rabbhaban

প্রয়োজন ফুরিয়ে কাঁদে না আওয়ামী লীগ


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১২:২২ এএম, ২৯ অক্টোবর ২০১৮, সোমবার
প্রয়োজন ফুরিয়ে কাঁদে না আওয়ামী লীগ

‘১৯৯৬ হতে ২০০১। তখন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। নানা ইস্যুতে তখন নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে চলতো সভা সমাবেশ। তবে সবগুলো সমাবেশেই ওই সময়কার প্রভাবশালী শামীম ওসমানকে কিছু একটার জন্য বেশ অপেক্ষামান দেখা যেত। মঞ্চে উঠে হাতে থাকা মুঠোফোনে ব্যস্ততার পাশাপাশি বার বার প্রবেশদ্বারের দিকেই থাকতো তীক্ষ্ম দৃষ্টি। কারণ তার ডাকা সেই সমাবেশে কয়েকজন নেতা বিশাল বহর নিয়ে যোগ দিতেন। তাদের মিছিল দেখে উচ্ছ্বাসিত শামীম ওসমান তখনই মাথা নেড়ে জানাতো ‘এবার সভা শুরু করা যেতে পারে।’

ওই সময়ে এসব নেতাদের দোর্দান্ড দাপট ছিল। ছিল প্রভাবশালীদের তালিকাতেও। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে তাদের অনেককে বরণ করতে হয় নির্মম হত্যার। কেউ বা চলে গেছেন পরপারে। কেউ বা আছেন নিরব। কিন্তু তাদের মৃত্যুবার্ষিকী বা প্রয়াণ দিবসে স্মরণ করা হয় না ঠিকমত। পারিবারিকভাবে বড় উদ্যোগ নিলেই স্মরণ করা হয় তাদেরকে। নতুবা কেউ তাদের মনে রাখে না ঠিকমত। অথচ এক সময়ে আওয়ামী লীগ তাদের ব্যবহার করেছে স্ব প্রয়োজনে। নিজেদের তাগিদে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৯৯৬ হতে ২০০১ সাল পর্যন্ত মাঠ কাপানো সেইসব আওয়ামী লীগ নেতাদের মাত্র দেড়যুগেই ভুলে গেছে দলও। আওয়ামী লীগ কিংবা সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরাও তাদের আর স্মরণ করছে না। অথচ এক সময়ে দলের জন্যই কাজ করেছেন তারা। পালন করেছেন নেতার নির্দেশ। কদাচিৎ ললাটে এটেছে কিছুটা কংলকের তিলকও।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানের অনুগামীদের মধ্যে এক সময়ে বেশ আলোচিত ছিলেন গোলাম সারোয়ার, নুরুল আমিন মাকসুদ, মাহতাবউদ্দিন লাল, নজরুল ইসলাম সুইট, এস এম সেলিম, এস এম সায়েম মিঠু সহ অনেকে।

৩০ অক্টোবর গোলাম সারোয়ারের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৫ সালেল ৩০ অক্টোব মৃত্যুর আগের ২০ দিন ধরেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন গোলাম সারোয়ার। ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন সারোয়ার। নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমী স্কুল থেকে ইংরেজীতে রেকর্ড নাম্বার পেয়ে তিনি এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে তিনি এইচএসসি পাশ করেন। পরে তিনি তোলারাম কলেজ থেকে ¯œাতক পাশ করেন। তোলারাম কলেজে পড়ার সময় থেকে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন।

জানা গেছে, ১৯৯৬ হতে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা সময়ে আলোচিত ছিলেন গোলাম সরোয়ার ও নুরুল আমিন মাকসুদ। এ দুইজনের মধ্যে গোলাম সারোয়ারকে ওই সময়ের ও বর্তমানের এমপি শামীম ওসমানের ডান হাত আর নুরুল আমিন মাকসুদকে বাম হাত হিসেবেই সবাই জানতো। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর গোলাম সারোয়ার চলে যান ভারতে। আর মাকসুদ ভারত হয়ে যান সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের পর গোলাম সারোয়ার চলে আসেন ঢাকাতে। আসেন মাকসুদও। তবে বেশীদিন টিকতে পারেনি মাকসুদ। ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল সকালে ঢাকার গাজীপুরের পূবাইল এলাকা থেকে মাকসুদের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু তার মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠান হয় একেবারেই সাদামাটা।

তবে এ ক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম আছে গোলাম সারোয়ারের ক্ষেত্রে। তাঁর দুই ভাই মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, অপর ভাই শহর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু আর ভাগ্নে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জুয়েল হোসেনের কারণেই স্মরণ করা হয় সারোয়ারকে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নারায়ণগঞ্জে আলোচিত জুটিদের মধ্যে একটি মাহতাবউদ্দিন লাল ও নিয়াজুল। ২০১২ সালের ৮ জুন মাহতাবউদ্দিন লাল মারা যান। ঢাকার ল্যাব এইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। লাল নারায়ণগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিগত কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে গিয়েছিলেন তিনি। ২০০৭ সালের ভারতে পালিয়ে থাকার সময়ে ওই বছরের ১ মে তার বিরুদ্ধে লাল নোটিশ (রেড ওয়ারেন্ট) জারি করেছিল ইন্টারপোল। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে লাল দেশে চলে আসেন। কিন্তু জনসম্মুখে আসেনি। চেষ্টা করেছিল অতীত ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করে ভালো পথে আসার। সে পথে অনেকটা এগিয়েও গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার সে আশা পূরণের আগেই তাকে চলে যেতে হয়েছে না ফেরার দেশে। অথচ তার মৃত্যুবার্ষিকীর খবর রাখে না কেউ। ২০১০ সালের মার্চ মাসে সে ওয়ারেন্ট প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

নজরুল ইসলাম সুইট মারা গেছে কথিত ক্রসফায়ারে। ২০০৪ সালের ২৯ নভেম্বর দিবাগত রাতে নজরুল ইসলাম সুইটকে কারাগার থেকে বের করে ফতুল্লার পাগলা শাহী মসজিদ এলাকায় অস্ত্র উদ্ধারে গেলে র‌্যাবের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের কথিথ বন্দুক যুদ্ধে সুইট মারা যায়। মৃত্যুবার্ষিকীতে আয়োজন হয় না কিছুই ২০০৫ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন ৯ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ক্রসফায়ারে নিহত হন মাসদাইরের এস এম সেলিম ওরফে টাওয়ার সেলিম। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টর জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শামীম ওসমান প্রায়শই মাসদাইর এলাকাতে যেত। কিন্তু গত ৯ বছরে সেটা অনেক কমে এসেছে। সেখানকার লোকজনদের মতে, সেলিম না থাকার কারণেই হয়তো শামীম ওসমানের মাসদাইর গমন কমে গেছে। কারণ শামীম ওসমান এর আগেও কয়েকবার সমাবেশে বলেছেন, ‘আমি অনেক ভাই সৃষ্টি করেছি। কিন্তু অনেকেই এখন আর নেই। নেই আমার সারোয়ার, মাকসুদ, লাল, সুইট। এখনো তাদের জন্য আমার হৃদয় কাঁদে।’

এস এম সেলিম। পশ্চিম মাসদাইরের বাসিন্দা। ভাই-বোনদের মধ্যে সবার ছোট। আওয়ামীলীগের ঝান্ডা ধরেছিলেন কলেজ জীবন থেকে। ৯৬ সালে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানের খুব আস্থাভাজন কর্মী ছিল। মিটিংয়ে মিছিলে, সভা-সমাবেশে ফতুল্লা তথা এনায়েতনগর ও কাশীপুর এলাকার লোক সমাগমে তার কোন বিকল্প ছিল না।

গত ৯ সেপ্টেম্বর ছিল সেলিমের মৃত্যুবার্ষিকী। কিন্তু পারিবারিকভাবে ছোট পরিসরেই ছিল মিলাদ। কার্যত কোন বড় কিছুই ছিল না।

ক্রসফায়ারের ভয়ে ঢাকায় আগে থেকেই আত্মগোপনে ছিল সেলিম। সেই ঢাকা থেকে আটক করে আনলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ভাষ্যমতে সেলিমের সহযোগীদের সাথে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয় সেলিম। তবে পরিবারের অভিযোগ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্র করে তাকে ধরে এনে ব্যাপক নির্যাতন করে তাকে গুলি করে মারা হয়েছে। মৃত্যুর পর তার শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্ন ছিল বলেও জানায় পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু বিচার হয়নি এ ঘটনার।

এর আগে এক সভায় এমপি শামীম ওসমান বলেন, ‘তখন বিএনপি ক্ষমতায় আমরা বাসায় বসে ছিলাম। তখন সদর থানার ওসির চাকরি চলে যায় যায় অবস্থা। সে এসে আমাদের বলে কাউকে না কাউকে গ্রেপ্তার করতে হবে। তা নাহলে চাকরি চলে যাবে। তখন আমি বললাম কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। চাকরি গেলে চলে যাক। এরই মধ্যে একজন বলে উঠলো না ভাই ওসি ভালো মানুষ। আমরা একজন চলে যাই। এর মধ্যে সারোয়ার, মাকসুদ, লাল, পাপ্পু সহ কয়েকজন বলতে লাগলো তারা যাবে। এ নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেলে। পরে শেষে লটারী হলো তার মধ্যে মাকসুদের নাম উঠলো। মাকসুদ পুলিশের গাড়িতে গিয়ে বসে পড়লো।’

কিছুটা ভারাক্রান্ত কণ্ঠে শামীম ওসমান বলেন, ‘লাল, সুইট, সারোয়ার, মাকসুদ সবাই চলে গেছে। আমিও যে কখন চলে যাই ঠিক নাই। আমি তাই সবার জন্য দোয়া চাই। সবার আগে নিজের জন্য ক্ষমা চাই। প্রতিদিনই ভাবি আমার শেষ দিন। ২০০১ এর আগে এটা ভাবতাম না। আল্লাহর কাছে কাঁদতে হবে। বাবা মা স্বজনদের জন্য কাঁদতে হবে। যে চলে গেছে তার সন্তানরাই বুঝে।’

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর