স্বপন হত্যায় ১০৯ ও প্রবীর ২০৩ পাতার চার্জশীট আদালতে দাখিল


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৫:২৩ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, সোমবার
স্বপন হত্যায় ১০৯ ও প্রবীর ২০৩ পাতার চার্জশীট আদালতে দাখিল

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষ ও কাপড় ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহা হত্যা মামলার চার্জশীট (অভিযোগপত্র) আদালতে দাখিল করা হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুরে মামলা দুটির তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এস আই মফিজুল ইসলাম ওই দুটি চার্জশীট আদালতে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর দাখিল করেন। এর মধ্যে স্বপন কুমার সাহা হত্যায় ১০৯ পাতা ও প্রবীর চন্দ্র ঘোষ হত্যায় ২০৩ পাতার চার্জশীট আদালতে দাখিল করা হয়।

এর মধ্যে প্রবীর ঘোষ হত্যাকান্ডের ঘটনায় পিন্টু দেবনাথ, আবদুল্লাহ আল মামুন ও বাপেন ভৌমিককেও অভিযুক্ত করা হয়। অপরদিকে স্বপন কুমার সাহা হত্যা মামলায় পিন্টু দেবনাথ, তার বান্ধবী রত্না রাণী চক্রবর্তী ও আবদুল্লাহ আল মামুনকে অভিযুক্ত করা হয়ে।

এস আই মফিজুল ইসলাম নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানান, চার্জশীট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। মামলাগুলো বেশ জটিল ছিল। একেবারেই ক্লুলেস ছিল। সেখান থেকে রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। আশা করছি চার্জশীটের পর প্রকৃত দোষীদের সর্বোচ্চ সাজাও পাবে।

প্রসঙ্গত গত ১৮ জুন রাতে নিখোঁজ হয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ। পরে গত ৯ জুলাই সড়কে শহরের কালীরবাজার এলাকা থেকে পিন্টু দেবনাথ ও বাপানে ভৌমিক বাবুকে গ্রেফতার করে ডিবি। তাদের দেওয়া তথ্য মতে রাতেই শহরের আমলাপাড়া এলাকার রাশেদুল ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীর ঘোষের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন ১০ জুলাই দুইজনকেই ৫দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। এর আগে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর নিখোঁজের পর খুন হন ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহা। রিমান্ডে থাকা অবস্থায় স্বপন হত্যা নিয়ে তথ্য দেন বাবু। এরই মধ্যে স্বপনের বড় ভাই অজিত কুমার সাহা গত ১৬ জুলাই সদর মডেল থানায় একটি হত্যা ও গুমের মামলা করে। সেখানে পিন্টু দেবনাথ, বাপান, আব্দুল্লাহ আল মামুন ও রত্না চক্রবর্তীকে আসামী করে মামলা করে।

জবানবন্দীতে পিন্টু বলেন, ঈদ উপলক্ষে শান্ত পরিবেশ থাকা প্রবীর চন্দ্র ঘোষকে ১৮ জুন রাতে বিয়ার পানের পার্টির কথা বলে তার বাসা থেকে বের করি। পরে আমার ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে বসাই। সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে থাকি একত্রে। ওই সময়ে আগে নেওয়া স্প্রাইট পান করে প্রবীর। খেয়েছিল বিস্কুটও। খাওয়ার সময়েই আমি তাকে পিছন থেকে আগে থেকে কেনা চাপাতি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করি। তখন প্রবীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় প্রবীর আমাকে কয়েকদফা লাথি মারতে থাকলে ওরে আবারো লাঠি ও দা দিয়ে আঘাত করতে থাকি। এ সময় প্রবীর রক্তাক্ত অবস্থায় টিভি রুমের খাটে লুটে পড়ে। শরীর ঢেকে দেওয়া হয় বালিশ ও চাদর দিয়ে। পরে ধারালো চাপাতি দিয়ে তার দেহ’কে ৭ টুকরো করা হয়। মাথা, দুই হাত, দুই পা, বডি, পেট ও পাজর ৭টি খন্ড করে বাজার থেকে ক্রয়কৃত ৭টি নতুন আকিজ সিমেন্টের ব্যাগের মধ্যে ৪টিতে টুকরো টুকরো লাশ ভরি। আরেক ব্যাগে বালিশ, খাটের চাদর, ব্যবহার করা জামা ও দা প্যাকেট করি। পরে ঘরের বাথরুমে রক্তাক্ত ও নিজে গোসল করি। পরিবেশ শান্ত অবস্থায় আনুমানিক সাড়ে ১২টায় বাসা নিচে পরিত্যক্ত সেফটি ট্যাংকটিতে ৩ ব্যাগে থাকা ৫ টুকরো ঢুকাতে শুরু করি। আরেকটি ব্যাগ বাড়ির উত্তর পাশে ময়লাস্তূপে সাথে ড্রেনে মাথায় ফেলে দেই। কাজ শেষ করে বাসায় হাত পরিস্কার করে ফের প্রবীর চন্দ্র ঘোষের বাড়িতে রাত দেড়টার দিকে ছুটে যাই। রাতেই শীতলক্ষ্যা নদীতে এসে ফেলে দেই চাপাতি, বিছানার চাদর আর বালিশ।

ডিবির রিমান্ডে পিন্টু আরো জানায়, প্রবীরের টাকায় ক্রয়কৃত স্বর্ণ ভবনের দোকান, বন্ধকী টাকা আত্মসাত ও ভয়ভীতি কারণে প্রবীরকে হত্যা করে। এর সাথে ২ বছরে আগে আরেক ব্যবসায়ী নিখোঁজ স্বপন কুমার সাহাকে একই রকমভাবে হত্যা ও খন্ডিত লাশ শীতলক্ষা নদীতে ফেলে দেয়া কথা স্বীকার করে। এ সময় তার সহযোগি রত্মা চক্রবর্তী-কে গ্রেপ্তার করে ডিবি। ভয়ভীতি দেখানো অভিযোগে গ্রেপ্তার হন বড় ভাই নামক আব্দুল্লাহ আল মামুন। পিন্টু স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, ভারতে ফø্যাটের আত্মসাতের কারণে স্বপনকে হত্যা করা হয়।

কাপড় ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহাকে ৭ টুকরো করে হত্যার পরে শীতলক্ষ্যায় লাশ ফেলে দেয়ার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে বন্ধুরূপী ঘাতক পিন্টু। ২২ জুলাই বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল মহসীনের আদালতে পিন্টুর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। প্রায় ৪ঘণ্টায় ৮ পাতার জবানবন্দীতে স্বপন হত্যার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন পিন্টু। এর আগে গত ১৯ জুলাই স্বপন হত্যা মামলার আসামী পিন্টুর বান্ধবী রত্না রাণী কর্মকার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে স্বপন হত্যার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন। একইদিন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন আবদুল্লাহ আল মোল্লা মামুনও।

আদালতে পিন্টু জানিয়েছে, ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর বাজার কাজী বাড়ির প্রবাসী আজহারুল ইসলামের ৪ তলা ভবনের ২য় তলায় হত্যার পূর্বে যৌন মিলনের প্রলোভন দেখিয়ে পিন্টু তার প্রেমিকা রত্মা রানীকে দিয়ে স্বপনকে ডেকে নেয় মাসদাইরের ওই ফ্ল্যাটে। এরপর বিছানায় বসিয়ে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করে পূর্বে থেকে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রাখা ফ্রুটিকা জুস স্বপনকে পান করায় রত্মা রানী। এতে ঘুমিয়ে পড়ে স্বপন। এরপর শীল পাটা দিয়ে স্বপনের মাথায় আঘাত করে পিন্টু। পরে বাথরুমে নিয়ে বটি দিয়ে লাশ গুমের জন্য ৭ টুকরো করা হয়। পরে রাতে ৫টি বাজারের ব্যাগে করে ওই লাশ তিন দফায় শীতলক্ষ্যা নদীতে নিয়ে ফেলে দেয় পিন্টু। সহায়তা করে রতœা। সে ও পিন্টু মিলেই বাড়ির নিচে ব্যাগগুলো নামায়। মাসদাইর থেকে তিন দফায় ঘাটে ব্যাগগুলো আনা হয়। প্রথম দফায় একটি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় দুটি করে ব্যাগ কেন্দ্রীয় লঞ্চ টার্মিনালের পাশে সেন্ট্রাল খেয়া ঘাটে আনে। মাসদাইর থেকে রিকশায় করে লাশবোঝাই ব্যাগগুলো যাতে কেউ বুঝতে না পারে সেজন্য উপরে দেওয়া হয় সবজি। প্রত্যেকবার সে বৈঠা চালানো নৌকা রিজার্ভ করে বন্দর ঘাটে যাওয়ার জন্য। পরে মাঝির অগোচরে ব্যাগগুলো ফেলে দেওয়া হয় শীতলক্ষ্যায়। এর মধ্যে একটি নৌকার মাঝি পিন্টুকে জিজ্ঞাসা করেছিল ব্যাগে কী। উত্তরে পিন্টু বলেছিল পূজার জিনিসপত্র ফেলে দেওয়া হচ্ছে। পূজা তো শেষ তাই নিয়ম অনুযায়ী প্রতিমা নদীতে ফেলতে হয়। এগুলো ব্যাগের ভেতরে করে এনেছিলাম।

১৯ জুলাই স্বপন হত্যা মামলার আসামী রত্না রাণী কর্মকার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে স্বপন হত্যার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন। রত্না আদালতকে জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ কাচারীগলি এলাকার মৃত সোনাতন চন্দ্র সাহার ছেলে কাপড় ব্যবসায়ী ও পাসপোর্ট অফিসের দালাল স্বপন কুমার সাহা, আমলাপাড়া এলাকার স্বর্ণব্যাবসী পিন্টু ও স্বর্ণব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ ছিলেন একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর রত্মা রানী ছিলেন পিন্টুর ঘনিষ্ঠ বান্ধুবী। বিয়ের আশ্বাস দিয়ে রত্মা রানীর কাছ থেকে সাত লাখ টাকা ধার নেয় পিন্টু। এরপর থেকে রত্মা রানী প্রায় সময় পিন্টুর ফ্ল্যাটে যাতায়াত করত এবং তাদের মধ্যে অবৈধ যৌন মেলা মেশা চলত। পিন্টুকে ভারতে বাড়ি কিনে দেয়ার প্রলোভন দেখায় স্বপন। এরপর ভারতে নিয়ে একটি ফ্ল্যাটও পিন্টুর টাকায় স্বপন তার ভাগ্নির নামে কিনে দেয়। তখন পিন্টুকে স্বপন বলে ছিল ভারতে নাগরিত্ব করিয়ে তার ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিবে। কিন্তু তা না করে পিন্টুকে ঘুরাতে থাকে স্বপন। একই সঙ্গে প্রবীর ঘোষের সাথে মিলে পিন্টুকে নানা ভাবে হয়রানী করতে পরামর্শ করে স্বপন। এদিকে ভারতের ওই ফ্লাট পিন্টুকে বুঝিয়ে না দেয়ায় আমলাপাড়া এলাকার বড় ভাই হিসেবে পরিচিত আব্দুল্লাহ আল মোল্লা মামুনকে টাকা তুলে দেয়ার কন্ট্রাক্ট দেয় পিন্টু। তখন পিন্টুর পক্ষ নিয়ে স্বপনকে টাকা ফেরত দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টিসহ নানা ধরনের হুমকীও দিত মোল্লা মামুন। কিন্তু তাতেও কোন ধরনের কাজ না হওয়ায় স্বপনকে হত্যা করার পরিকল্পনা করতে থাকে পিন্টু। পরে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর রাতে রত্নার ফ্ল্যাটে স্বপনকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। ওই কিলিং মিশনে ছিল রত্না ও তার প্রেমিক পিন্টু দেবনাথ।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
-->
newsnarayanganj24_address
মহানগর এর সর্বশেষ খবর
আজকের সবখবর