‘কেউ এক কেজি চাইল লইয়াও আমাগো কথা জিগাইলো না’ (ভিডিও)


হাফসা আক্তার, স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:২২ পিএম, ০৪ এপ্রিল ২০২০, শনিবার
‘কেউ এক কেজি চাইল লইয়াও আমাগো কথা জিগাইলো না’ (ভিডিও)

‘এতদিন বাসা-বাড়িতে কাজ কইরা দুই সন্তানকে খাওয়াইছি। অথচ এই করোনা ভাইরাসের লেইগা কাজ থেইকা বাদ দিয়া দিছে। ওগো বাপে তো অনেকদিন আগেই আমাগো ছাইড়া গেছে গা। আর এখন আমার রোজগারও গেল। কিন্তু কেউ এক কেজি চাইল লইয়াও আমাগো কথা জিগাইল না।’

বলছিলেন ২৫ বছর বয়সী নাহার। কিছুদিন আগে পর্যন্ত মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন। তবে করোনা ভাইরাসের জন্য তৈরি পরিস্থিতির কারণে তার কাজ চলে যায়। বর্তমানে কিভাবে তিনি তার সন্তানদের খাওয়াবেন সে বিষয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তিনি।

৪ এপ্রিল (শনিবার) ফতুল্লার পঞ্চবটি এলাকার দক্ষিন আজমতপুর হরিহরপাড়ায় সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকটি বাড়িতে কিছু নিম্ন মধ্যবিত্ত বা দিনমজুরের পরিবার বসবাস করে। করোনা ভাইরাসের কারণে তাদের প্রত্যেকেরই আয়ের পথ বন্ধ। ছোট ছোট ঘরের মধ্যে ৪ থেকে ৫ জন সদস্য নিয়ে বসবাস করেন তারা। মাস শেষে যার ভাড়া হিসেবে গুনতে হয় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। একেকটি বাড়িতে ৮ থেকে ১০ টি পরিবার বসবাস করে। প্রত্যেকে একই বাথরুম এবং রান্নাঘর ব্যবহার করেন।

তাদের অভিযোগ, ত্রাণ সামগ্রী শুধু প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে বিতরণ করা হচ্ছে বা পরিচিতদের দান করা হচ্ছে। পাড়া মহল্লার ভিতরে কারও খোজ নেয়া হচ্ছে না। তাছাড়া স্থানীয় না হওয়ায় তারা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার সহায়তা পান না। তারা না খেয়ে আছে অনেকদিন ধরে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় না হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন থেকে তারা কোনো সহায়তা পাননা। ভোটার আইডি কার্ডে নারায়ণগঞ্জের ঠিকানা না থাকায় যেখানেই গিয়েছেন সেখান থেকেই তাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির কথা আগে থেকে না জানায় কোনো প্রস্তুতিও গ্রহন করতে পারেননি তারা। কিন্তু এখন ঘরে কিছুই নেই। তাদের যেই স্বল্প আয়, তা দিয়ে সঞ্চয় করার মতো অবস্থা থাকে না।

এসময় একজন নারী প্রতিবেদকের কাছে ছুটে আসেন এবং ত্রাণের লিস্ট করা হচ্ছে কিনা জিজ্ঞেস করেন। তারপর তিনি জানান, অনেকদিন ধরে তারা খাদ্য সমস্যায় ভুগছে কিন্তু স্থানীয়ভাবে তাদের এখনো কোনো সহায়তা করা হয়নি।

শ্রমিক ওমর আলী প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি আগে রাজমিস্ত্রিদের সাথে কাজ করতাম, কিন্তু অনেকদিন ধরে কাজ বন্ধ। আমার ১৫ মাসের ছোট মেয়েটা অসুস্থ্য। এই অভাবের দিনে ওরে যে একটু ডাক্তার দেখাইয়া ওষুধ আনুম তার উপায়ও নাই।’

বিদ্যুৎ মিস্ত্রি মো. রাসেল নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘খাদ্য সামগ্রি তো দূরের কথা, একটা ১০ টাকা দামের মাস্ক নিয়াও কেউ এই এলাকায় আসে না। আমরা ৯ টা পরিবার এই বাড়িতে আছি, প্রত্যেকেই দিনমজুর এবং এখন বেকার। কারও ঘরেই এখন ঠিক মতো রান্না হয়না।’

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা বারিক এ বিষয়ে নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘প্রত্যেকটি ইউনিয়ন পরিষদে বলে দেয়া আছে যে যারা দিনমজুর তারা প্রত্যেকেই এই ত্রান পাবেন। সে কোন জেলার তা দেখা হবে না, বড় কথা তিনি এখন আমাদের এলাকায় আছেন। তার পরেও যদি কেউ আইডি কার্ড ছাড়া ত্রাণ পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিকে ত্রান দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে যোগ্য ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জ শিল্প নগরী হওয়ায় বিভিন্ন জেলার মানুষ নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় এ জেলায় আসেন। এবং এখানে থেকেই নিজ নিজ ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। সেই সূত্রে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় লোকের তুলনায় বাইরের জেলার লোকই বেশি রয়েছেন। তাদের মধ্যে সিংহভাগই দিনমজুর বা শ্রমিক।

স্বল্প আয়ের কারণে অর্থ সঞ্চয় করা হয়নি তাদের, আত্মসম্মানের ভয়ে কারও কাছে হাত পাততেও দু’বার ভাবেন তারা। অথচ আত্মসম্মান ভুলে যখন সরকারি ত্রানের আশায় স্থানীয় প্রশাসনের কাছে হাত পাতছেন, তখন স্থানীয় না হওয়ায় ত্রান মিলছে না তাদের। এখন দেখার বিষয় প্রশাসন এই মানুষগুলোকে কিভাবে সহায়তা করবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর