rabbhaban

৩ বছরে হেফাজতের ৪ নেতা কোটিপতি : তদন্তে কেন্দ্রীয় নেতারা


সিটি করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০২:৪২ পিএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার
৩ বছরে হেফাজতের ৪ নেতা কোটিপতি : তদন্তে কেন্দ্রীয় নেতারা

এক সময়ে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মুসলমান হেফাজতে ইসলামের প্রতি ছিলেন মারাত্মক আসক্ত। হেফাজতের কোন বয়ান, আহবান আর বক্তব্য ইসলামের মূল ভিত্তির উপর থেকেই মনে করতেন। সেই টানে ২০১৩ সালের মে মাসে নারায়ণগঞ্জ থেকে লাখো মানুষ পায়ে হেঁটে রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। শহরের ডিআইটি এলাকাতে স্মরণকালের বৃহত্তম সমাবেশ করে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছিল। লাখ লাখ টাকা মুসলমানেরা সপে দিয়েছিল হেফাজতের দান বাক্সে। দোর্দান্ড প্রতাপ নিয়ে চলা সেই হেফাজতে ইসলাম এখন মূল্যহীন। এক সময়ে নারায়ণগঞ্জে হেফাজতে ইসলামের চরম ভোট ব্যাংক থাকলেও এখন সেটা তলাবিহীন ঝুড়ির মত মূল্যহীন। জৌলুস হারিয়েছে হেফাজত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নারায়ণগঞ্জে এক সময়ের জনপ্রিয় ইসলামিক দল হেফাজতে ইসলামের প্রতি জনসমর্থন দিন দিন কমে গিয়ে আস্থাহীনতা দেখা যাচ্ছে। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ আর দলের নেতাদের সঙ্গে  প্রকাশ্যে আতাঁত করে তাদের সুরে সুর মিলিয়ে চলা হেফাজতের প্রতি জনগণের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের পক্ষে সরাসরি কাজ করার ফলে তাদের প্রতি মানুষের আস্থা দিন দিন কমে যাচ্ছে। যেকারণে এই দলটি জনগণের কাছে সুবিধাবাদী দল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। তাই এই দলের নেতাকর্মীরা যদি আসন্ন নির্বাচনের অংশগ্রহণ করে তাহলে ভরাডুবির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীতে হেফাজতে ইসলামের শো ডাউনের পরদিন ৬ মে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের শিমরাইলে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে হেফাজতে ইসলাম, স্থানীয় লোকজন ও হেফাজত লেবাসে থাকা জামায়াত শিবিরের ক্যাডারদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে টানা সাড়ে ৫ঘণ্টার ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত সেদিন ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তবে এর আগেই নারায়ণগঞ্জে নানা কারণে বেশ আলোচিত ছিল হেফাজতে ইসলাম।

জানা গেছে, ২০১৩ সালে নারায়ণগঞ্জে সমাবেশ, ১৩ দফা দাবীতে মহাসমাবেশ সহ, চাষাঢ়ায় রাজীব চত্বর ভাঙচুর সহ আরো কিছু কাজ করে তখন আলোচিত হয়ে উঠে হেফাজতে ইসলাম। কিন্তু গত ৫ বছরে ইসলামী আদর্শের এক সংগঠনটি নানাভাবে বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।

ইসলামিক সংগঠন হিসেবে হেফাজতে ইসলাম প্রথম দিকে সাধারণ জনগণের জনপ্রিয়তা কুড়িয়ে বেশ আলোচনায় উঠে আসে। আর তাদের ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরের আলোচিত আন্দোলনে সেই জনপ্রিয়তার নজির দেখা গেছে। সেখানে সাধারণ মানুষের ঢল নেমে জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই দলটি ক্ষমতাসীন রাজনীতিক দলের সাথে আতাঁত করে ক্ষমতা হাসিনের লোস লালসার ফলে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে দলটি। এমনকি নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামের সাথে গোপনে আঁতাত করে তাদের দলকে আরো শক্তিশালী করার নানা প্রচেষ্টাও দেখা গেছে। এতে করে এই দলটি দিন দিন তাদের অর্জিত জনপ্রিয়তার হারাচ্ছে।
গত বছরের ২৫ মে জমিয়তে উলামা ইসলাম যে কমিটির নেতৃত্বে আবার হেফাজতে ইসলামের নেতারাও তাদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মাঈনউদ্দিন আহমদ যিনি সম্প্রতি নাশকতা মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করেছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জামাতে ইসলামের নেতাকর্মীদের তাদের চারপাশে বিভিন্ন সময় দেখা গেছে। এতে করে এই দলটিকে নিয়ে নানা সমলোচনার ঝড় উঠে।

সূত্র বলছে, ‘ক্ষমতা হাসিলের লোভ-লালসায় এই দলটি একের পর এক ইসলামিক দলগুলোকে একত্রিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর সেই চেষ্টায় নিষিদ্ধ জামাতে ইসলামও বাদ পড়েনি। তাই জামাতে ইসলাম দলটি প্রকাশ্যে আসতে না পারায় হেফাজতের মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে আসতে পারছেন। আর বিভিন্ন স্বার্থের জন্য হেফাজতে ইসলাম তাদেরকে সুযোগ করে দিচ্ছে। তবে তাতেও ক্ষমতা হাসিলের ক্ষিদে যখন অপূর্ণ থেকে যায় তখন রাজনীতিক দলগুলো সাথে সখ্যতা বাড়াতে শুরু করে। কেননা ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপল চত্বরে জনসমুদ্র তৈরি করেও সরকারকে টলাতে পারনি। সেই ঘটনা থেকে ক্ষমতা হাসিলের মরণ নেশা পেয়ে বসে এই দলটিকে। তাই ক্ষমতার পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্ষমতাসীনদের সাথে সরাসরি আতাঁত করে বসে এই দলটি। তাছাড়া গত কয়েক বছরে নারায়ণগঞ্জ হেফাজতে ইসলামের ৩ থেকে ৪জন নেতা বনে গেছেন অঢেল টাকার মালিক। কিনেছেন ফ্লাট আর গাড়ি। এসব নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটিও বিষয়টি নজরে এনেছেন। কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে নারায়ণগঞ্জের ৪জন নেতার ৩ বছরের আমূল পরিবর্তনের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনের পরের শূরা কমিটিতে এ নিয়ে আলোচনা হতে যাচ্ছে।

বিগত কয়েক বছর ধরে নারায়ণগঞ্জ জেলার হেফাজতে ইসলামের নেতাদের সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা যাচ্ছে। আর ওসমান পরিবারের সদস্যদের সুরে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন এই দলের নেতারা। আর তাদের নির্দেশে বিভিন্ন কাজও করছেন অনায়াসে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় বিতর্কিত হয়েছেন। আর সেই ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে হেফাজতে ইসলাম তাকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানের সাথেও ওয়াজ মাহফিল সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হেফাজতের এসব নেতাদের দেখা যাচ্ছে। আর সেসব নেতারা ওয়াজে এমপি শামীম ওসমানের সুরে তাল মিলিয়ে কথা বলছেন। আর এমপি শামীম ওসমানের মৌন সমর্থন পেয়ে মহানগর হেফাজতের সমন্বয়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছিল। পরে অবশ্য সেই মামলা বেশি দূর এগোতে পারেনি।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে সম্প্রতি মহানগর হেফাজতে ইসলামের সমন্বয়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান নির্বাচন করবেন বলে এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা দেয়। তবে সেই তার নির্বাচনী তোড়জোড় বেশি দিনে টিকেনি। অবশেষে অদৃশ্য মহলের নির্দেশে তিনি চুপশে যান।
এ ব্যাপারে একটি নির্দিষ্ট সূত্র বলছে, ‘এমপি শামীম ওসমান এই আসনে নির্বাচনের মনোনয়ন প্রত্যাশা করে আগে থেকেই কাজ করে যাচ্ছেন। এরুপ সময়ে এসময় ঘোষণায় প্রেক্ষিতে তার জন্য নির্বাচনী পথ কঠিন হয়ে পড়তে যাচ্ছিল। তাই স্বার্থের বিনিময়ে হেফাজতের এই নেতা চুপসে যায়।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘অরাজনৈতিক ক্লিন ইমেজধারী ইসলামিক দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়া হেফাজতে ইসলাম দলটি নানা কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের সাথে বিগত দিনে বৈরিতার দৃশ্যপট তৈরি হলেও সেই দলটির সাথে হেফাজতের সরাসরি সখ্যতার বিষয়টি জনগণের চোখে আঙুল দিয়ে তাদের স্বার্থ হাসিলের বিষয়টি স্পষ্ট করছে। আর তাতে হেফাজতের জনপ্রিয়তা ধুলোয় মিশে গিয়ে উল্টো জনগণের কাছে সমালোচিত হচ্ছেন। আর তাতে করে এই দলটি আসন্ন নির্বাচনে কোন কারণে অংশগ্রহণ করলে ডরাডুবির চিত্র দেখা যাবে। কারণ ধর্মীয় আনুভূতি সম্পন্ন সাধারণ মানুষ যেমন খুব সহজে কাউকে বিশ্বাস করে ফেলে ঠিক তেমনি উল্টো চিত্র দেখে অবিশ্বাসও তাদের মাঝে তৈরি হয়েছে যা তিক্ততার মধ্য দিয়ে নেতীবাচক প্রভাব ফেলবে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘এক সময়ের হেফাজতে ইসলাম দলটি সরকারের কঠোর সমালোচনা করলেও এখন তারা উল্টো তাদের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলছেন। এতে করে এক অঙ্গে এতো রুপ জনসাধারণের কাছে বিতর্কিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই এই দলটি ক্ষমতা হাসিল করার লক্ষ্যে জনসমর্থন হারাচ্ছে। এতে করে ক্ষমতাসীন দলটি কোন করণে ক্ষমতাচূত হলে হেফাজতে ইসলাম দলটি বেকায়দায় পড়ে যাবে। আর তখন ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকবেনা।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর