rabbhaban

বাংলা সনের কথা


এস এম শহিদুল্লাহ | প্রকাশিত: ০৮:২৫ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০১৮, শুক্রবার
বাংলা সনের কথা

নববর্ষ পৃথিবীর প্রায় সকল জাতির ঐতিহ্যের অংশ। বাংলা নববর্ষ বাংলার ঐতিহ্য কে ধারণ করে আছে। বাঙালি জাতি পহেলা বৈশাখকে বাংলা নববর্ষ হিসেবে পালন করে থাকে। ‘সন’ ও `তারিখ` দুটিই আরবী শব্দ।  সন অর্থ `বর্ষ` ও তারিখ অর্থ `দিন`।  তারিখের আরেকটি অর্থ হলো `ইতিহাস`। `সাল` হলো ফারসী শব্দ। সন ও সাল-এর অনুরূপ বাংলা হলো `বর্ষপঞ্জী`।

মোগল সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রচারিত `দীন-ই-ইলাহি`র অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলেও এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি স্মৃতি আজও অম্লান। সেটি হলো ১৫৮৪ সালের ১০ মার্চ (হিজরি ৯৯২ সনের ৮ রবিউল আউয়াল) সম্রাট আকবর তারিখ-ই-ইলাহি নামে সর্বভারতীয় একটি সাল চালু করেছিলেন। বঙ্গাব্দ হলো তারিখ-ই-ইলাহির প্রত্যক্ষ প্রভাবের ফসল। তারিখ-ই-ইলাহি গণনা শুরু করা হয়েছিল আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছরে। তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন ইংরেজি ১৫৫৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বা হিজরি ৯৬৩ সনের ১০ রবিউল আউয়াল। এ দিনটিকে ভিত্তি করে তারিখ-ই-ইলাহি চালু করা হয়েছিল। ভারতের মুসলিম শাসকরা চন্দ্র মাস ভিত্তিক হিজরি সন অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতেন। অথচ ফসল উৎপাদন করা হতো সৌরবর্ষের হিসেবে। চন্দ্র বছর হতো সৌর বর্ষের চেয়ে ১১ দিন কম। চন্দ্র ও সৌর বছরের ১১ বা ১২ দিন পার্থক্য থাকার ফলে ৩১টি চন্দ্র বছর ৩০টি সৌর বছরের সমান হয়ে  যেতো। তখন কৃষিজীবীদের এক বছরের খাজনা বেশি দিতে বাধ্য করা হতো। সিংহাসনে আরোহণ করার সময়ই সম্রাট আকবর এ অসুবিধা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। তাই তখন তিনি একটি বৈজ্ঞানিক, যুক্তিসঙ্গত এবং সবার কাছে গ্রহনযোগ্য একটি বর্ষ চালু করার প্রয়োজন অনুভব করছিলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি একটি ফরমান জারি করেন এবং বিখ্যাত পন্ডিত ও জ্যোতিবিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ্ শিরাজিকে নিয়োগ করেন। ফতুল্লাহ্ শিরাজির সুপারিশের ভিত্তিতে ৯৬৩ হিজরিতে প্রবর্তিত তারিখ-ই-ইলাহিকে ভিত্তি করে চালু করা হয় বঙ্গাব্দ। তবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, বছর শুরু হবে হিজরি সালের প্রথম মাস মুহররম  থেকে। ৯৬৩ হিজরিতে মুহররম ছিল বৈশাখ মাস। তখন বাংলায় প্রচলিত শকাব্দের প্রথম মাস ছিল চৈত্র। সম্রাট আকবরের নির্দেশে চৈত্র মাসের পরিবর্তে বৈশাখ মাসকে বঙ্গাব্দের প্রথম মাস হিসেবে গণ্য করা হয়।

তারিখ-ই-ইলাহির মাসগুলোর নাম ছিল ফারওয়ারদিন, আরদিচিহিমত, নুরাতান, খোরদাদ, তির, আমুরদাদ, শবেওয়ার, মিহির, আখার, দীয়, বাহমান, ও ইস্কান্দার।

পরে নক্ষত্রের সঙ্গে বাংলা বার মাসের নামকরণ করা হয়। বিশাখা নক্ষত্রের নাম থেকে বৈশাখ, জাইষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ, সার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপতা থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন; কার্তিকা থেকে কার্তিক, অগ্রাহীয়ণ থেকে অগ্রাহায়ণ, পৌষা থেকে পৌষ, মাঘা থেকে মাঘ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন, এবং চিত্রা থেকে চৈত্র।

জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর ছিলেন তৃতীয় মোগল সম্রাট। তিনি ১৫৪২ সালের ২৩ নভেম্বর জন্মগ্রহন করেছিলেন এবং ১৬০৫ সালের ২৭ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন।

বাংলা দিনপঞ্জীর সাথে হিজরি এবং খ্রিস্টীয় সালের মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরি সন হয় চাঁদের হিসেবে আর খ্রিস্টীয় সাল আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী। হিজরি সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় আকাশে নতুন চাঁদ দেখে আর খ্রিস্টীয় সালে নতুন দিন শুরু হয় ইউটিসি ক্ট অনুযায়ী। ঐতিহ্যগতভাবে সূর্য দেখে বাংলা দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ সালের পহেলা বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমী আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাত ১২.০০ টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু করে। লেখক: একজন সমাজকর্মী ও কলাম লেখক।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
rabbhaban
আজকের সবখবর