আবারো বেপরোয়া হকাররা, সেই ১৬ জানুয়ারীর ঘটনার আশংকা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:১৬ পিএম, ১৪ জুলাই ২০২০, মঙ্গলবার
আবারো বেপরোয়া হকাররা, সেই ১৬ জানুয়ারীর ঘটনার আশংকা

নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় বঙ্গবন্ধু সড়কের দুই পাশের ফুটপাতে হকার বসাকে কেন্দ্র করে সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর উপর হামলা, সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ভুলে যায়নি নগরবাসী। সেই ঘটনার দুই বছর না যেতেই আবারও সেই বিশৃঙ্খলার পথেই হাটছে হকাররা। বর্তমানে করোনার মহামারীর মতো এতো বড় দুর্যোগ চললেও তাতেও তাদের কোন ভ্রক্ষেপ নেই। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে এক অজানা শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অবিলম্বে কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহণে প্রশাসনের প্রতি দাবি জানিয়েছেন তারা।

পূর্বের কোন ঘোষণা ছাড়া ১৩ জুলাই সোমবার বিকেলে শহরের চাষাঢ়া গোল চত্ত্বর এলাকায় আবারও ফুটপাতে বসার দাবিতে বঙ্গবন্ধু সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে হকাররা। বিকেল ৪টা থেকে শুরু হওয়া অবরোধ ও বিক্ষোভ কমসূচি চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এছাড়াও চাষাঢ়া থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে শহরের ২নং রেল গেট ঘুরে পুনরায় চাষাঢ়া এসে বিক্ষোভ করে হকাররা। ফলে শহর জুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। আর এতে করে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী যানবাহন, প্রাইভেটকার, জরুরী প্রয়োজনের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স সব কিছুই চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ রিকশাও ঠাঁই বসে থাকতে হয় রাস্তার মধ্যে। ফলে এক ঘণ্টা দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে।

এসময় সরেজমিনে দেখা যায়, চাষাঢ়া বিজয়স্তম্ভের পাশেই ট্রাফিক পুলিশের বক্স। আর সেখান থেকেই রাস্তা ব্লক করার জন্য সরঞ্জাম আনা হয়। তাছাড়া ফলের দোকানের ঝুড়ি এসে রাস্তা ফেলে তার উপর বসে থাকে হকাররা। কিছু হকার রাস্তার শুয়ে পরে। পুলিশ সদস্যরা তাদের বুঝাতে চেষ্টা করলেও তাদের সঙ্গে তেঁড়ে যেতে দেখা যায়। এমন কি এক সময় হকার নেতারা অন্দোলন আজকের মতো স্থগিত ঘোষণা করলেও রাস্তার অবরোধ তুলতে নারাজ হকাররা। ঘোষণা দেন দিনের মধ্যে ৩ থেকে ৪ বার এভাবে রাস্তা অবরোধ করে রাখবেন। এক উশৃঙ্খলা অচরণে মত হয় হকাররা।

হকারদের এমন উচ্ছৃঙ্খল আচরণে পুলিশ ছিল নির্বিকার। হকারদের যতই বুঝিয়ে সড়কের যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছেন ততই ব্যর্থ হয়েছেন। পুলিশদের সঙ্গে বাকবিতন্ডায়ও লিপ্ত হয়েছেন হকাররা। কিছুইতেই বুঝতে রাজি নয়।

এর আগে থেকেই আন্দোলন শুরু করে হকাররা। তবে এর আগে অভিযোগ করা হয় এ করোনার মহামারীর সময়ে হকারদের কোন ত্রাণ সামগ্রী দেয়া হয়নি। এ নিয়ে সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও জেলা প্রশাসক জসিমউদ্দিনের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার শুরু করেন। যার প্রমাণিত হয় সিটি করপোরেশনের মেয়র আইভীর ব্যক্তিগত সহকারী আবুল হোসেনের দেওয়া বক্তব্যেই।

তিনি জানান, ত্রাণ সামগ্রী দেওয়ার তালিকাও তাদের কাছে আছে। আর বঙ্গবন্ধু সড়ক ব্যক্তিত্ব হকাররা আশে পাশের সড়কগুলোতে বসে ঠিকই ব্যবসা করে যাচ্ছেন।

আসাদুল ইসলাম আসাদ বলেন, আমরা পেটের দায়ে রাস্তায় নেমেছি। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের পেটে ভাত না ঝুটবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরবো না। আমরা আন্দোলনে পিছপা হবো না, আমরা রাস্তা থেকে সড়বো না। আমাদের পুনর্বাসন করতে হবে। অন্যথায় মিছিল মিটিং চলতেই থাকবে।

এ বিক্ষোভে যানজটে আটকে ছিলেন তমিজউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘গুটি কয়েক হকারদের অবৈধ দাবি মেনে নেওয়ার জন্য এভাবে শহরে বিশৃঙ্খলা করতে দেওয়া যায় না। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এখন করোনার মহামারী চলছে। মানুষ জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করছে সরকার। কিন্তু এর মধ্যে তারা কোন প্রকার স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি চিন্তা না করে রাস্তায় নাম সম্পূর্ণভাবে নিয়ম অমান্য করেছে।’

তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে করোনা পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে তখন এ ধরনের কর্মকান্ড আবারও করোনা পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। এটা দেশ বিরোধী কার্যক্রমের সামিল। এখনই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

প্রসূতি হালিমা বেগমকে নিয়ে ক্লিনিকে যাচ্ছিলেন হাফিজ মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী ডেলিভারী পেইন শুরু হয়। এসব হকারদের পায়ে ধরতে বাকি রেখেছি অটোরিকশা যাওয়ার জন্য একটু রাস্তাটা ছেড়ে দিতে ছাড়েনি। একটা ঘণ্টা আমাকে এখানে বসে থাকতে হয়েছে।’

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ৬৭৫ জন হকারকে পুনর্বাসন করা হয়। কিন্তু এরা সেখানে না গিয়ে পুনরায় ফুটপাতে চলে আসে। যারা হকার্স মার্কেটে দোকান পেয়েছে তারা সেখানকার দোকান বিক্রি করে দিয়েছে নয়তো গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করছে। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু সড়ক ব্যক্তিত্ব আশেপাশের সংযোগ সড়কগুলোতে ঠিকই হকাররা বসে ব্যবসা করছে।

বর্তমান হকারদের আন্দোলন ২০১৭ সালের আন্দোলনের এক রূপ। ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে যায় হকাররা। আর কঠোর হতে থাকে পুলিশ। যেমনটা এখনও কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ। নিয়মিত হকারদের ফুটপাতে বসতে বাধা দিয়ে চলেছে পুলিশ। কিন্তু কাউকে আটক করেনি। তখনের মতো এখনও পুলিশের হুমকি ধমকি দিয়ে যায় হকাররা।

২০১৮ সালের এ সংঘর্ষের পিছনে যারা নেতৃত্বে দিয়েছিলেন ২০২০ সালে হকারদের আন্দোলনে তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ দাবি নিয়ে বার বার হকারদের উস্কানী দিয়ে রাজপথে নামিয়ে আনছেন তারাই।

যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সিকান্দার হায়াৎ, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ জসিমউদ্দিন, জেলা হকার্স লীগের সভাপতি আব্দুল রহিম মুন্সি, নারায়ণগঞ্জ জেলা হকার্স সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ প্রমুখ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এমএ শাহিন, সেক্রেটারী ইকবাল হোসেন, শ্রমিক নেতা দুলাল সাহা প্রমুখ।

এসব নেতারা হকারদের উস্কানী দিয়ে আন্দোলনের নামানোর কারণ হিসেবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু সড়কের উভয় পাশে ফুটপাতে কয়েক শতাধিক হকার দোকান বসিয়ে থাকে। আর সেসব দোকানদারদের কাছ থেকে পুলিশ, বিদ্যুৎ বিল, রাজনৈতিক সহ বিভিন্ন নামে প্রতিদিন সর্বনি¤œ ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা তুলেন হকার নেতারা। কিন্তু বর্তমানে পুলিশ খুব কঠোর অবস্থানে থাকায় এবং হকাররা বঙ্গবন্ধু সড়কে না বসায় চাঁদা তুলতে পারছে না নেতারা। আর বেঁচাকেনা কম থাকায় হকাররাও নেতাদের ৫০ কিংবা ১০০ টাকা দিতে রাজি নয়। ফলে তাদেরকে বঙ্গবন্ধু সড়কে বসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আন্দোলনে নামিয়ে দিচ্ছে নেতারা।

২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি যা ঘটে ছিল
উল্লেখ্য ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর থেকে শহরেরর ফুটপাত হকারমুক্ত থাকে। পরে হকাররা টানা আন্দোলন শুরু করে। ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি সোমবার বিকেলে সমাবেশ করে শামীম ওসমান। তিনি ঘোষণা দেন হকারদের পুনর্বাসনের আগে আগামী ২১ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত মঙ্গলবার বিকেল ৫টা হতে রাত ১০টা পর্যন্ত হকার বসবে। কিন্তু ওই সময়ে আইভী এও ঘোষণা দেন কোনভাবেই হকার বসতে দেওয়া হবে না।

ওই ঘোষণার প্রেক্ষিতে পরদিন ১৬ জানুয়ারি বিকেল ৪ টা ১৮ মিনিটে নগর ভবনের সামনে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী ও কাউন্সিলরদের নিয়ে অবস্থান নেন মেয়র আইভী। ওখান থেকে অনুগামী নেতাকর্মীদের নিয়ে আইভী মিছিল নিয়ে ফুটপাতের উপর দিয়ে চাষাঢ়ার দিকে আসতে থাকে। অপরদিকে চাষাঢ়া শহীদ মিনারে হকারদের কয়েকটি গ্রুপ বিকেল সোয়া ৪টার দিকে অবস্থান নেন।

বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে আইভীর নেতৃত্বে মিছিল চাষাঢ়া সায়াম প্লাজার সামনে আসে। সেখানে কয়েকজন হকারকে ফুটপাত থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের মধ্যে ব্যাপক বাকবিতন্ডা ঘটে। এছাড়া আইভীর মিছিলটি পুলিশ আটকে দেয়। পরে সায়াম প্লাজার সামনে ফুটপাতে মেয়র আইভী সহ তার সমর্থকেরা অবস্থান নেয়। তখন শামীম ওসমানের অনুগামী হিসেবে পরিচিত চাষাঢ়া এলাকার নিয়াজুল অস্ত্র উচিয়ে সেখানে গেলে তাকে মারধর করা হয়।

এ খবর চাষাঢ়ায় ছড়িয়ে গেলে সেখানে থাকা আওয়ামী লীগের মহানগর কমিটির যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, শহর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সাজনু সহ অন্যরা সমর্থকেরা এসে মেয়র আইভীকে উদ্দেশ্য করে গুলি ও ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে। তখন আওয়ামী লীগের লোকজনদের পক্ষে হকাররাও অবস্থান নেন। ওই সময়ে আইভীকে সায়াম প্লাজার সামনে আইভীর লোকজন মানব প্রাচীর করে রক্ষা করেন। তখন আইভী পায়ে আঘাত পান। তাঁর সঙ্গে থাকা তখন প্রেস ক্লাবের সেক্রেটারী শরীফউদ্দিন সবুজ সহ অন্তত আরো কয়েকজন আহত হয়। পরে লোকজন এসে আইভীকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে নিয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের সময়ে মেয়র আইভীকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মত ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে পুরো শহরে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় বঙ্গবন্ধু শহরে যান চলাচল ও আশেপাশের সকল দোকানপাট।

১৬ জানুয়ারীর পর থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ হলেও পুলিশ মামলা গ্রহণ করেনি। বরং পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামীদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন।

১৬ জানুয়ারির হামলার ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দারকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়। অপর দুই সদস্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোস্তাফিজুর রহমান ও র‌্যাব-১১ এর সহকারী পরিচালক (এএসপি) বাবুল আখতার। সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও চার দফায় সময় বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু আজও পর্যন্ত সেই প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়নি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর