rabbhaban

দূষণ ও দখলের মহোৎসবে ধুঁকছে বালু নদী


সিটি করেসপন্ডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৪৫ পিএম, ১৬ জুন ২০১৯, রবিবার
দূষণ ও দখলের মহোৎসবে ধুঁকছে বালু নদী

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার বালু নদী এখন দূষণ ও দখলের কবলে। উপজেলার চনপাড়া পূর্ণবাসন কেন্দ্র এলাকা থেকে শুরু হওয়া নদীটি এক শ্রেনীর প্রভাবশালীরা দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে নদীর প্রসস্থতা কমিয়ে ফেলছে। বিষাক্ত বর্জ্য ফেলে নদী দূষণ করছে।

শুধু তাই নয়, এ নদীর শাখা প্রশাখাগুলোতে পানি সঙ্কট, দখল, দূষণ ও নাব্যতা সঙ্কটে ভুগছে। দূষণের কারণে নদীর পানিতে পঁচা গন্ধে পরিবেশ আজ হুমকির মুখে। দূষণের ফলে জলজ পরিবেশের উপরও বিরুপ প্রভাব পড়ছে। এতে করে মৎস্য সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

দুদিন ব্যাপী কর্মসূচিতে ১৬ জুন রোববার বালু নদী পরিদর্শন করেছেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনসহ একটি প্রতিনিধিদল। পরিদর্শণকালে দেখা গেছে, ৫৪ স্থানে দখল ও ২৩ স্থানে নদী দূষণ করে যাচ্ছে প্রভাবশালী মহল।

নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান হাওলাদানের নেতৃত্বে পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন, ভূমি রেকর্ড ও জরীপ অধিদপ্তরের উপ-সচিব শাহাদাত হোসেন, ঢাকা জেলার এডিসি  (রেভিনিউ) আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশ্রাফ, পানি উন্নয়নবোর্ডের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল মতিন, রাজউকের অথরাইজড অফিসার মাকিদ এহসান, বিআইডব্লিউটিএর ট্রেসার আব্দুল হাই, কালীগঞ্জ উপজেলার ইউএনও শিবলি সাদিক, রূপগঞ্জের এসিল্যান্ড তরিকুল ইসলাম, তেজগাঁও সার্কেলের এসিল্যান্ড এবিএম কুদরত ই খুদাসহ রূপগঞ্জ প্রেসক্লাবের একটি প্রতিনিধি দল।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, পুবাইল মৌজার সরকারী মেডিকেল এ্যসিসটেন্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নদীর জমিতে ভবন নির্মাণ ও বালু নদীতে সরাসরি বর্জ্য নির্গত করছে। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম একাডেমীর বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে নদীর জমি দখল করে। মান্নান ব্রিকফিল্ড দখলে রেখেছে নদীর জমি।

এএনডি ট্রাউজার ফ্যাক্টরির বর্জ্য আবর্জনার স্তূপ ও ময়লার পাইপ সরাসরি নদীতে ফেলছে। টঙ্গী সার্কেলে বাবু গার্মেন্ট, আজমেরি গার্মেন্ট, নীলা ক্যামিকেল ফ্যাক্টরি, এলইডি স্টার ফ্যাক্টরির বর্জ্যও সরাসরি বালু নদীতে ফেলা হচ্ছে। কোন প্রকার ইটিভি প্লান ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠান দূষিত বর্জ্য নদীতে ফেলছে। রূপগঞ্জ ইউনিয়নের পাশের এলাকায় ক্রাউন সিমেন্ট ফ্যাক্টরির বর্জ্য ও ময়লার স্তূপ বালু নদীতে ফেলা হচ্ছে। বালু নদীর দুই পারের বসবাসরত স্থানীয় জনগণও বর্জ্য ও ময়লার স্তূপ সরাসরি নদীতে ফেলছে। এ ধরনের অভিযোগের অন্ত নেই।

নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, যে কোন মূল্যে নদী বাঁচাতে হবে। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। নদী না বাঁচলে দেশ বাঁচবেনা। যারা নদী দখল ও দূষণ করেছেন, তারা যে ব্যক্তি, যে গোষ্ঠি, যে রাজনৈতিক দল বা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন কোন ছাড় দেয়া হবেনা। আমরা সিএস রেকর্ড দেখে সীমানা নির্ধারণ করে নদী দখলমুক্ত কার্যক্রম শুরু করবো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে শীগ্রই দখল ও দূষণ মুক্ত করে নদীকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। তাই সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন তিনি।

নদী রক্ষা কমিশন সুত্রে জানা যায়, বালু নদীর উৎস মুখ শ্রীপুর উপজেলার মার্টা ইউনিয়নের প্রহলাদপুর মৌজায় যেখানে সৃতী ও পারুলী নদী মিলিত হয়েছে। এই মিলিত ধারা বালু নাম নিয়ে গাজীপুর ও ঢাকার মধ্যে দিয়ে রূপগঞ্জ হয়ে ডেমড়ার শীতলক্ষ্যা নদীতে মিলিত হয়েছে। পুবাইলে অপর গুরুত্বপূর্ণ উপনদী চেলাই ও টঙ্গীতে টঙ্গীরখালে মিলিত হয়েছে। বালু নদীর দৈর্ঘ্য ৬০ কিলোমিটার ও প্রশস্থ্য ১০০ মিটার। এর শুল্ক মৌসুমের প্রবাহ ৬০ ঘনমিটার ও বর্ষা মৌসুমে ৭৪৪ ঘনমিটার। এর গভীরতা রূপগঞ্জ ও ডেমড়া পয়েন্টে ৫.৮৫ মিটার থেকে ৯.৬৩ মিটার। এর অববাহিকা প্রায় ৭২২ বর্গকিলোমিটারের চেয়েও অধিক। এই নদীর গতিপথে দুইটি পানির লেভেল পরিমাপক ষ্টেশন একটি পুবাইল ও অন্যটি ডেমরায় এবং একটি প্রবাহ পরিমাপক ষ্টেশন আছে ডেমরায়। ৫৪ স্থানে দখল, ২৩ স্থানে দূষণ, ৩ স্থানে ডুবোচর, ৩স্থানে প্রায় ২৫০০ মিটার ভাঙ্গন ও ৩০টি ব্রীজ আছে। প্রায় ৪০টি খাল ও ছোট-বড় মিলিয়ে ৭টি বিলের নদীর সরাসরি সংযোগ রয়েছে।

লেখক, কলামিস্ট, গবেষক লায়ন মীর আব্দুল আলীম বলেন, এক সময় মানুষ নদীর পানি সংগ্রহ করে রান্নার কাজের ব্যবহার করতো। এমনকি নদীর পানি পান করতেন। আজ সেই নদীর পানি পঁচা দুর্গন্ধে বিষ হয়ে উঠেছে। এ পানি থেকে বিষাক্ত গ্যাস হয়ে মানুষ দিন দিন অসুস্থ্য হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন মিলকারখানায় ইটিপি’র ব্যবস্থা না করে নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলার কারণে দিন দিন নদী গুলো দূষণের কবলে পড়ছে। নদী রক্ষায় আগে আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে।

ঢাকা জেলার এডিসি (রেভিনিউ) আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা নির্দেশনা পেলে বালু নদীর দুই পাশে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করবো। বিশেষ করে ঢাকা জেলার পাশাপাশি গাজীপুর জেলা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে এ উচ্ছেদ অভিযান চলবে। বালু নদী রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। আগে থেকেই দখলদারদের নদী দখল মুক্ত করার জন্য বলা হলো। তা না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর যারা নদী দূষণ করছেন, তারাও নদী দূষণ থেকে বিরত থাকুন। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর