rabbhaban

১০০প্রার্থী চূড়ান্ত! কপাল পুড়তে পারে নারায়ণগঞ্জের অনেক প্রত্যাশীর


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৫৯ পিএম, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বুধবার
১০০প্রার্থী চূড়ান্ত! কপাল পুড়তে পারে নারায়ণগঞ্জের অনেক প্রত্যাশীর ছবিগুলো আসন কেন্দ্রীক

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য দলীয় কোন্দল, ভোটের আগে দলবদল ও বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এরই অংশ হিসেবে সারা দেশের মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করার পাশাপাশি বেশকিছু নেতাকে অতি গোপনে ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। সারা দেশে নির্বাচনী সফরে থাকা আওয়ামী লীগের ১৫টি টিমের প্রতিবেদন, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন এবং দলীয় সভাপতির পর্যবেক্ষণের আলোকে এসব নেতাকে সবুজ সংকেত দেয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত একশটি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের এ সংকেত দেয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়টি গোপন রাখতে সংশ্লিষ্টদের দেয়া হয়েছে কঠোর নির্দেশ। এমনকি নিজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও এ ব্যাপারে কোনো ধরনের আলোচনা না করতে বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

আরও জানা গেছে, ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়া নেতারা এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশী অন্যদের সঙ্গে মিলেমিশে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের প্রচার ও নৌকার পক্ষে ভোট প্রার্থনা করছেন। যাকেই নৌকার মনোনয়ন দেয়া হোক না কেন, তার হয়েই কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের এক প্রেসিডিয়াম সদস্য গণমাধ্যমকে বলেন, বিভিন্ন সংস্থা এবং দলের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রার্থীদের মনোনয়ন চূড়ান্ত করছেন। যেসব আসনে যাদের মনোনয়ন দিলে জয় নিশ্চিত হবে, এমন নেতাদের মনোনয়নের জন্য ‘সবুজ সংকেত’ দেয়া হচ্ছে। এ সংখ্যা এখন পর্যন্ত একশ। বাকি আসন নিয়ে কাজ শেষ পর্যায়ে। নির্বাচনের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এভাবে সবুজ সংকেত যাবে।

তিনি বলেন, একটি আসনে কমপক্ষে ৪-৫ জন করে নেতা দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। সম্ভবত সে কারণেই তা প্রকাশ করছেন না নেতারা। এবারের মনোনয়ন বাছাইয়ে বিতর্কিত, দলের ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নকারী এমপিরা মনোনয়ন পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি। প্রার্থী নন, নৌকা মার্কা দেখে ভোট ও ভোটের প্রচার করতে দলীয় নেতাকর্মীদের এরই মধ্যে নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৩ জুন গণভবনে এক বিশেষ বর্ধিত সভায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের এ নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছেন, কে প্রার্থী আর কে প্রার্থী না, সেটা না দেখে নৌকা মার্কায় ভোট চাওয়ার জন্য জনগণের কাছে যেতে হবে। যাকে আমরা নৌকা মার্কা দেবে, যাকে আমরা নির্বাচনে প্রার্থী করব, তার পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি আরও বলেন, এত উন্নয়ন করার ফলে মানুষ যে নৌকায় ভোট দেবে না, তা কিন্তু নয়। যদি না দেয়; তার জন্য দায়ী থাকবেন আপনারা তৃণমূল; এটাই আমার কথা। আপনারা সঠিকভাবে মানুষের কাছে যেতে পারেননি, বলতে পারেননি, বোঝাতে পারেননি, সেবা করতে পারেননি; সেজন্যই। নইলে এখানে হারার তো কোনো কথা না। নির্বাচনে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি পরিহার করার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বদনাম নিতে চাই না, জনগণের মন জয় করেই ক্ষমতায় আসতে হবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোল এখনো শুরু না হলেও ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশায় সক্রিয় রয়েছেন অন্তত দেড় ডজন নেতা। নারায়ণগঞ্জে ৫টি আসনের মধ্যে ৩টিতে আওয়ামীলীগ দলীয় সংসদ সদস্য থাকলেও ২টিতে রয়েছেন জাতীয় পার্টি দলীয় সংসদ সদস্য। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের ৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীয় ৪ জন নির্বাচিত হন। যার মধ্যে দু’টিতে আওয়ামীলীগ ও দু’টি জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে আওয়ামীলীগ দলীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে দলীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনে লিয়াকত হোসেন খোকা ও নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনে নাসিম ওসমান বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। ওই সময় জাতীয় পার্টির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার কারণে দলীয় মনোনয়ন পেয়েও পরবর্তীতে কেন্দ্রের নির্দেশে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন মোশারফ হোসেন ও শুক্কুর মাহমুদ। নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে গোলাম দস্তগীর গাজী বীরপ্রতীক নির্বাচিত হলেও সেখানে তেমন কোন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলনা। নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনে নাসিম ওসমান নির্বাচিত হওয়ার ৪ মাসের মাথায় ইন্তেকাল করলে শূণ্য আসনে উপ নির্বাচনে জয়ী হন তার ছোট ভাই বিকেএমইএ’র সভাপতি সেলিম ওসমান।

এদিকে নির্বাচনের ক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে ততই সক্রিয়তা বাড়ছে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের। নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে বর্তমান এমপি ছাড়াও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহ, রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ শাহজাহান, কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের নাম শোনা যাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মনোনয়ন ও আধিপত্য ইস্যুতে এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী বীরপ্রতীক ও কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারী বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের রূপগঞ্জবাসীর সঙ্গে ইংরেজি নতুন বছরের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন বসুন্ধরা ও ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর। ওই মতবিনিময় সভায় রূপগঞ্জের আওয়ামীলীগ নেতারা ছাড়াও জেলা আওয়ামীলীগেরও অনেক শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। যার পরে গুঞ্জন উঠে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রূপগঞ্জ থেকে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন চাইতে পারেন।

নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে আওয়ামীলীগ দলীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু দীর্ঘদিন নির্ভার থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন কেন্দ্রীয় যুবলীগের তথ্য ও যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক এবং জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইকবাল পারভেজ। ইতিমধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিও বিরাজ করেছে। এছাড়া সাবেক এমপি এমদাদুল হক ভূঁইয়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক বিশেষ সহকারি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মমতাজ হোসেন, ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মোল্লার নামও শোনা যাচ্ছে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে।

নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে বর্তমানে বেশী সক্রিয় রয়েছেন সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজের সহ যোগী অধ্যাপক ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ডাঃ আবু জাফর চৌধুরী বিরু এবং সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী মাহফুজুর রহমান কালাম। তবে সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিগত নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পাওয়ার পরেও শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করা মোশারফ হোসেনও মনোনয়ন চাইতে পারেন এমন গুঞ্জন রয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক এ এইচ এম মাসুদ দুলাল, সাবেক জেলা ছাত্রলীগ নেতা এবং পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ আনোয়ারুল কবির ভূঁইয়া, আওয়ামীলীগের উপ-কমিটির সদস্য লন্ডন প্রবাসী শফিকুল ইসলামের নাম শোনা গেলেও তারা অনেকটাই নিস্ক্রিয়। কয়েকদিন পূর্বে সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সামসুল ইসলাম ভুইয়ার নাম শোনা গেলেও অদ্যাবধি তিনি তার অবস্থান পরিস্কার করেননি। তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অত্র আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক রেজাউল করিমের ভাই শিল্পপতি বজলুর রহমান আকস্মিক নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন প্রত্যাশার ঘোষণা দেয়ায় সোনারগাঁও আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে এমপি শামীম ওসমান ছাড়াও মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে জাতীয় শ্রমিকলীগের শ্রমিক কল্যাণ ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশও বেশ সমালোচিত। এছাড়া সম্প্রতি মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় যুক্ত হয়েছেন একসময়ের ডাকসাইটে ছাত্রলীগ নেতা কামাল মৃধা। যদিও তিনি অনেকটাই নিস্ক্রিয়।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনেই আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী সবচেয়ে বেশী। এই আসনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন বিগত নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পাওয়ার পরেও শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করা শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ, জেলা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী অ্যাডভোকেট আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদল ওরফে ভিপি বাদল, জেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি আরজু রহমান ভূইয়া, জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম আবু সুফিয়ান, জেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি ও জেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুল কাদির, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিছুর রহমান দিপু, মহানগর আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জিএম আরাফাত।

এদিকে দলীয় সূত্র জানায়, মনোনয়ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগে দ্বিধাবিভক্তি বাড়লেও ইতিমধ্যে মাঠ গোছাতে শুরু করেছেন আওয়ামীলীগ দলীয় তিন এমপি শামীম ওসমান, নজরুল ইসলাম বাবু ও গোলাম দস্তগীর গাজী বীরপ্রতীক। তাদের পাশাপাশি মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও মাঠ ছাড়তে রাজী নন। তারাও নানান কৌশলে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। তবে আওয়ামীলীগের চূড়ান্ত ১০০ আসনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের কয়েকজনের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে। আর তেমনটি হলে কপাল পুড়তে পারে মনোনয়ন প্রত্যাশী অনেকেরই।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
rabbhaban
আজকের সবখবর