rabbhaban

নির্বাচন থেকে সরে আসছেন ধানের শীষের কাশেমী


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:০৩ পিএম, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, শুক্রবার
নির্বাচন থেকে সরে আসছেন ধানের শীষের কাশেমী

এবারের নির্বাচনে আলোচিত শব্দ অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি। তবে এই শব্দ যারাই ব্যবহার করেছেন তারাই আর সারা-শব্দ করেননি। তারা রাজনীতি থেকে বিদায় না হলেও নির্বাচন থেকে বিদায় নিয়েছেন। তবে নির্বাচনের শেষ সময়ে এই নাটকে জড়িয়েছেন একজন প্রার্থী। যার জন্য অনেক রাজনৈতিক নেতারা নির্বাসনে গিয়েছেন এখন অসুস্থ্যতার জন্য সেই নেতা নিজেই নির্বাসনে যাওয়ার পথ খুলেছেন।

মনির হোসেন কাশেমী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন যিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী একেএম শামীম ওসমানের বিপরীতে প্রার্থী হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ২৩ দলীয় ঐক্যজোটের শরিক জমিয়তে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও হেফাজতের নেতা হিসেবে পরিচিত।

তার অসুস্থতার খবরে জেলা পুলিশ সুপারসহ অনেকেই দেখতে গিয়েছেন। সমবেদনা জানিয়েছেন কাশেমীকে। প্রার্থীর অসুস্থতায় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে নির্বাচন থেকে সরে আসছে ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মীরা। দেয়া হচ্ছে না কোন কেন্দ্রে পুলিং এজেন্ট।

এরই মধ্যে ২৮ ডিসেম্বর শুক্রবার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন সোনারগাঁয়ের স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আবদুল্লাহ আল কায়সার।

ক্ষুব্ধ নেতারা কাশেমীর আচরণে দলের হাই কমান্ডকে দায়ী করছেন। তাদের মতে কাশেমী বিএনপির হাই কমান্ডকে চরম শিক্ষা দিয়েছেন। কাশেমীর এই অসুস্থতার নাটককে বিএনপির জন্য চপেটাঘাত বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। তারা এমন কাশেমীর মত প্রার্থী আর কোনদিন যেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দেয়া না হয়ে তার জন্য উদাহরণ হিসেবে রেখেদিবে।

বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করেন, কাশেমী বিএনপির প্রতীককে অবমূল্যায়ন করেছে। ধানের শীষ প্রতীকের উপর কালিমা লেপন করেছে। এটা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। কাশেমী মূলত আওয়ামী লীগের বি টিম হিসেবে কাজ করেছে। তাই তিনি এমন অসুস্থতার নাটক সাজিয়েছে। নির্বাচনের আগে শুনতাম কাশেমী নৌকার ডামি প্রার্থী। কাশেমীকে প্রার্থী হওয়ার পেছনে প্রচুর টাকা দিয়েছেন নৌকার প্রার্থী। এখন সবই দিবালোকের মত সত্য প্রমাণিত হয়েছে। যা রটেছে তার সবটুকুই ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন তারা।

এই আসনে বিএনপির নেতা শাহাআলম, সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন এবং জেলা সেক্রেটারী অধ্যাপক মামুন মাহমুদ মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তাদের মধ্যে বিএনপি দুই জনকে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন দেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়। বাদ পরেন দীর্ঘ দিনে মাঠে অনুপস্থিত থাকা সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন। এর মধ্যে চূড়ান্তভাবে শাহআলমকে মনোনয়ন দিতে গিয়ে বাধে বিপত্তি। আর সেই বিপত্তিতে জোর প্রচেষ্টা চালায় জোটের শরিক দল জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম। বিভিন্ন ভাবে লবিং আর গ্রুপিং করে শেষ পর্যন্ত দলের অন্যতম নেতা শাহআলমকে বাদ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক ছিনিয়ে নেয় মনির হোসাইন কাসেমী।

প্রতীক যখন অর্জন হয়েছে তখন থেকেই কাসেমী বিএনপির আর কাউকেই চিনছেন না। এমনকী প্রতীক বরাদ্দের সময় কোন বিএনপির নেতাকে দেখা যায়নি কাসেমীর সঙ্গে। এ সময় সাংবাদিকদের জবাব দিতে গিয়ে কাসেমী বলেন, বিএনপির সকলের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের মাঠে নামবে।

তখন থেকেই বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। যারা কাসেমীর সঙ্গে নির্বাচনে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিয়েছিলন তারাও দূরে সরতে থাকেন। এতে ড্যামকেয়ার ধানের শীষ প্রার্থী কাসেমীর। দিন যত যাচ্ছে বিএনপির নেতারা কাসেমী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আর এতেই যেন কাসেমীর এজেন্ডা পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হতে চলে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, কাসেমী সম্পূর্ণ রূপে একজন ভন্ড। তিনি প্রতীক পাওয়ার পরে গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমি রক্তে মাংসে সবকিছুতে বিএনপির। আমি আলেম হিসেবে ইসলামী একটি সংগঠনের রাজনীতি করি। কিন্তু আমিও বিএনপির।

মনির হোসাইন কাসেমী সাংবাদিকদের বলেন, এখানে বিএনপির অনেক ভাল ভাল প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু জোটের স্বার্থে দেশের স্বার্থে সকলে গণতন্ত্র রক্ষায় কাজ করব এবং দেশে গণতন্ত্রের চর্চা হতে হবে।

কাশেমী ধানের শীষ পাওয়ার পর থেকে বিএনপি মধ্যে পিনপতন নিরবতা শুরু হয়। বঞ্চিত প্রার্থীসহ নেতাকর্মীরা রাগে, অভিমানে কথা বলছেন না। রাজনীতি থেকে বিদায় নেয়ার চিন্তা করছেন কেউ কেউ। আর প্রার্থীরা কেউ বিদেশ চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আবার কেউ পছন্দের প্রার্থীর নির্বাচনী কাজে আত্মনিয়োগ করছেন। তবে কেউই হেফাজতের নেতা কাশেমীকে সহ্য করতে পারছেন না।

এতে কেউ কেউ কাশেমীর অহংকারকে দায়ী করলেও বিএনপির নেতারা দলের ত্যাগকে বড় করে দেখছেন। তাদের কথা বিএনপি জোটের স্বার্থে আসনটি হারিয়েছে। এই আসনে আওয়ামী লীগের আলোচিত প্রার্থী একেএম শামীম ওসমান নৌকা প্রতীকে নির্বাচনের প্রার্থী হয়েছেন। এ আসনে তার সমকক্ষ এমনিতেই কোন প্রার্থী নেই। তার উপর একজন অপরিচিত এবং অযোগ্য প্রার্থী দিয়ে বিরোধীদেরকে আসনটি দিয়ে দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের সমীকরনে আসনটি হারাবে বিএনপি জোট। এতে কেনো ভাবেই সম্পৃক্ত হতে চাচ্ছে না দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

এমন খবরের সত্যতা ফুটে উঠেছে মার্কা বিতরণ অনুষ্ঠানে। ধানের শীষ মার্কা নিয়ে যখন তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছেন তখন তার আশপাশে তেমন কোন বিএনপির নেতাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ছিল না ২০ দলের কোন নেতা। সঙ্গে ছিল হেফাজত এবং জমিয়তের কয়েক জন নেতা।

প্রচারণার শুরুতে কাশেমী হতবিহবল হয়ে ছুটে ছিলেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের বাসায় বাসায়। অনেকেই বাসায় না থাকায় তিনি ফিরে আসছেন। কেউ কেউ বাসায় থেকেও নাই বলে বিদায় করে দিয়েছেন। কারো সঙ্গেই দেখা হচ্ছে না তার। একই অবস্থা ২০ দলের অন্যান্য শরিকদের। তাদরে বাসায় গিয়ে দু-একজনকে পেলেও তারা তাকে মেনে নিতে পারছে না। মাঠে নামার কথাতো অনেক দূর।

ক্ষুব্ধদের দাবি শামীম ওসমানের মোকাবেলা করার সক্ষমতা কাশেমীর মত প্রার্থীর নাই। এই প্রার্থী নিয়ে মাঠে নামলে নিজেদেরই অযোগ্য মনে হবে। কিসের সঙ্গ কী প্রার্থী। এর চেয়ে মান-ইজ্জত নিয়ে ঘরে বসে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। রাগ আর অভিমান নিজেরাই নিজেদের মধ্যে লুকিয়ে রাখছি।

শেষ পর্যন্ত মনির হোসাইন কাসেমী কোনভাবেই বিএনপি বা তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীকে কাছে ভিড়াতে না পেরে মাদ্রাসায় যাতায়াত শুরু করেন। যতই বিএনপির কাছে যাচ্ছে ততই বিএনপি তার থেকে দূরত্ব বাড়াচ্ছে। এমন অবস্থা যে প্রথম কয়েকদিন নেতাকর্মীদের কাছে যেতে পারলেও এখন কাছেও যেতে পারছে না। কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ তো দূরের কথা, ফোন দিলে রিসিভ পর্যন্ত করছে না। এমন অবস্থায় হতাশায় ডুবছে কাসেমীর অনুসারীরা। কোন গতি না পেয়ে মাদ্রাসায় উঠেছেন কাসেমী।

ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জে কয়েক’শ ছোট-বড় মাদ্রাসা রয়েছে। সে সব মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগই শিশু এবং দেশের অন্যান্য জেলার। এসব মাদ্রাসায় ভোটার হাতে গোনা কয়েকটি। সেখানে যারা শিক্ষক হিসেবে রয়েছেন তাদেরও বেশির ভাগ দেশের অন্যান্য স্থান থেকে এখানে জীবিকার তাগিদে এসেছেন। তাই একথা নির্ধিদ্বায় বলা যায় মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকের সংখ্যা যাই হউক না কেন ভোটের হিসেবে তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারবে না।

হেফাজতের আন্দোলনের সঙ্গে ভোটের মাঠের আন্দোলন কোনভাবেই এক ভাবা যাবে না। তখন সাধারণ জনগণের উপস্থিতি থাকায় সংখ্যার বিচারে অনেক দেখাগেলেও মাদ্রাসার ছাত্রদের আলাদা করলে তেমন একটা দেখা যাবে না। যদিওবা মাদ্রাসায় ভোটার সংখ্যা নাই বলা চলে।

এসব হিসাবে কাসেমী মাদ্রাসার দারস্থ হলে ভোটের মাঠে তেমন কোন প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, ভোটের মাঠে যেমন প্রতীক ফ্যাক্টর ঠিক তেমনি ধানের শীষ প্রতিকের মালিক বিএনপি নেতাকর্মীরাও ফ্যাক্টর। ধানের শীষের সঙ্গে ভোটাররা বিএনপির নেতাকর্মীকে অবশ্যই খুঁজবে। তাদের যখন দেখবে না তখন ভোটারদের মনে প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর