এসপির পাশে বসানো হলো জুয়ারীকে


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১১:৫০ পিএম, ০৫ অক্টোবর ২০১৯, শনিবার
এসপির পাশে বসানো হলো জুয়ারীকে ফতুল্লার একটি পূজামন্ডপে পুলিশ সুপারের পাশেই দেখা যায় তাপুকে (গোল চিহ্নিত) যাকে একদিন আগেই পুলিশ জুয়ারী হিসেবে গ্রেপ্তার করেছিল।

শুক্রবার ৪ অক্টোবর। এদিন সকাল থেকেই গণমাধ্যমগুলো বেশ কৌতুহলী ছিল। কারণ এর আগের রাতে ফতুল্লার পঞ্চবটি এলাকার একটি ক্লাব থেকে ৭জনকে আটকের খবর ছিল। কিন্তু শুক্রবার সকাল থেকেই জেলা পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। দুপুর গড়িয়ে বিকেলে যখন জেলা পুলিশ থেকে ৭ জনের নাম জানানো হয় সেখানে প্রথমেই ছিল তোফাজ্জল হোসেন তাপুর নাম। ডিবি থেকে আদালতে পাঠানো মামলার কপিতেও ছিল তার নাম। ওই নথিতে জুয়ার আসার থেকেই ৭জনকে গ্রেপ্তার করা উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে একদিনের ব্যবধানে সেই জুয়ার আসরে অভিযান চালানো পুলিশ বাহিনীর নারায়ণগঞ্জের চৌকশ কর্তাব্যক্তি সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশেই দেখা গেছে সেই তাপুকে। তাকে অনেকটা সম্মান দিয়েই পাশে বসান একটি পূজা কমিটির নেতারা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটা পরিকল্পিতভাবে পুলিশ সুপারের অর্জনকে ম্লান করার একটি প্রয়াস।

বৃহস্পতিবার রাতে যে এলাকা থেকে তাপুকে গ্রেপ্তার করা হয় ৫ অক্টোবর শনিবার রাতে পঞ্চবটি হরিহর পাড়া এলাকার শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দিরের শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে একটি পূজা মন্ডপ পরিদর্শনের সময়ে পুলিশ সুপারের পাশে তাপুর বসে থাকার এ ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট হওয়ার পর বেশ আলোচিত হয়ে উঠে। এসময় পুলিশ সুপারের সাথে আসা পুলিশের কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

তবে পুলিশ প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলছেন, এটা পুলিশ প্রশাসনের কোন নিজস্ব অনুষ্ঠান না। জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই সদর উপজেলার বিভিন্ন পূজামন্ডপ পরিদর্শন করতে বের হন। এর মধ্যে ফতুল্লার পঞ্চবটিতে কয়েকটি মন্ডপ তিনি পরিদর্শন করেন। কোন একটি মন্ডপে হয়তো আয়োজকেরা কোন ব্যক্তিকে অতিথির আসনে বসাতে পারে। সেটা তো আর পুলিশের দোষ না। পুলিশ তো সবাইকে চিনে না।

একটি সূত্র জানায়, পঞ্চবটির শীষমহলে একটি পূজা মন্ডপে যান পুলিশ সুপার। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাপু। পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ যে চেয়ারে বসা ছিলেন তার বাম পাশের চেয়ারে বসা ছিলেন স্থানীয় এনায়েতনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান। আর তার বামের চেয়ারেই বসা ছিলেন তাপু। তাঁর এ বসার দৃশ্যে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের কয়েকজন জানান, একদিন আগে এ আলোচিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন পুলিশ সুপারের আওতাধীন ডিবি একই এলাকার ইউনাইটেড ক্লাবে হানা দিয়ে তাপু সহ ৭জনকে আটক করে। অথচ একদিন পর সেই পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশেই তাপুকে অতিথি করে মূলত পুলিশ সুপারের অর্জনকে ম্লান করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এটা পুলিশ সুপারকে কলঙ্কিত করার হীন চেষ্টা মাত্র। পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ নিশ্চয়ই ব্যক্তিগতভাবে তোফাজ্জল হোসেন তাপুকে চিনেন না কিংবা তিনি জানতেন না যে, এই লোকই জুয়াড়ী হিসেবে গ্রেফতার হয়েছেন। যেখানে সরকার ক্যাসিনো আর জুয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে যেখানে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করেছে সেখানে এসপি হারুন জ্ঞাতস্বারে সেখানে উপস্থিত হবেন এটা আমরা বিশ্বাস করতে চাই না।

অপরদিকে এই ঘটনার পর পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ফতুল্লা থানার ওসি বা কর্তাদের তো বিষয়টি অবশ্যই জানার কথা, স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে ঐ ব্যক্তির ছবিসহ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে তাদের তো আমাদের ইনফর্ম করা উচিত ছিল। বিশেষ করে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি)’র মাঠকর্মীরা তো এখানে ছিল, তারাও তো আমাদের এব্যাপারে কিছু বললো না। বিষয়টি আমরা কঠোরভাবে তদন্ত করে দেখবো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জে যোগদানের পরেই জুয়ার ব্যাপারে কঠোর হন পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জে কয়েকটি জুয়ার আস্তানায় পুলিশ ও ডিবি হানা দেয়। সেই সঙ্গে ভূমিদস্যু, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধেও হারুন অর রশিদ কঠোর অবস্থানে নেন। কে কোন দল করেন সেদিকে কর্ণপাত না করে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই আখ্যায়িত করে অভিযান চালাতে থাকে।

সবশেষ সদর উপজেলার ফতুল্লায় দ্যা ইউনাইটেড অ্যাসোসিয়েশন (ইউনাইটেড ক্লাব হিসেবে পরিচিত) এ অভিযান চালিয়ে ৭ জুয়ারী গ্রেফতার হলেও আদালত থেকে মাত্র ২শ টাকা জরিমানায় মুক্তি পেয়েছেন।

শুক্রবার বিকেলে তাদেরকে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। এর আগে বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) রাতে অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আসামিদের কাছ থেকে ৩ বান্ডেল কার্ড, নগদ ২০ হাজার ৫শ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

বিকেলে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফতাবুজ্জামানের আদালতে শুনানী শেষে ২০০ টাকা জরিমানা অনাদায়ে সাজা প্রদান করেন। পরে প্রত্যেতে ২০০ টাকা জরিমানা দিয়ে মুক্তি পান।

জানা গেছে, পঞ্চবটির ধনাঢ্যদের ক্লাব হিসেবে পরিচিত ইউনাইটেড ক্লাব। প্রতিরাতেই এখানে বসে জুয়ার আসর। বিশেস করে প্রত্যেক বৃহস্পতিবার রাতে শুরু হয় আসরটি। চলে শুক্রবার। চাউর আছে বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া জুয়ার আসর পরদিন রাতও গড়ায়।

বৃহস্পতিবার রাতে ডিবি এখানে হানা দেয়। ওই সময়ে গ্রেফতার করা হয় ৭ জনকে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন ক্লাবের সভাপতি ফতুল্লার ধর্মগঞ্জ এলাকার মৃত আব্দুল মজিদ মিয়ার ছেলে তোফাজ্জল হোসেন তাপু (৫৫), মৃত এম এ কুদ্দুসের ছেলে ইকবাল হোসেন (৫৬), আবুল হাসেমের ছেলে কামাল হোসেন (৪৯), আজমেরীবাগ এলাকার মৃত আব্দুল হাইয়ের ছেলে শামসুজ্জামান (৪০), চাষাঢ়ার মার্ক টাওয়ার এলাকার মৃত আব্দুল জব্বারের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান (৫২), পঞ্চবটির মৃত ওবায়দুল হক ভূইয়ার ছেলে এবিএম শফিকুল ইসলাম (৫০), ঢাকার কেরানীগঞ্জের কাজিরগাঁও এলাকার মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে আফজাল হোসেন (৪০)।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক সাজ্জাদ রোমন জানান, অভিযান চালিয়ে জুয়া খেলার সময় তাদেরকে গ্রেফতারের পর মামলা দায়ের করে শুক্রবার বিকেলে আদালতে পাঠানো হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর