ণগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বদলী করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মাসখানেকের জন্য এমন বদলীর পর ফের এই শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ফিরে আসে পূর্বের চেয়ারে। এরপর আর পিএ সিদ্দিকসহ এই চক্রের হোতাদের কেউ আর থামাতে পারে নাই।

সরকারী এই হাসপাতালের উদ্বোধনের শুরুতে চাকরিতে (এমএলএসএস) চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হিসেবে যোগ দিয়ে সেই সিদ্দিক বর্তমানে শত কোটি টাকার মালিক। একাধিক বহুতল বাড়ী, একাধিক গাড়ি, একাধিক নামে বেনামে ব্যবসা, কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স থাকার পরও তাকে থামানো যায় নাই অপরাধ প্রবণতা থেকে। এই পিএ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় কোন ধরনের আইন না মেনে নারায়ণগঞ্জের অসংখ্য সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পিএ সিদ্দিক। তার নেপথ্যে শহরের একটি প্রভাবশালী চক্রের শেল্টার ছিলো সব সময়।

গত ২১ জুন বিকেল ৪টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে খানপুর ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল এর জেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির মাসিক সভা শেষে সেলিম ওসমান সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমাদের এই হাসপাতালের নামে অনেক বদনাম রয়ে গেছে। সেটি নিয়েই আমরা আজকে সভায় দীর্ঘ আলোচনা করে দেখেছি দীর্ঘ দিন ধরে এই হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের পিএ তার কোন বদলী নেই। সে দীর্ঘদিন রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে তার কোন বদলী নেই। সেই টেন্ডার পরিচালনা করে সেই টেন্ডার দেয়। বিভিন্ন এন্টার প্রাইজের নাম দিয়ে খানপুর এলাকার একই ব্যক্তি এই টেন্ডার নিয়ে থাকে। সময় কাল ক্ষেপন করে একটি ইংরেজি পত্রিকায় টেন্ডারের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। যা সাধারণ মানুষ জানতে পারেনা টেন্ডারেও অংশ নিতে পারেনা। হাসপাতালে অনেক সমস্যা ছিল। রোগীদের বেডে পাখা ছিল না। বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা ছিলনা। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যক্তিগত ভাবে এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সহযোগীতা নিয়ে সেই সকল সমস্যা গুলোর সমাধান করেছি। নিরাপত্তার স্বার্থে সিটি টিভি ক্যামেরা স্থাপন করে দিয়েছিলাম। যে সকল জায়গা দিয়ে হাসপাতালের জিনিসপত্র পাচার হয় দেখা গেল কয়েক মাসের মধ্যে সেই সমস্ত জায়গাগুলোর সিসি ক্যামেরা নষ্ট করা হয়। ওই ক্যামেরাগুলোর মাধ্যমে আমি এবং আমার কমিটি মোবাইল ফোনে হাসপাতালের অবস্থা দেখতে পারতাম। কিন্তু একটা দুষ্টু চক্র এ কাজে লিপ্ত রয়েছে। তারা কিছুতেই ক্ষ্যান্ত হচ্ছে না। আমাদের মনে হয় আমাদের হাসপাতালের একটা অডিট করা প্রয়োজন। হাসপাতালের বর্তমান সুপার ডাক্তার গৌতম সহ উনার আগে যারা ছিলেন তাদের সবারই একই কথা এমন সিস্টেম আগে থেকেই চলে আসছিলো। যার খেসারত আমরা এখন দিচ্ছি। যারা পাপী তারা দেশের এই দুর্যোগের সময়ও ক্ষ্যান্ত হচ্ছেন না।

তিনি আরো বলেন, এপ্রিল মাসে সরকার থেকে একটি বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। যে সরকার থেকে করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার নার্সদের থাকা খাওয়ার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে। সরকার থেকে ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সভাপতি তানভির আহম্মেদ টিটুর মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে ডাক্তারদের জন্য এবং আমি ব্যক্তিগত অর্থায়নে নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমী স্কুলে ডাক্তার নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের জন্য অস্থায়ী আবাসন সহ তাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে যে ব্যবস্থা নিয়েছি সেটির জন্য সরকার থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়ে আমরা ওই ৩০ লাখ টাকার বিপরীতে আমাদের হাসপাতালে আনুসাঙ্গিত বিয়ষ গুলোর চাহিদাপত্র দিবো। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডাক্তারদেরকে সম্মুখ যোদ্ধা বলা হচ্ছে। আর সম্মুখ যোদ্ধাদের পেছন থেকে যাদের সহযোগীতা করার কথা তারা যদি এমন কাজ করেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। আমি এবং জেলা প্রশাসক আগামীতে আবারো আলোচনা করবো। আমরা একটা অডিটের ব্যবস্থা করবো। যদি আমরা না পারি তাহলে আমরা অবশ্যই দুদকের সহযোগীতা নিবো। কেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের পিএ এর এমন রাজত্ব চলছে।

তিনি আরো বলেন, অন্যান্য হাসপাতালে গুলোতে দেখা যায় রোগীর জায়গা দিতে পারেনা। অথচ আমি গত ৫ বছরে দেখলাম না খানপুর হাসপাতালে সিট গুলোতে রোগী সম্পন্ন হয়েছে। আমার কাছে বিভিন্ন সময় অভিযোগ আসে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের পিএ এর শহরের বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠান এবং কিছু কিছু ক্লিনিকে উনার নামে বেনামে মালিকানা আছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যেকোন উপায়ে আমাদের এগুলো তদন্ত করে বের করতে হবে এবং যাতে করে তার কোন কার্যক্রম না চলে সেজন্য মন্ত্রনালয়ে আমি চিঠি দিবো। নয়তো যারা আজকে সম্মুখ যুদ্ধ করছে তারা বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়বেন। প্রয়োজনে আমরা অন্য লোক আনবো। আর এসব কাজের সাথে যদি এলাকার কেউ জড়িত হয়ে থাকেন তাহলে তারা ওই এলাকায় থাকতে পারবেন বলে আমার মনে হয়না। আর নয়তো তাদের কাছ থেকে বিশাল অংকের ক্ষতিপূরন আদায় করা হবে।

সেলিম ওসমানের ওই বক্তব্যের পরে ৩০০ শয্যা হাসপাতালের সুপারের ব্যক্তিগত পিএ সিদ্দিকুর রহমানকে গত ২৪ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক আদেশে বদলী করে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। সেখানে সময় সুযোগ বুঝে দায়িত্ব দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে পিএ সিদ্দিকুর রহমানের মুঠোফোনে কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর