‘যারা টাকা নেয় তারাই দৌড়ানি দেয়’


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:০৯ পিএম, ১৫ জুলাই ২০২০, বুধবার
‘যারা টাকা নেয় তারাই দৌড়ানি দেয়’

‘যারা আমাগো দৌড়ানী দেয় তারাই আবার সন্ধ্যার পর আমাগো থেইকা ১০ টাকা কইরা নেয়। আপনে সন্ধ্যার পর আইয়া এইখানে দাঁড়াইয়া থাইকেন। দেখবেন তখন কি হয়। আমরা তো পেটের দায়ে এতো দৌড়ানি খাইয়াও এই ব্যবসা করি, তারা এমন করে ক্যান?’ নারায়ণগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে ক্ষুদ্র ব্যবসা করা এক হকার প্রতিবেদককে এ কথা বলে। তবে ভয়ে নাম বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি।

১৫ জুলাই বুধবার সন্ধা সাড়ে ৬ টায় বঙ্গবন্ধু সড়কে সরেজমিনে দেখা যায়, ‘দূর থেকে পুলিশের গাড়ি দেখেই হকাররা নিজেদের ঠেলাগাড়ি, টেবিল, জিনিসপত্র নিয়ে প্রেসিডেন্ট রোড সহ আসে পাশের গলিতে ঢুকে পরে। পুলিশ যেতেই আবার নিজেদের জিনিসপত্র নিয়ে যার যার স্থানে ফিরে গিয়ে ক্রেতাদের আহ্বান করে তারা।’

প্রতিবেদককে ছবি তুলতে দেখে এ সময় পুলিশের নাম করে টাকা নেয়ার অভিযোগ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই হকার। পুলিশ তাড়া দেয়ার সময় হকারদের জিনিসপত্রের ক্ষতি করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমাগো থেইকা টাকাও নেয়, আবার দৌড়ানিও দেয়। মাইর দেয়, সেটা তো আলাদা কথা। এমনকি দাপট দেখাইয়া আমাগো জিনিসপত্রও ভাংচুর করে, ফালাইয়া দেয়। গরিবের উপরে এইটা কেমন বিচার?’

জহির নামের হকার প্রতিবেদককে ডেকে বলে, ‘আপনারা ছবি তুইলা কারে দেখাইবেন? সবাই দেখুক আমরা কি অবস্থায় আছি। আপনারা কি জানেন যে নেতারা কি ঠিক করছে? কেউ তো আমাগো কিছু কয়না। তারা শুধু শুধু আমাগো পেটে লাথি মারে। আমরা তো আর ইচ্ছা ইচ্ছা কইরা এই ফুটপাতে বসি না। আমাগো একটা স্থায়ী জায়গা দেন। বিশ্বাস করেন আপা, তাইলে আর জীবনেও ফুটপাতে বসুম না।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত পরশুদিন সবার লগে মিছিল কইরা আইলাম। কিন্তু কেউ আমাগো কোনো সমাধান দেয় না।’

জহিরকে এ বিষয়ে কথা বলতে দেখে সুমা নামের এক ক্রেতা বলে, ‘হকারদের এভাবে উচ্ছেদ করা তো সমাধান হতে পারে না। আমরা মধ্যবিত্ত যারা দামী দামী দোকান থেকে জামা-কাপড়, জুতা কিনার সামর্থ্য রাখি না, তাদের শেষ ভরসা হকার। বছরে হয়তো দুইবার বড় দোকান থেকে কেনাকাটা করা হয়। কিন্তু সারা বছর তো এদের কাছ থেকেই কমদামে কিনি।’

উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম আলোচিত ইস্যু হচ্ছে হকারদের ফুটপাথে বসা নিয়ে আন্দোলন। গত কয়েকদিন ধরেই ‘পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ চলবে না’ স্লোগানে উচ্ছেদের নামে জুলুম নির্যাতন, গ্রেফতার ও মালামাল লুট বন্ধ করার দাবীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে আসছিলেন হকাররা। কয়েকদিন তাদের আন্দোলন কর্মসূচি বন্ধ ছিল। আশায় ছিলেন হয়তো তারা ফুটপাতে বসতে পারেন। কিন্তু তাদের সে আশা আর পূরণ হয়নি। সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন কিংবা পুলিশ প্রশাসন কেউই তাদের দাবীকে পাত্তা দেয়নি।

তাই তারা আন্দোলনের কৌশল পাল্টিয়ে আগে থেকে পূর্ব ঘোষণা কিংবা কাউকে কোনো কিছু না জানিয়েই হঠাৎ করেই গত ১৩ জুলাই ঝটিকা সমাবেশ কিংবা ঝটিকা মিছিল করছেন। সেই সাথে রাস্তাও অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করছেন হকাররা। সবশেষ পুলিশ তাদের বোঝাতে সক্ষম হয় এবং আন্দোলন কর্মসূচির সমাপ্তি হয়।

নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হচ্ছে বঙ্গবন্ধু সড়ক। এই সড়কটির ফুটপাতে হকার বসা নিয়ে অনেক লঙ্কাকান্ড ঘটনা ঘটে গেলেও সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশের কড়া নির্দেশনাকে উপেক্ষা করেই তারা ফুটপাতের দুইপাশ ধরে ব্যবসা চালিয়ে আসছে।

এর আগে সারাদেশজুড়ে নারায়ণগঞ্জের সমালোচিত ঘটনার মধ্যে অন্যতম হলো হকারদের সাথে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সরাসরি সংঘর্ষ। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারীতে হকার ইস্যুতে ঘটে গিয়েছিল অনেক লঙ্কাকান্ড ঘটনা। যে ঘটনায় সারাদেশব্যাপী আলোচনায় চলে এসেছিল নারায়ণগঞ্জ। কিন্তু ওই লঙ্কাকান্ডের পরেও হকাররা শান্ত হচ্ছেন না। কয়েকদিন পরপর ফুটপাথে বসা নিয়ে পুলিশের কড়াকড়ি শুরু হলেই হকাররা হুংকার ছাড়ছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর