paradise

সকালেই পরাজয় টের পান সোহেল! রাতে বিতর্ক সৃষ্টি করতেই মারামারি


সিটি করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:৪৮ পিএম, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, শুক্রবার
সকালেই পরাজয় টের পান সোহেল! রাতে বিতর্ক সৃষ্টি করতেই মারামারি ভোট চলাকালে সকালে বিরুর সঙ্গে বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হন সোহেল।

ডাক্তারদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) নারায়ণগঞ্জ জেলার নির্বাচনে প্রচারণার শুরু থেকে উভয় পক্ষ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী থাকলেও ভোটের দিন সকাল থেকেই একটি প্যানেলের প্রার্থীদের বিমর্ষ দেখা গেছে, যাদের কেউ জয়ী হতে পারেনি। ভোট চলাকালে প্রথম থেকেই ওই প্যানেলের প্রার্থী ও নেতৃত্ব প্রদানকারী কয়েকজনের আচরণ ছিলো অসংলগ্ন। সামান্য ইস্যুকে কেন্দ্র করেও ক্ষণে ক্ষণে তারা গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করে আসছিলো। এমনকি ভোট চলাকালীন সময়েও তারা নির্বাচন কেনো হলো তা নিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে কথা বলেছে স্বাধিনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) একজন নেতার সাথে। পরবর্তীতের রাত ১১ টায় সংঘর্ষের ঘটনা শুরু হয় তাদের মাধ্যমেই।

বৃহস্পতিবার (৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯ টায় নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাবে শুরু হয় বিএমএ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার পরেই সোহেল-নিজাম প্যানেলের পক্ষ থেকে ডা. আতিকুজ্জামান সোহেল প্রথমেই অভিযোগ তোলেন জেলা সিভিল সার্জন বিধি বহির্ভূত ভাবে ভোটকেন্দ্রের ভিতরে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করছেন। পক্ষান্তরে সিভিল সার্জন গণমাধ্যমকে জানান নিয়মতান্ত্রিক ভাবেই কেন্দ্রের ভিতরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য এসেছিলেন তিনি। তবে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ভোট গ্রহণ প্রক্রীয়া শুরু হতে দেরি হচ্ছিলো বলে তাকে কিছুটা বেশি সময় অতিবাহিত করতে হয়েছে ভিতরে।

এদিকে ভোট চলাকালে সকাল ১০টায় রাইফেলস ক্লাবে উপস্থিত হন স্বাধিনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) নেতা আবু জাফর চৌধুরী বিরু। মূলত ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণে ও প্রার্থীদের অবস্থা দেখতেই সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নির্বাচনস্থল পরিদর্শন শেষে চলে যাওয়ার সময় স্বাচিপ সমর্থিত প্যানেলের প্রতিদ্বন্দ্বি প্যানেলের সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী ডা. আতিকুজ্জামান সোহেল বিরুকে বলেন, ‘আমাকে বাদ দিয়ে কাদেরকে স্বাচিপে নেতা বানিয়েছো। তোমাদের কারণে আমাদেরকে ছোটদের সাথে নির্বাচন করতে হচ্ছে। তোমাকে আমরা স্বাচিপের কেন্দ্রের নেতা বানিয়েছি। টাকার বিনিময়ে বাইরের লোকদের নেতা বানাও, সমর্থন দেও। এগুলো পরিহার করো। আমাদের সমর্থন দেওয়া তোমাদের উচিত ছিল। এদের সাথে কি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যায়। তোমরাতো এদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিচ্ছো। এই বয়সে তাদের কিসের রাজনীতি?’

ওই সময়ে বিরু প্রতিত্তরে বলেন, ‘এগুলো আমাকে বলছ কেন? আমিতো নির্বাচন দেখতে এসেছি।’ এসব বলেই তিনি গাড়ির উদ্দেশ্যে চলে যান। কিন্তু এই কথাগুলোর রেশ পরবর্তী সময়েও আতিকুজ্জামান সোহেল ও তার প্যানেলের অন্য অনেক প্রার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে।

মূলত সরাসরি স্বাচিপ সমর্থিত প্যানেলের অধিকাংশ প্রার্থীরাই ছিলো সোহেল-নিজাম প্যানেলের প্রার্থীদের তুলনায় অনেক তরুণ। ফলে ভোটারদের কাছে প্রতিবার ভোট চাইতে যাবার সময় সাথে এইসকল তরুণদেরকেও ভোট চাইতে দেখে বিষয়টিতে অনেকটা আত্মসম্মানে আঘাত পায় আতিকুজ্জামান সোহেল সহ অন্যরা। ফলে সোহেল-নিজাম প্যানেলের প্রার্থীরা সরাসরি ভোট না চেয়ে অধিকাংশ সময়েই দেখা গেছে তুলনামূলকভাবে তাদের অল্প বয়সী সমর্থকদের দিয়ে ভোট চাইয়েছেন দিনের অধিকাংশ সময়। পরবর্তীতে ভোট গণনার শুরু হবার কিছু সময় পর থেকেই তাদের অধিকাংশ প্রার্থী অবস্থান করেছেন ভোটকেন্দ্রের বাইরে। অন্যদিকে ইকবাল-দেবাশীষ প্যানেলের প্রার্থীরা বিচ্ছিন্নভাবে ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে অবস্থান নেয় এবং পরবর্তীতে একসাথে তাদের নির্বাচনী প্যান্ডেলে বসে সময় কাটায়।

এদিকে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতি থাকলেও তারা ছিলেন অনেকাংশে নীরর। তাদের প্রধান অবস্থান ছিলো রাইফেল ক্লাবের মূল ফটকের সামনে। কিন্তু রাইফেল ক্লাবে অনুপ্রবেশকারী কারো পরিচয় শনাক্ত না করেই তাদের অবাধে ভিতরে প্রবেশের অধিকার দিয়েছেন তারা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়েই বিশৃঙ্খলার পরিকল্পনাকারীরা রাইফেলস ক্লাবের ভিতরে অবস্থান নিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। ফলে সামান্য বিতর্কের সুযোগ নিয়েই সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বি প্যানেলের সভাপতি পদপ্রার্থী ডা. চৌধুরী ইকবাল বাহারের ওপর হামলা করে ডা. আতিকুজ্জামান সোহেল।

এসময় অনেকটা আত্মরক্ষার্থেই পাল্টা হাতাহাতি করে ইকবাল-দেবাশীষ প্যানেলের সমর্থকগণ। পরবর্তীতে দ্রুত প্রস্থানকালে দফতর সম্পাদক পদপ্রার্থী ডা. ইউসুফ আলী সরকার ও এএসপি পদমর্যাদা সম্পন্ন এক পুলিশ কর্মকর্তাসহ আরও কয়েকজনের উপর বহিরাগতদের নিয়ে নিজেই হামলা করেন ডা. সোহেল। ওই সময়ে অন্তত ৫ জন আহত হয়। ঘটনার পর গণমাধ্যমকে দেয়া বক্তব্যে ডা. আতিকুজ্জামান সোহেল জানান, তারা নির্বাচন বয়কট করেছেন। উল্লেখ্য যে, হামলার শিকার ঐ পুলিশ কর্মকর্তা সে সময়ে সাদা পোশাকে ছিলেন এবং তিনি সম্পর্কে ডা. ইকবাল বাহার চৌধুরীর আত্মীয় বলে জানা গেছে।

এরপূর্বে বৃহস্পতিবার ৬ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা হতে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত শহরের চাষাঢ়া রাইফেল ক্লাব প্রাঙ্গনে ওই ঘটনা ঘটে যেখানে সকাল ১০টা হতে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোট গ্রহণ চলে।

জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে দুটি প্যানেল অংশ নেয়। যেখানে স্বাচিপ এর ২৩জনের প্যানেলের বিপরীতে সভাপতি ছাড়া ২২ জনের প্যানেল ঘোষণা করে সহ-সভাপতি আতিকুজ্জামান সোহেল ও সেক্রেটারী নিজাম আলীর নেতৃত্বে। এদের মধ্যে সোহেল হলেন মহানগর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক। এছাড়া সভাপতি হিসেবে স্বতন্ত্র পদে থাকা ডা. শাহনেওয়াজ থাকলেও তিনিও অন্তরালে এ প্যানেলের অধিভুক্ত ছিলেন। অপর প্যানেলের নেতৃত্বে ছিলেন স্বাচিপ সমর্থিত ইকবাল বাহার ও দেবাশীষ সাহা।

আতিকুর রহমান সোহেল, শাহনেওয়াজ চৌধুরিসহ স্বাচিপ প্যানেলের বিরোধী প্যানেলের অধিকাংশ প্রার্থীরাই চাননি নির্বাচন হোক। তারা মূলত সিলেকশনের মধ্য দিয়ে কমিটি চেয়েছিলেন। যেখানে বয়স ও অভিজ্ঞতা বলে তারা অগ্রাধিকার পাবেন বলে আশা করতেন।

দিনব্যাপী ভোটগ্রহণে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলেও রাত ১১টায় গণনা চলাকালে ডা. অলোক কুমার সাহা ভোট গণনা কক্ষের জানালার সামনে আসেন এবং হৈ চৈ করতে শুরু করেন। এ সময় তিনি বলেন, ভিতরে ভোট গণনা নিয়ে চাতুরি হচ্ছে, তিনি বাধা দেওয়ায় তাকে অপমান করা হচ্ছে। তার এমন কথার পর থেকেই শুরু হয় হট্টগোল। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়েই ইকবাল-দেবাশীষ প্যানেলের উপর চরাও হয় ডা. আতিকুজ্জামান সোহেল।

পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। ওই হামলার নেতৃত্বে ছিলেন শহরের দেওভোগ এলাকার সাগর সহ আরো কয়েকজন যারা মূলত মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জিএম আরাফাতের অনুগামী হিসেবে পরিচিত।

মূলত সাধারণ সম্পাদকের পদপ্রার্থীর একটি ভোট নিয়ে গণনা কক্ষের ভিতরে জটিলতা তৈরি হলে সোহেল-নিজাম প্যানেলের পক্ষ থেকে ডা. অলোক ভোট পুনরায় গণনা করতে হবে বলে দাবি তোলেন। সে সময় নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়, ‘ভোটের ব্যাবধান যদি কম দেখা যায় তবে রিকাউন্ট করা হবে প্রথম দফায় ভোট গণনা শেষ করা হোক। যদি ভোটের ব্যবধান বেশি হয় তাহলে পুনরায় গণনার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।’ কিন্তু বিষয়টি মেনে নেয়নি সোহেল-নিজাম প্যানেলের প্রতিনিধিগণ। এ সময় স্বাচিপ সমর্থিত প্যানেলের প্রতিনিধিদের সাথে তর্কে জড়ায় ডা. অলোক। তর্ক বাড়তে থাকলে বাইরে সে তথ্য জানান ডা. অলোক।

ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত কয়েকজন ডাক্তার জানান, গণনার সময়ে ইকবাল বাহার ও দেবাশীষ প্যানেল এগিয়ে ছিলেন। এসব নিয়ে বিপরীত প্যানেলের সঙ্গে বাকবিতন্ডার জের ধরেই মারামারি ও হাতাহাতির সূত্রপাত ঘটে।

পরে আতিকুজ্জামান সোহেল ও তার লোকজন ভোটকেন্দ্র থেকে চলে আসে। এ ব্যাপারে ইকবাল জানান, রাত ১১টায় ৩১৫ ভোটের মধ্যে প্রায় দেড় শ ভোটের গণনায় সভাপতি প্রার্থী হিসেবে আমি ও সেক্রেটারী পদে দেবাশীষ সাহা সহ অন্যরা এগিয়ে ছিলাম। এ কারণেই প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীরা হৈ চৈ শুরু করে। এক পর্যায়ে আমাকে ও আমাদের লোকজনদের মারধর শুরু করে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করে।

অপরদিকে আতিকুজ্জামান সোহেল জানান, তাদের জয় যখন নিশ্চিত তখন জোর করে পরাজিত করতেই পরিকল্পনামাফিক আমাদের উপর হামলা করা হয়। আমরা তখন বয়কট করে কোনমতে জীবন নিয়ে বের হয়ে আসি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
rabbhaban
আজকের সবখবর