চন্দন শীলের ভাষ্য : শামীম ওসমানকে সরানোর পরে রক্তের বন্যা


স্টাফ করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৫:৩৬ পিএম, ১৭ জুন ২০১৮, রবিবার
চন্দন শীলের ভাষ্য : শামীম ওসমানকে সরানোর পরে রক্তের বন্যা

২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাঢ়া শহীদ মিনার ঘেষা আওয়ামী লীগ অফিসে তৎকালীন এমপি শামীম ওসমানের গণসংযোগ কর্মসূচিতে সাংগঠনিক কর্মকান্ডে জড়িত নেতৃবৃন্দরা জড়ো হতে থাকে। রাত ৭টার মধ্যে পুরো অফিস লোকে লোকারন্য হয়ে পড়ে। রাত পৌনে ৯টায় বিকট শব্দে বিষ্ফোরিত হয় বোমাটি। আহত হয়েছিল অর্ধ শতাধিক, অনেকেই বরণ করে নিয়েছে পঙ্গুত্ব, কেঁদে উঠেছিল নারায়ণগঞ্জবাসী। ঘটনাস্থলে ১১ জন ও পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর মৃত্যু ঘটে মোট ২০ জনের। এদের মধ্যে ১৯ জনের পরিচয় সনাক্ত করা হলেও পরিচয় মেলেনি ১ মহিলার। নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে এই ভয়াবহ স্মতি মনে করে আজও শিহরিত হয়ে উঠে এখানকার মানুষ।

সে ঘটনায় দুই পা হারিয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন চন্দন শীল। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে চন্দন শীল বলেন, প্রতি সপ্তাহের শনি ও সোমবার সাধারণ মানুষের কথা শুনতেন সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। সেইদিন আমার আশার কথা ছিল না। আমি জ্বরে আক্রান্ত ছিলাম বলে আসতে চাইনি। পরে নেতাকর্মীরা আমাকে ফোন দিয়ে বলে আসতেই হবে। তাই সন্ধ্যায় কার্যালয়ে এসে দেখি শামীম ওসমানের সঙ্গে একজন বৃদ্ধ লোক খুব জোড় গলায় কথা বলছেন। তাকে আমেরিকা যাওয়ার জন্য একটি দরখাস্তে স্বাক্ষর দিতে হবে শামীম ওসমানের। পরে সেখান থেকে শামীম ওসমানকে সরিয়ে দিতেই বৃদ্ধাও কোন কিছু না বলে চলে যায়। সেই মুহূর্তে পায়ের একটু সামনে প্রচন্ড বিস্ফোরণ। চোখের সামনে আগুনের গোলা। কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। দুই পা বিচ্ছিন্ন। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। শরীর থেকে মাংস বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল ক্লাবের সামনে। রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। নিথর দেহের পাশে আহতদের গোঙানির শব্দ যেন মৃতপুরী। আরো কয়েকজন সহ আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর পরে আর কিছু বলতে পারি না। পরে আমাকে ও রতন দাসকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শামীম ওসমান ও আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা জার্মানিতে পাঠান। টাকার অভাবে জার্মানিতে পুরোপুরি চিকিৎসা করাতে পারিনি। যতটুকু হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন এমপি শামীম ওসমানের বদৌলতে। জার্মানি থেকে ফিরে ভারতে চিকিৎসারত অবস্থায় আর্থিক সংকটে পড়েছি। এমনও দিন গেছে তিন বেলার জায়গায় দুই বেলা খেয়েছি। বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়েছে। আমার ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা ছিল সেটাও বন্ধ করে দেয় তৎকালীন বিএনপি-জামায়ত জোট সরকার এছাড়াও বিভিন্নভাবে নাজেহাল করার চেষ্টা করেছে।`

তিনি আরো বলেন, মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি, তাই একে আর ভয় পাই না। যারা চাষাঢ়াসহ সারা দেশে এ বর্বরোচিত বোমা হামলা চালিয়েছে, আমৃত্যু তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাব।`

নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় ২০জন নিহত হওয়ার ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল আবু মোরসালিন ও মহিবুল মোত্তাকিম নামের সহোদর ভাই। হরকাতুল জিহাদের এ দুইজন জঙ্গী ২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাঢ়া বোমা হামলার ঘটনার আগেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও হত্যার পরিকল্পনা করেছিল।

চাষাঢ়া বোমা হামলার পর ২০১৩ সালের ২ মে আদালতে দেওয়া চার্জশীটে এ দুইজন সহ ৬জনকে অভিযুক্ত করা হয়। চার্জশীট জমার দিন প্রেস ব্রিফিংয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির নারায়ণগঞ্জ শাখার এএসপি এহসানউদ্দীন বলেছিলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজন তাকে বলেছেন যে ২০০১ সালের ১৬ জুন বিকেলে চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে এসেছিলেন ওবায়দুল নামের এক ব্যক্তি। তার বাড়ি শহরের চাষাঢ়ায় চকলেট ফ্যাক্টরী মোড় এলাকাতে। তিনি সহ আরও ২জন মোট ৩জন এসেছিলেন আওয়ামী লীগ অফিসে। রাত ৭টার দিকে তিনি সহ ২ জন শামীম ওসমানের ব্যক্তিগত কক্ষে গিয়ে কথা বলেন। তারা এসেছিলেন আমেরিকার ভিসার জন্য সুপারিশ করতে। ৩জন এলেও মূলে ছিলেন উবায়দুল। তিনিই মূলত আমেরিকা যাওয়ার জন্য বেশ কিছু কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে আসেন। শামীম ওসমানের সঙ্গে তিনি কথা বলে ওই কাগজপত্রে সুপারিশ চান। কিন্তু শামীম ওসমান তা দিতে প্রথমে অনীহা প্রকাশ করেন। ওই সময়ে উবায়দুল হঠাৎ করেই শামীম ওসমানের সামনের টেবিল চাপড়ে উঠে বলেন, ‘আমার জন্য কেন সুপারিশ করবে না, দিবে না কেন, আমরা তোমার মহল্লার লোক। আমাদের জন্য না করলে কার জন্য করবে?’

শামীম ওসমান তাঁকে বলেন, ঢাকার মার্কিন দূতাবাস সাংসদদের সুপারিশে ভিসা দেয় না। তার পরও উবায়দুল হক সুপারিশের জন্য পিড়াপিড়ি করতে থাকেন।

উবায়দুলের সঙ্গে আসা ২ জনের একজনের হাতে ছিল কালো ব্রিফকেস। দুই যুবক ফটোকপি করা একটি আবদেনপত্রে শামীম ওসমানের সুপারিশসহ সই চান। এর মধ্যে ওবায়দুল হক দ্রুত বেরিয়ে যান। সে সময়ে শামীম ওসমানের প্রভাব ছিল দোর্দান্ড। কিন্তু ওই মুহূর্তে শামীম ওসমানের টেবিল চাপড়ে ওবায়দুল এর মত একজন ব্যক্তির সে আচরণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে উঠেন রুমে থাকা অন্যরা। তারা অনেকটা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন উবায়দুল এর দিকে।

ওবায়দুল অনেকটা উত্তেজিত থাকলেও অন্য ২ জন ছিলেন বেশ নীরব। তারা বসে শুধু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। টেবিল চাপড়ানো ওবায়দুল পরে গ্রেপ্তার কলেও সে জামিনে রয়েছেন। তিনি বর্তমানে পুরাতন ঢাকা এলাকাতে বসবাস করেন। উবায়দুলের সঙ্গে আসা দুইজনই মোরসালিন ও মুত্তাকিম ছিলেন।

২০০৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী ভারতের রাজধারী দিল্লীর একটি রেল ষ্টেশন হতে হরকাতুল জিহাদের দুই জঙ্গি সহোদর আনিসুল মোরসালিন ও মুহিবুল মুত্তাকিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বাড়ি বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায়। তারাও বোমা হামলার ঘটনা স্বীকার করেছেন। বর্তমানে দিল্লী কারাগারে বন্দী রয়েছে।

চার্জশীট দেওয়ার সময়ে মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি নারায়ণগঞ্জ অফিসের সহকারী পুলিশ সুপার এহসান উদ্দীন চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ঘটনার দিন তথা ১৬জুন রাতে মোরসালিন ও মুত্তাকিম একটি ব্রিফকেস হাতে নিয়ে চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে প্রবেশ করে। তখন তারা শামীম ওসমানকে দিয়ে কয়েকটি কাগজ স্বাক্ষরের চেষ্টা করে। ওই সময়ে চাষাঢ়া এলাকার ওবায়দুল্লাহ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। শামীম ওসমান ওই কাগজে স্বাক্ষর করতে অনীহা প্রকাশ করেন। এ ঘটনায় তখন শামীম ওসমানরে টেবিল চাপড়ে দিয়েছিলেন তিনজন। তাদের সঙ্গে আনা ব্রিফকেসটিতেই বোমা রাখা ছিল। তবে এটা টাইম বোমা নাকি রিপোর্ট কন্ট্রোল বোমা সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বোমা হামলায় এছাড়াও মুফতি আবদুল হান্নান, ওবায়দুল্লাহ জড়িত ছিল।

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জে ২০০১ সালে ১৬ জুন চাষাঢ়া আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে বোমা হামলার ঘটনায় ২০ জন নেতাকর্মী নিহত হয়। ১৭ বছরেও বিচার হয়নি এসব বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের। এমনকি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি এসব পরিবারগুলো। নিহতদের পরিবারগুলো দাবি করছে নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ১৬ জুন বোমা হামলা দিবস হিসেবে অন্তত নারায়ণগঞ্জে সরকারীভাবে পালন ও নিহতদের স্মরণে স্মৃতি ফাউন্ডেশন করা।

সেদিন নিহত হয়েছিল শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুল হাসান বাপ্পী, সহোদর সরকারী তোলারাম কলেজ ছাত্র-ছাত্রী সংসদের জিএস আকতার হোসেন ও সঙ্গীত শিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু, সঙ্গীত শিল্পী নজরুল ইসলাম বাচ্চু, ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, নারায়ণগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক এ বি এম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ মোল্লা, মহিলা আওয়ামীলীগ নেত্রী পলি বেগম, ছাত্রলীগ কর্মী স্বপন দাস, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, পান সিগারেট বিক্রেতা হালিমা বেগম, সিদ্ধিরগঞ্জ ওয়ার্ড মেম্বার রাজিয়া বেগম, যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, আব্দুস সাত্তার, আবু হানিফ, এনায়েতউল্লাহ স্বপন, আব্দুল আলীম, শুক্কুর আলী, স্বপন রায় ও অজ্ঞাত এক মহিলা। নিহত মহিলার পরিচয় পেতে তেমন কোন চেষ্টা করেনি প্রশাসন। হামলায় শামীম ওসমান সহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। তার ব্যক্তিগত সচিব চন্দন শীল, যুবলীগ কর্মী রতন দাস দুই পা হারিয়ে চিরতরে বরণ করেছে পঙ্গুত্ব।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
-->
newsnarayanganj24_address
সাক্ষাৎকার এর সর্বশেষ খবর
আজকের সবখবর