rabbhaban

এখনো অধরা নারায়ণগঞ্জের আলোচিত জেএমবি নেতা সালাউদ্দিন সালেহীন


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৫৭ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০১৯, শনিবার
এখনো অধরা নারায়ণগঞ্জের আলোচিত  জেএমবি নেতা সালাউদ্দিন সালেহীন

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে ৫০০ বোমা ফাটিয়ে অস্তিত্ব, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জানান দিয়েছিল জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)।

এরপর ছয় মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তার, পরের বছর ফাঁসি কার্যকর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার মুখে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জঙ্গি সংগঠনটি। কিন্তু ১১ বছরের মাথায় সেই জেএমবি ভয়ংকররূপে আবির্ভূত হয়ে গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁয় হামলা ও হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে পুনরুত্থানের জানান দিয়েছে।

তবে এই সংগঠন বা গোষ্ঠীটি নিজেদের আইএস (ইসলামিক স্টেট) দাবি করছে। আর পুলিশ বলছে, এরা ‘নব্য জেএমবি’। মূল জেএমবি থেকে বেরিয়ে এসে পৃথকভাবে সংগঠিত হয়েছে।

২০১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে এই সালাহউদ্দিনকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন জঙ্গিরা। তাঁর বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায়।

২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে পুলিশ হত্যা করে জঙ্গি সালাহউদ্দিনসহ জেএমবির শীর্ষস্থানীয় তিন নেতাকে (অপর দুজন বোমা মিজান ও হাফেজ মাহমুদ) ছিনিয়ে নেওয়ার পর টনক নড়ে সরকারি বাহিনীগুলোর।

জঙ্গিদের তৎপরতা নজরদারি ও এ-সংক্রান্ত তদন্ত তদারক করেন এমন একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জেএমবির এই অংশটি নিজেদের নতুন উপস্থিতির জানান দিতে ২০১৪ সালের শেষ দিকে দেশে বড় নাশকতা ঘটানোর পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু তার আগে ওই বছরের ২ অক্টোবর ভারতের বর্ধমানের একটি আস্তানায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণের কারণে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

জেএমবির অপর অংশটি মূলত আইএস মতাদর্শ অনুসরণ করে। নিজেদের আইএস দাবি করলেও বাংলাদেশ সরকার তা নাকচ করে দিয়ে বলে আসছে যে দেশে কোনো আইএস নেই। এরা জেএমবির একটি অংশ।

এদিকে সালাউদ্দিনকে ধরতে ইতোমধ্যে পুলিশ ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। কিন্তু তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

ফ্ল্যাশব্যাক
মো. সালেহীন ওরফে সালাউদ্দিন ও কামরুজ্জামান মতিন ওরফে আব্দুল মতিন জাকির। আপন দুই ভাই। বয়সের ব্যবধান মাত্র ৭ বছর। মেধাবী ছাত্র হয়েও তারা এখন ভয়ঙ্কর জঙ্গী নেতা। পরিবারের সদস্যরা বুঝে উঠতে পারেনি লেখাপড়ার আড়ালে কখন তারা জঙ্গীসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে বনে গেছেন জঙ্গী নেতা। পাড়া প্রতিবেশীরা বিষয়টি চিন্তা করে রীতিমত আতকে উঠেন। এলাকাবাসী ঘৃনায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে দুই ভাইয়ের পরিবারের দিক থেকে। তাদের মতে, শায়খ আব্দুর রহমান জামালপুর, বাংলা ভাই রাজশাহী আর সালাউদ্দিন ও তার ভাই মতিন বন্দর তথা নারায়ণগঞ্জবাসীর ললাটে নতুন করে এক কলঙ্ক এঁটে দিয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা এই দুই ভাই এখন দেশ ব্যাপী পরিচিত।

২০০৯ সালের ১২ এপ্রিল রাজধানীর খিলক্ষেত থেকে জেএমবির আমীর শায়খ আবদুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন ও পৃষ্ঠপোশক কামরুজ্জামান মতিন ওরফে জাকির এবং ২০০৬ সালের ২৬ এপ্রিল চট্রগ্রামম মহানগরীর পাহাড়তলী এলাকা হতে সালাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০৭ সালের ২০ আগস্ট ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক মোঃ ইসরাইল হোসেন এক হত্যা মামলায় সালাউদ্দিনকে মৃত্যুদন্ড সাজা প্রদান করেন। এছাড়া ময়মনসিংহ আদালতে বোমা হামলার ঘটনায়ও সালাউদ্দিনকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছিল।

এক নজরে সালেহীন ওরফে সালাউদ্দিন
মোঃ সালেহীন ওরফে সালাউদ্দিনের বয়স ৩৮। পরিবারের সদস্যরা তাকে ডাকতো সোহেল বলে। ১৯৯৭ সালে বাড়ীর পাশের বন্দর বিএম ইউনিয়ন স্কুল হতে মানবিক বিভাগ হতে কৃষি বিষয়ে লেটার মার্ক সহ ৬৬৩ নাম্বার নিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। লেখাপড়াতে মধাবী হওয়ায় সালেহীনকে ভর্তি করানো হয় ঢাকার তেজগাওস্থ পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট এর সিভিল বিভাগে।

২০০৬ সালের ২৬এপ্রিল র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের পর সালাউদ্দিন জানায়, ১৯৯৯ সালে সানির সাথে পরিচয় হয় সালেহীনের। তখন সানি তাকে জেএমবি শায়খ আব্দুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। শায়খ রহমানের সংস্পর্শ পেয়ে ক্রমশ দুর্ধর্ষ হয়ে উঠেন সালেহীন। পরবর্তীতে তার নাম পরিবর্তন করে সালেহীন থেকে সে হয় সালাউদ্দিন। শায়খের কাছ থেকে সে বোমা তৈরী সহ বিভিন্ন জঙ্গী প্রশিক্ষন নেয় এবং দক্ষ হয়ে উঠে। অল্প দিনেই একজন ভালো সংগঠক হিসেবে সালাউদ্দিন পরিচিত পান। পরে শায়ক রহমান তাকে শূরা কমিটির সদস্য মনোনীত করেন। সে বাংলাভাইয়ের চেয়েও পুরনো জেএমবি সদস্য। শায়খ আব্দুর রহমানকে সিলেটের শাপলা বাগের বাসা সে ভাড়া করে দিয়েছিল। অনুরূপ বাংলাভাইকেও সে ময়মনসিংহে অবস্থান করার ব্যবস্থা করে দেয়। ২০০৬ সালের ১৭ মার্চ সালাহউদ্দিনকে গ্রেপ্তারের জন্য ১০ লাখ টাকার নগদ পুরস্কার ঘোষণা করেন সরকার। ২৪ এপ্রিল র‌্যাবের অভিযানে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়তলী এলাকা হতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে ২০০৫ সালের ১৭ আগষ্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ এবং ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামী।

যেভাবে নারায়ণগঞ্জের দায়িত্ব পান সালাউদ্দিন
সূত্র মতে, ২০০২ সালের প্রথম দিকে ঢাকার মুগদাপাড়া ঝিলপাড়ের একটি বাসায় শায়খ আব্দুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, বন্দরের সালাউদ্দিন, হাফেজ মাহমুদ, পিরোজপুরের খালেক, নাটোরের আবদুল আউয়াল ও খুলনার আসাদুজ্জামানের উপস্থিতিতে একটি বৈঠক হয়। সালাউদ্দিনের কাজে খুশী হয়ে শায়ক ও বাংলা ভাই তাকে নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের দায়িত্ব দেন। ২০০২ সালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জস্থ ব্র্যাক অফিস লুঠের নেতৃত্ব দেন। যথাযথ দায়িত্ব পালন করার কারণে শায়খের অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন হয়ে ওঠেন সালাউদ্দিন। তাই রাজশাহীর বাগমারার অপারেশনে বাংলা ভাইকে সহযোগীতা করতে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর