স্বপন হত্যায় পিন্টু রত্মা মামুন অভিযুক্ত


সিটি করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:১৯ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, সোমবার
স্বপন হত্যায় পিন্টু রত্মা মামুন অভিযুক্ত

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত কাপড় ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহা হত্যা মামলার চার্জশীট (অভিযোগপত্র) ঘাতক রত্মা, তার পরকীয় প্রেমিক পিন্টু দেবনাথ ও বড় ভাই মোল্লা মামুনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেছে তদন্তকারী সংস্থা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সোমবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে চার্জশীটটি দাখিল করেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এসআই মফিজুল ইসলাম পিপিএম। এতে স্বাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ২০ জনকে। এছাড়া হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত লম্বা বটি দা, শীল পুতাসহ বিভিন্ন আলামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযুক্তরা হলো, ফতুল্লার মাসদাইর বাজারের মামুন সাহেবের বাড়ির ভাড়াটিয়া রঞ্জন চক্রবর্তীর স্ত্রী রত্মা রানী চক্রবর্তী (৩২), কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার চন্দনপুর গ্রামের মৃত সতীশ দেবনাথের পুত্র বর্তমানে আমলাপাড়া কেসি নাগ রোডের ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দেবনাথ (৪১), ও আমলাপাড়া কেবি সাহা রোডের মৃত হাজী মহসিন মোল্লার পুত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন মোল্লা (৫১)।

উল্লেখ্য গত ১৮ জুন রাতে নিখোঁজ হয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ। পরে গত ৯ জুলাই সড়কে শহরের কালীরবাজার এলাকা থেকে পিন্টু দেবনাথ ও বাপানে ভৌমিক বাবুকে গ্রেফতার করে ডিবি। তাদের দেওয়া তথ্য মতে রাতেই শহরের আমলাপাড়া এলাকার রাশেদুল ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীর ঘোষের খ-িত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন ১০ জুলাই দুইজনকেই ৫দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। এর আগে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর নিখোঁজের পর খুন হন ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহা। রিমান্ডে থাকা অবস্থায় স্বপন হত্যা নিয়ে তথ্য দেন বাবু। এরই মধ্যে স্বপনের বড় ভাই অজিত কুমার সাহা গত ১৬ জুলাই সদর মডেল থানায় একটি হত্যা ও গুমের মামলা করে। সেখানে পিন্টু দেবনাথ, বাপান, আব্দুল্লাহ আল মামুন ও রত্মা চক্রবর্তীকে আসামী করে মামলা করে।

কাপড় ব্যবসায়ী স্বপন কুমার সাহাকে ৭ টুকরো করে হত্যার পরে শীতলক্ষ্যায় লাশ ফেলে দেয়ার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে বন্ধুরূপী ঘাতক পিন্টু। ২২ জুলাই বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল মহসীনের আদালতে পিন্টুর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। প্রায় ৪ঘণ্টায় ৮ পাতার জবানবন্দীতে স্বপন হত্যার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন পিন্টু। এর আগে গত ১৯ জুলাই স্বপন হত্যা মামলার আসামী পিন্টুর বান্ধবী রত্মা রাণী কর্মকার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে স্বপন হত্যার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন। একইদিন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন আবদুল্লাহ আল মোল্লা মামুনও।

আদালতে পিন্টু জানিয়েছে, ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর বাজার কাজী বাড়ির প্রবাসী আজহারুল ইসলামের ৪ তলা ভবনের ২য় তলায় হত্যার পূর্বে যৌন মিলনের প্রলোভন দেখিয়ে পিন্টু তার প্রেমিকা রত্মা রানীকে দিয়ে স্বপনকে ডেকে নেয় মাসদাইরের ওই ফ্ল্যাটে। এরপর বিছানায় বসিয়ে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করে পূর্বে থেকে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রাখা ফ্রুটিকা জুস স্বপনকে পান করায় রত্মা রানী। এতে ঘুমিয়ে পড়ে স্বপন। এরপর শীল পাটা দিয়ে স্বপনের মাথায় আঘাত করে পিন্টু। পরে বাথরুমে নিয়ে বটি দিয়ে লাশ গুমের জন্য ৭ টুকরো করা হয়। পরে রাতে ৫টি বাজারের ব্যাগে করে ওই লাশ তিন দফায় শীতলক্ষ্যা নদীতে নিয়ে ফেলে দেয় পিন্টু। সহায়তা করে রত্মা। সে ও পিন্টু মিলেই বাড়ির নিচে ব্যাগগুলো নামায়। মাসদাইর থেকে তিন দফায় ঘাটে ব্যাগগুলো আনা হয়। প্রথম দফায় একটি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় দুটি করে ব্যাগ কেন্দ্রীয় লঞ্চ টার্মিনালের পাশে সেন্ট্রাল খেয়া ঘাটে আনে। মাসদাইর থেকে রিকশায় করে লাশবোঝাই ব্যাগগুলো যাতে কেউ বুঝতে না পারে সেজন্য উপরে দেওয়া হয় সবজি। প্রত্যেকবার সে বৈঠা চালানো নৌকা রিজার্ভ করে বন্দর ঘাটে যাওয়ার জন্য। পরে মাঝির অগোচরে ব্যাগগুলো ফেলে দেওয়া হয় শীতলক্ষ্যায়। এর মধ্যে একটি নৌকার মাঝি পিন্টুকে জিজ্ঞাসা করেছিল ব্যাগে কী। উত্তরে পিন্টু বলেছিল পূজার জিনিসপত্র ফেলে দেওয়া হচ্ছে। পূজা তো শেষ তাই নিয়ম অনুযায়ী প্রতিমা নদীতে ফেলতে হয়। এগুলো ব্যাগের ভেতরে করে এনেছিলাম।

১৯ জুলাই স্বপন হত্যা মামলার আসামী রত্মা রাণী কর্মকার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে স্বপন হত্যার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন। রত্মা আদালতকে জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ কাচারীগলি এলাকার মৃত সোনাতন চন্দ্র সাহার ছেলে কাপড় ব্যবসায়ী ও পাসপোর্ট অফিসের দালাল স্বপন কুমার সাহা, আমলাপাড়া এলাকার স্বর্ণব্যাবসী পিন্টু ও স্বর্ণব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ ছিলেন একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর রত্মা রানী ছিলেন পিন্টুর ঘনিষ্ঠ বান্ধুবী। বিয়ের আশ্বাস দিয়ে রত্মা রানীর কাছ থেকে সাত লাখ টাকা ধার নেয় পিন্টু। এরপর থেকে রত্মা রানী প্রায় সময় পিন্টুর ফ্ল্যাটে যাতায়াত করত এবং তাদের মধ্যে অবৈধ যৌন মেলা মেশা চলত। পিন্টুকে ভারতে বাড়ি কিনে দেয়ার প্রলোভন দেখায় স্বপন। এরপর ভারতে নিয়ে একটি ফ্ল্যাটও পিন্টুর টাকায় স্বপন তার ভাগ্নির নামে কিনে দেয়। তখন পিন্টুকে স্বপন বলে ছিল ভারতে নাগরিত্ব করিয়ে তার ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিবে। কিন্তু তা না করে পিন্টুকে ঘুরাতে থাকে স্বপন। একই সঙ্গে প্রবীর ঘোষের সাথে মিলে পিন্টুকে নানা ভাবে হয়রানী করতে পরামর্শ করে স্বপন। এদিকে ভারতের ওই ফ্লাট পিন্টুকে বুঝিয়ে না দেয়ায় আমলাপাড়া এলাকার বড় ভাই হিসেবে পরিচিত আব্দুল্লাহ আল মোল্লা মামুনকে টাকা তুলে দেয়ার কন্ট্রাক্ট দেয় পিন্টু। তখন পিন্টুর পক্ষ নিয়ে স্বপনকে টাকা ফেরত দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টিসহ নানা ধরনের হুমকীও দিত মোল্লা মামুন। কিন্তু তাতেও কোন ধরনের কাজ না হওয়ায় স্বপনকে হত্যা করার পরিকল্পনা করতে থাকে পিন্টু। পরে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর রাতে রত্মার ফ্ল্যাটে স্বপনকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। ওই কিলিং মিশনে ছিল রত্মা ও তার প্রেমিক পিন্টু দেবনাথ।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
-->
newsnarayanganj24_address
মহানগর এর সর্বশেষ খবর
আজকের সবখবর