বিএসএফের গুলিতে নিহতদের জন্য গায়েবানা জানাজা


তরিকুল সুজন, সমন্বয়ক নারায়ণগঞ্জ গণসংহতি : | প্রকাশিত: ০৯:১৯ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বৃহস্পতিবার
বিএসএফের গুলিতে নিহতদের জন্য গায়েবানা জানাজা

গতবছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন যে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের হাতে মোট ৩৩২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তিনি আরও জানান, ২০০৯ সালে ৬৬ জন, ২০১০ সালে ৫৫ জন, ২০১১ ও ২০১২ সালে ২৪ জন করে, ২০১৩ সালে ১৮ জন, ২০১৪ সালে ২৪ জন, ২০১৫ সালে ৩৮ জন, ২০১৬ সালে ২৫ জন, ২০১৭ সালে ১৭ জন এবং ২০১৮ সালে মাত্র ৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। ২০১৯ সালে ৩৮ জন, ২০২০ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ১০ জন সীমান্তে হত্যার শিকার হয়েছেন।

এই ভয়ংকর হত্যাকান্ডকে ভারত রাষ্ট্র বলছে, অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা! অপর দিকে বাংলাদেশ যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যার্থ হয়েছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাতো দূরের কথা সরকারের কর্তাব্যক্তিরা চরম দায়িত্ব জ্ঞানহীন এবং নাগরিকদের জীবন নিয়ে তামাশা করছেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং তিস্তার পানি নিয়ে বলেছেন, ‘উভয় দেশের সম্পর্ক খুবই ভাল। অনেকটা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মতো। টুকটাক মতানৈক্য থাকলেও মিটে যায়।’ অপর দিকে খাদ্য মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘কেউ যদি জোর করে কাঁটাতারের বেড়া কেটে গরু আনতে যায় আর ইন্ডিয়ার মধ্যে গুলি খেয়ে মারা যায়, তার জন্য দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকার নেবে না।’

কিশোরী ফেলানীর হত্যাকান্ড আমরা ভুলে যাইনি। আমরা জানি, নয়াদিল্লীতে গৃহকর্মীর কাজ করা ফেলানী সেদিন তার বাবার সঙ্গে বাংলাদেশে ফিরছিল। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করার সময়, ফেলানীর পোশাক কাঁটাতারের বেড়ায় জড়িয়ে যায়। আতঙ্কিত হয়ে সে চিৎকার শুরু করে। ভারতের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী (বিএসএফ) সেই চিৎকারের জবাব দেয় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে। সেখানেই ফেলানী মারা যায়। মধ্যযুগীয় কায়দায় তার প্রাণহীন দেহটি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে উল্টোভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।

অথচ দেখা যাবে সীমান্তে যারা হত্যার শিকার হন তাদের কাছে বড়জোর কাস্তে, লাঠি থাকে। এমন ব্যক্তিদের মোকাবিলায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী গুলি করে মেরে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীদের পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে পিঠে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। এবং সীমান্ত হত্যাকে কেন্দ্র করে যতগুলো মামলা হয়েছে, তদন্ত করা মামলার কোনোটিতেই বিএসএফ প্রমাণ করতে পারেনি যে হত্যার শিকার ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র বা বিস্ফোরক পাওয়া গেছে। যার দ্বারা তাদের প্রাণ সংশয় বা গুরুতর আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। সুতরাং, বিএসএফের মেরে ফেলার জন্য গুলি চালানো বাংলাদেশী নাগরিকদের প্রতি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। এবং এটা কার্যত মানুষের জীবনের অধিকার লঙ্ঘন এবং তথাকথিত `বন্ধু রাষ্ট্র` হিসেবে ভারত কোনভাবেই এটা করতে পারে না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি সীমান্ত হত্যার জন্য দায়ি। এবং নাগরিক হত্যার দায় বর্তমান সরকার কোন ভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না।

সীমান্তে হত্যাকান্ডের শিকার বাংলাদেশীদের মৃত্যু বাংলাদেশ ভূখন্ডের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত। তাঁরা জীবন দিয়ে আমাদের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ও বাংলাদেশের প্রতি ভারত সরকারের আগ্রাসী মানসিকতার শিকার হয়েছেন। তাদের আত্মদান আমাদেরকে আবারো দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ করে। ৫২ ও ৭১ এ পাকিস্তানী শোষকদের জবরদস্তিমূলক শোষণনীতির শিকার হয়েছেন আমাদের পূর্বসুরীরা। এখন ভারত সরকারের শোষণনীতির শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশের নাগরিকরা। ৫২ ও ৭১ এর শহীদদের মতো তাঁরাও আমাদের বীর। তাঁদের এই মৃত্যুকে আমরা শহীদী মৃত্যু বলে মনে করি।

তাই ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১ টায় নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে গায়েবানা জানাযার আয়োজন করেছে গণসংহতি আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলা। জানাযায় নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের জনগণকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাই।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর