নারায়ণগঞ্জে নাটকের সোনালী অতীত


এস এম শহিদুল্লাহ | প্রকাশিত: ০৮:৩২ পিএম, ২৭ মার্চ ২০২০, শুক্রবার
নারায়ণগঞ্জে নাটকের সোনালী অতীত

নাটক সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা। নাটক, নাট্য, নট, নটী- এই শব্দগুলোর মূল শব্দ হলো নট্। নট্ মানে হচ্ছে নড়াচড়া করা, অঙ্গচালনা করা। নাটকের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো উৎধসধ, শব্দটি এসেছে Dracin  শব্দ থেকে। যার অর্থ হলো to do  বা কোনো কিছু করা। নাটকের মধ্যে আমরা মূলত অভিনেতা অভিনেত্রীদের নড়াচড়া কথাবার্তা ইত্যাদির মাধ্যমে জীবনের বিশেষ কোনো দিক বা ঘটনার উপস্হাপন দেখতে পাই। নাটক জীবনের কথা বলে।

নারায়ণগঞ্জের শৈল্পিক কাজকর্মের যেটুকু তথ্য পাওয়া যা, তা থেকে মনে হয় যে নাট্যকর্মই ছিল এখানে প্রবল। নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক জীবনে নাটকের দিকটাই সুস্পষ্ট। প্রথমেই যে নাট্যক্লাবের কথা আসে তা হলো ১৯৪০-পূর্ববর্তী সময়ের ভিক্টোরিয়া ড্রামাটিক ক্লাব। তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন জীতেন চ্যাটার্জি।

উল্লেখযোগ্য কর্মীদের মধ্যে ছিলেন শিবনাথ সাহা, তারা শংকর বন্দোপাধ্যায়, হরিপদ সাহা, খগেন্দ্র ধর, বারীন ধর প্রমুখ। তাঁরা বিভিন্ন সময়ে নাট্যানুষ্ঠানের আয়োজন করতেন।

১৯৪০-৪১ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় আমলাপাড়া ড্রামাটিক ক্লাব। এই ক্লাবের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ভুপেশ ঘোষ এবং উল্লেখযোগ্য অভিনেতা ছিলেন গোপাল ডাক্তার, নগেন্দ্র ধর, অম্বুজ চ্যাটার্জি, শশী মিত্র প্রমুখ। প্রায় এই সময়েই গড়ে ওঠে শীতলক্ষ্যা ড্রামাটিক ক্লাব। তত্ত্বাবধায়ক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রমেশ চ্যাটার্জি। অভিনেতা ছিলেন শিবু দাস, হিমাংশু দাস, বসন্ত সোম, অমিয় চ্যাটার্জি প্রমুখ। এই সময় আরও একটি ড্রামাটিক ক্লাব স্থাপিত হয় উকিলপাড়ায়। নিতাইগঞ্জে স্থাপিত হয় চন্দ্রকলা মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউট। তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ব্রজলাল ও মদনলাল সেরাওগী।

উল্লেখ্য যে, তোলারাম কলেজ যাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত মদনলাল সেরাওগী ছিলেন তোলারাম বসরাজের ভাই। মদনলাল ১৯৪৮ সালের দিকে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। এই ইনস্টিটিউটের অন্যতম অভিনেতা ছিলেন সত্যনারায়ণ গৌরী সরিয়া, যোগেন রায়, সুধীর নিয়োগী, বিমল নিয়োগী ও মহাবীর ভোদী প্রমুখ। চল্লিশের দশককে নারায়ণগঞ্জের নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রকে স্বর্ণযুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। ১৯৪০ সালের শেষার্ধে কলকাতার বিখ্যাত মিনার্ভা থিয়েটার নারায়ণগঞ্জ এসেছিল।

স্থানীয় হংস থিয়েটারে সিরাজদ্দৌল্লা নাটকের সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনী করে জনসাধারণকে ব্রিটিশ শাসনবিরোধী সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে উজ্জীবিত করেছিল। ১৯৪১ সালের গোড়ার দিকে পশ্চিমবঙ্গের রঙ্গমহল থিয়েটার নারায়ণগঞ্জ আসে। বেলা ১১টার সময় যখন গোয়ালন্দ থেকে স্টিমার নারায়ণগঞ্জ ঘাটে পৌঁছে তখন রঙ্গমহল থিয়েটারের প্রখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের একনজর দেখার জন্য স্টিমারঘাটে প্রচুর জনসমাগম হয়। জনতার প্রচন্ড চাপে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে ভিড় সরাতে পুলিশকে ব্যাপক লাঠিচার্জ করতে হয়। প্রখ্যাত অভিনেতা মিহির ভট্টাচার্য, জহর গাঙ্গুলি, তুলসী লাহিড়ী, পূর্ণিমা সেনগুপ্তা প্রমুখ ছিলেন সেদিনের অতিথি। রঙ্গমহল বাণী টকিজে (পরবর্তীতে ডায়মন্ড সিনেমা হল) মঞ্চস্থ করেছিল বিখ্যাত নাটক ‘কঙ্কাবতীর ঘাট’ ও ‘মহুয়া’।

১৯৪৯-৫০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় নাট্য সংগঠন ‘নারায়ণগঞ্জ এ্যামেচার ক্লাব’। সভাপতি পদাধিকারবলে মহকুমা প্রশাসক এবং সম্পাদক ছিলেন ভুপেষ ঘোষ, এম এ হামিদ, সত্যপাল (হংস সিনেমা হলের মালিক) প্রমুখ। বন্দরের সিরাজদ্দৌল্লা ক্লাব ১৯৫১ সালে হংস থিয়েটারে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের শাহজাহান নাটক প্রদর্শন করে। সেই নাটকে নারায়ণগঞ্জে সর্বপ্রথম নারী ভূমিকায় মহিলা শিল্পী অবতীর্ণ হয়। পূর্বে পুরুষরাই নারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। এই ক্লাবের উল্লেখযোগ্য নাট্যকর্মী হলেন, এস এম ফারুক, আব্দুল হাই, রবীন, আজাদ, জামান, খসরু, প্রমুখ।

১৯৫২ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয় কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন। প্রতিষ্ঠাতা কর্মীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সুধীর নিয়োগী, প্রকাশ চক্রবর্তী, বিমল নিয়োগী, সুধীর সাহা, আব্দুল আহাদ, কালীপদ সেন প্রমুখ। নাট্যকর্মই ছিল এই ক্লাবের মুখ্য কর্ম।

১৯৬১ সালে স্থাপিত হয় ‘কথাকলি’ নামে একটি নাট্য সংস্থা। প্রথম সভাপতি সুনীল রায় ও সম্পাদক জালালউদ্দিন রুমি। এই প্রতিষ্ঠানের মুজিবুর রহমান বাদল (পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি) ও সুনীল রায়ের লেখা নাটক ‘জংলীফুল’ বিশেষ সুনাম অর্জন করে। পরবর্তীতে জালালউদ্দিন রুমি ‘জংলীফুল’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিক থেকে পরবর্তী দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের নাট্যকর্মে এ কে এম মুজিব ও আজিজুর রহমান বিশেষ অবদান রাখেন। তাঁরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে বহু নাট্যানুষ্ঠানের আয়োজন করেন এবং নাটক সম্পর্কে উৎসাহের স্রোতটাকে গতিময় করে রাখেন।

পঞ্চাশের মাঝামাঝির দিকে ক্লাবভিত্তিক সংঘ নাট্যাদ্দীপনায় যে ভাটা পরেছিল তাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা হলেও স্হায়ীভাবে তা আর পুনরুজ্জীবিত হয়নি। নাট্যকর্মী ক্লাব অপেক্ষা একক বা দু-একজনের সম্মিলিত আয়োজনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী দশকের প্রথমার্ধের পর থেকেই আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সমগ্র নারায়ণগঞ্জে তখন কয়েকজন নাট্যকর্মী বিভিন্ন সময়ে নাট্যানুষ্ঠানের আয়োজন করে নাট্যকর্মের ক্ষীণ স্রোতটি প্রবাহিত রাখতে সহায়তা করেন।

মোহরচাঁন শীতলক্ষ্যা অঞ্চলে একটি নাট্যামোদী সম্প্রদায় সৃষ্টি করেন। স্বাধীনতার পর মোহরচাঁন শীতলক্ষ্যায় চিত্র প্রযোজক মহিউদ্দিন আহমেদ খোকা সাহেবের পৃষ্ঠপোষকতায় বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চায়ন করেন। এগুলোর মধ্যে ‘এক মুঠো অন্ন চাই’ ও ‘প্রত্যাবর্তন’ ছিল দর্শকপ্রিয় নাটক। এ সকল নাটকের উল্লেখযোগ্য অভিনেতা ছিলেন আব্বাসউদ্দিন বুলু, সালাউদ্দিন আহমেদ সান্টু (পরবর্তীতে চিত্র অভিনেতা), নুরউদ্দিন আহমেদ নুরু প্রমুখ। মোহরচাঁনের ১৯৭৪ সালে অকাল মৃত্যু হয়। তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ নাট্যকর্মী ছিলেন। ব্যক্তিগত দু:খদারিদ্র্যকে তুচ্ছ করে তিনি নাট্যকর্মে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি স্বয়ং ছিলেন অনেক নাটকের লেখক। মোহরচাঁন ‘হীরা’ নামে একটি ছবিও নির্মাণ করেছিলেন।

নারায়ণগঞ্জের অন্যান্য নাট্যকর্মীর মধ্যে খানপুর অঞ্চলে জয়নাল আবেদীন, মোহাম্মদ মোস্তফা, মিশনপাড়া অঞ্চলে মনিরুজ্জামান মিলু, সাইদ আহমেদ ও হানিফ কবির, আমলাপাড়া অঞ্চলে সৈয়দউদ্দিন নান্টু, চঞ্চল মাহমুদ (পরবর্তীতে চিত্র অভিনেতা), আমজাদ হোসেন, রমা ও কনা অভিনয় ও নাট্য সংগঠন করেন। তমিজউদ্দিন রিজভী (পরবর্তীতে চিত্র পরিচালক) বিশেষ নাট্যতৎপরতার পরিচয় দেন এবং নারায়ণগঞ্জের নাট্যকর্মে যথেষ্ট উদ্দীপনার সৃষ্টি করেন। আব্দুল লতিফ, বাহাউদ্দিন, ছামাদ ঢালী, কুতুবউদ্দিন, ফয়েজ আহাম্মদ, বাসুদেব, আশরাফ মাখন, বাসার প্রমুখ নাট্যকর্মী তমিজউদ্দিনের সঙ্গে সহযোগিতা করেন এবং তাঁদের সমবেত চেষ্টায় নারায়ণগঞ্জের ধীরগতির নাট্যস্রোতে চঞ্চচলতার সৃষ্টি হয়। যা টিকে ছিল আশির দশক পর্যন্ত।

নাট্যসংগঠনের জন্য মঞ্চ অত্যাবশ্যক। নাটক একটি সমবায়মূলক শিল্প, যার প্রাণকেন্দ্র হলো একটি মঞ্চ। নারায়ণগঞ্জে একটি বিত্তশালী শহর হওয়া সত্ত্বেও এখানে কোনো স্থায়ী মঞ্চ ছিল না। এই মঞ্চহীন, নিবেদিতপ্রাণ দীর্ঘায়ু নাট্যসংগঠনহীন শহরে তবুও দীর্ঘকাল ধরে নাট্যপ্রবাহ বহমান ছিল। যদিও পরবর্তীতে শহীদ জিয়া হল ও আলী আহাম্মদ পৌর মিলনায়তন নাট্য মঞ্চায়নের মঞ্চ অসুবিধা অনেকটা দূর করে।

‘নাট্যনিকেতন’ সংস্থায় এক সময় নারায়ণগঞ্জের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বহু নাট্যকর্মী জড়িত ছিলেন। স্বাধীনতার পর আধুনিক মঞ্চায়ন রীতি অনুসরণ করে দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে সংগঠনটি কাজ করেছে। ‘নাট্যনিকেতন’ এবং ‘নারায়ণগঞ্জ থিয়েটার’ গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

নাট্যনিকেতন ও নারায়ণগঞ্জ থিয়েটারের উদ্যোগে সে সময় অনেক দর্শকপ্রিয় নাটক মঞ্চস্থ হয়। তখন ছিল নারায়ণগঞ্জে নাটকের সোনালী সময়। সে সময় কবি জালালউদ্দিন নলুয়ার ‘অভাগা’, ‘অশ্রু’ ও ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত নাটক ‘বাংলা আমার বাংলা’ ছিল দর্শকপ্রিয় নাটক। গ্রুপ থিয়েটারের সফল নাটক ছিল ‘যেখানে অত্যাচার’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘সুবচন নির্বাসনে’ ইত্যাদি। থিয়েটারের উদ্যোগে ১৯৭৫ এর পর পৌর মিলনায়তনে তমিজউদ্দিন রিজভীর নির্দেশনায় বহুল প্রসংশিত নাটক ‘নবাব সিরাজদ্দৌল্লা’ মঞ্চ হয়। অভিনয় করেন চলচ্চিত্রাঙ্গণের আনোয়ার হোসেন, ফখরুল হাসান বৈরাগী, আনোয়ারা, মিনু রহমান। এখন আকাশ সংস্কৃতির কারণে নাটক বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর