paradise

হারিয়ে যাচ্ছেন আকরাম ও কবরী


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৪৩ পিএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার
হারিয়ে যাচ্ছেন আকরাম ও কবরী

নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগের রাজনীতি থেকে কয়েকজন এমপি ও আওয়ামীলীগ নেতারা নাম হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের তালিকায় রয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি এস এম আকরাম ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি সারাহ বেগম কবরী। এসব নেতারা বেঁচে থেকেও নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে অনেকটা মৃত প্রায়।

নামেমাত্র এসব ব্যক্তির জীবিত থাকলে রাজনীতিক নেতা হিসেবে পরিচিত এদের কোন অস্তিত্বই নেই। রাজনীতিতে পথ প্রদর্শক হিসেবে এক সময়ের লড়াকু সৈনিকের ভূমিকায় থাকা এসব নেতারা নানা করাণে নিজেদের গুটিয়ে নেন। তবে দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, ‘বাধা বিপত্তি থাকবেই কিন্তু তাই বলে কি পথ পাড়ি না দিয়ে থেমে গেলে চলবে নাকি। তাছাড়া পথ প্রদর্শকরা যদি বাধা বিপত্তিকে ভয় করে সরে দাঁড়ায় তাহলে তরুণ নেতারা কি শিক্ষা পাবে।’

আওয়ামীলীগের এক সময়ের জনপ্রিয় মুখ এস এম আকরাম। তিনি ১৯৯৬ সালে নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসন থেকে আওয়ামীলীগের টিকেটে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। নব্বইর দশকে আওয়ামীলীগের শাসনামলে যেখানে জেলা জুড়ে সন্ত্রাসের রামরাজত্ব ছিল সেখানে এস এম আকরাম ধরে রেখেছিলেন নিজের ক্লীন ইমেজ। পরবর্তীতে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জেলা আওয়ামীলীগের আহবায়কের গুরুদায়িত্বও ছিল তার কাধে। এরপর সরকার বিরোধী আন্দোলনেও তার বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। তবে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোট সরকার গঠনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পেয়েও দলীয় নির্দেশে তাকে সরে দাঁড়াতে হয়। এরপর ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বর্তমান মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে নিয়ে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের নানা নাটকীয়তার কারণে তিনি রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন।

২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামীলীগ থেকে শামীম ওসমানকে সমর্থন দিলেও জেলা আওয়ামীলীগের আহবায়ক হিসেবে তার সমর্থন ছিল মেয়র নির্বাচিত হওয়া আইভীর প্রতি। ওই নির্বাচনের পরদিনই আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নীতি নির্ধারকদের প্রতি বিরাগভাজন হয়ে আওয়ামীলীগ থেকে সরে দাঁড়ান এস এম আকরাম। যোগ দেন মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যে।

এরপর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের আকস্মিক মৃত্যুর পরে ২০১৪ সালের ২৬ জুন অনুষ্ঠিতব্য উপ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে লড়েন এস এম আকরাম। যদিও ওই নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামীলীগের কোন প্রার্থী অংশ না নেয়ায় সেলিম ওসমান হয়ে পড়েছিলেন সর্বদলীয় প্রার্থী। কারণ ওই নির্বাচনে সেলিম ওসমানের পক্ষে কাজ করতে দেখা গিয়েছিল অনেক বিএনপি নেতাকে। আর যেসকল কেন্দ্রে জাতীয় পার্টি তথা আওয়ামীলীগের প্রার্থীও কখনো পাশ করতে পারেননি সেখানে সেলিম ওসমান জয়ী হয়েছিলেন। অর্থাৎ বিএনপির ভোটব্যাংক খ্যাত কেন্দ্রে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন সেলিম ওসমান। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিলেও প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন এসএম আকরাম। ওই নির্বাচনে এস এম আকরাম ৬৬ হাজার ১১৪ ভোট পেয়েছিলেন। অথচ ওই নির্বাচনে সেলিম ওসমান সব রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়েও পেয়েছিলেন ৮২ হাজার ৮৫৬ ভোট।

এর পরের আসন্ন জাতীয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চারদিকে যখন বিভিন্ন নেতাদের মনোনয়ন ইস্যুতে কথা উঠছিল তখন ক্লিন ইমেজধারী এই নেতার নাম উঠে এসেছে। আর গোয়েন্দা সংস্থার মনোনয়নের তালিকাতে এ নেতা রয়েছেন। এতে করে নির্বাচনী বছরে তার সমর্থকরা নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে তার পোস্টারিং করেছে। এ নিয়ে সারা শহরে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। তবে তিনি এ ব্যাপারে তেমন কোন ইতিবাচক সাড়া না দিয়ে উল্টো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকের অপেক্ষায় থাকবেন বলে জানিয়েছেন। পরে অবশ্য বলেছেন, নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি না হলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেননা। এর পর থেকে এই নেতারা আর তেমন কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছেনা।

এদিকে নারায়গঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির এমপি সেলিম ওসমান রয়েছেন মনোনয়ন প্রার্থী হিসেবে। আর মহাজোটের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় পার্টিকে বন্ধু দল হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, আমরা বন্ধু হারাতে চাইনা। বন্ধু দলকে নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাই। এতে করে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশী এমপি সেলিম ওসমানের মনোনয়নের সম্ভাবনা অনেক বেশি। তবে জাতীয় পার্টি মহাজোটে শেষ পর্যন্ত থাকবে কি না তা নিয়ে রয়েছে নানা সমীকরণ। আর সেই সমীকরণে হিসেবে ফলাফল এখনই বলা যাচ্ছেনা। আর দলের প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরে এই আসনে নৌকার কয়েক হালি মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও অনেকটা চুপশে গেছে। তাই দলের এতো নেতাদের ভিড়ে দীর্ঘদিন দলের বাইরে থাকা সাবেক এমপি আকরামের ডাক পড়াটা অনেকটা অনিশ্চত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে চলচ্চিত্র জগত থেকে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে পদার্পণের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে এমপি হওয়ার খ্যাতি অর্জন করে চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনে এ আসনে নির্বাচিত হয় আওয়ামীলীগের টিকেট পাওয়া এক সময়ের মিষ্টি মেয়ে খ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী। নির্বাচনের পর থেকেই কবরী সমর্থিত সিন্ডিকেট ঝুট সেক্টর দখলে রাখতে বিসিক ও ফতুল্লা শিল্পাঞ্চল মহড়া দেয়। কবরী নিজে গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ অফিসে এসে প্রকাশ্য ঝুট দাবি করায় হতভম্ব হয়ে পড়েন গার্মেন্ট মালিকরা। এমপি কবরীর আস্থাভাজনদের তালিকায় দলের নেতাকর্মীদের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ না তাকলেও রয়েছেন বহিরাগতরা। এ কারনে দলের নেতাকর্মীদের নিকট তিনি এখন খলনায়িকা হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সেক্টরের নিয়ন্ত্রনকর্তা ছিলেন এমপির পিএস শ্যামপুরের বাসিন্দা সেন্টু। ২০০৯ সালের ১৫ মার্চ ফতুল্লার ধর্মগঞ্জে একটি স্থানীয় দৈনিকের ফটো সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে এমপি কবরীর লোকজনের বিরুদ্ধে। বক্তাবলী ইউনিয়নে একটি সংঘর্ষের ঘটনার জের ধরে থানা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলীকে গ্রেফতারের নেপথ্যে এমপি কবরীর ইন্ধন থাকার অভিযোগ ওঠার পরপরই থানা আওয়ামীলীগের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে এমপি কবরীর। ২০১০ সালের ১৮ মার্চ ফতুল্ল¬ার স্বেচছাসেবকলীগ নেতা শুট্যার সোহেলকে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে এমপি কবরী সমর্থিত ক্যাডাররা। সে ঘটনায় ১০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেছে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ।

বর্তমানে এমপি কবরীর সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক নেই বললেই চলে। বিভিন্ন সভা সমাবেশে ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা এমপি কবরীর বিষোধাগার করেছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তৃনমূল নেতাদের মধ্যকার বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের কেউই এমপি কবরীর নাম প্রস্তাব করেননি বলে জানা গেছে।

চলচ্চিত্র জগতে সুনামের বন্যায় সারা দেশবাসীকে ভাসালেও নারায়ণঞ্জে রাজনীতিতে পদার্পণ করে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। এতে করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন এই নেত্রী। সম্প্রতি এই নেত্রী নারায়ণগঞ্জের কোন আসন থেকে রাজনীতি করার ব্যাপারে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। আর রাজধানীর কোন একটি আসন থেকে মনোনয়নের টিকিট চাইবেন বলে জানিয়েছেন। যদিও রাজধানীর কোন আসন থেকে এই সাবেক এমপি কবরী মনোনয়নের টিকিট পেয়েও যায় তিনি নারায়ণঞ্জের রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাবেন।

সম্প্রতি এই নেত্রী তার নিরাপত্তার জন্য অ¯্ররে লাইসেন্স সংক্রান্ত কাজে ফতুল্লা থানায় এসেছিলেন। আর তাতে অনেকের মনে নানা প্রশ্ন জাগলেও অবশেষে এ জেলার রাজনীতিতে তার নাম থাকছেনা সেটা নিশ্চিত হয়েছে। এদিকে সম্প্রতি তার নির্বাচনী আসন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এমপি শামীম ওসমানের মনোনয়নের চূড়ান্ত তালিকার তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এতে করে এই আসনে তার নির্বাচনের শেষ আশাটুকুও সমাপ্ত হয়ে গেছে। তাই নারায়ণগঞ্জে রাজনীতিতে থেকে এই নেত্রীও হারিয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনীতিতে নানা উত্থান পতন থাকে। তবে বাধা বিপত্তি পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া ও টিকে থাকাটা জরুরী। আর সেই জরুরী কাজটি করতে না পারলে অস্বিস্ত টিকিয়ে রাখা ভীষণ দায় হয়ে পড়ে। একারণে রাজনীতিকে পদ কিংবা চেয়ার হাসিলের চেয়েও অস্বিস্ত টিকিয়ে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি অনেক নেতা করতে পারেনি বলে ঝরে পড়ছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
-->
newsnarayanganj24_address
রাজনীতি এর সর্বশেষ খবর
আজকের সবখবর