ধৈর্যের লাগামে বাধা শামীম ওসমান


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৪৯ পিএম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বুধবার
ধৈর্যের লাগামে বাধা শামীম ওসমান

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমান প্রভাবশালীদের একজন। তাঁর বক্তব্যের যেমন প্রশংসা হয়ে থাকে সর্বত্র তেমনি কড়া বক্তব্যের কারণে তিনি বেশ আলোচিতও। কিন্তু এবার এই নেতা বেশ সহনশীল হয়ে বক্তব্য রেখে যাচ্ছেন। এর আগে তাকে কখনো এতো সহনশীল হতে দেখা যায়নি।

যেকারণে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শামীম ওসমান যখনই সভা সমাবেশের ডাক দিয়েছে তখনই সবাই মনে করেছে কোন বিশেষ ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। কিন্তু এবারই এর কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা গেছে। সবশেষ ৭ সেপ্টেম্বরের সমাবেশে শুধুমাত্র ঝাঁজালো বক্তব্যেই তাকে ক্ষ্যান্ত থাকতে দেখা যায়। এর ফলে তাকে সবাই সহনশীল রাজনীতিবিদ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ দলের নেতাকর্মীদের উপর একের পর এক মামলা ও জিডি সহ নানা ব্যবস্থা গ্রহণের চিত্র দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে ওসমান বলয়ের অধিকাংশ নেতা রয়েছে।

সম্প্রতি এমপি শামীম ওসমানের একমাত্র ছেলে অয়ন ওসমানের সমন্ধী ভিকিকে গ্রেফতার করা হয়। গত ১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবকলীগের সেক্রেটারী সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধান মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়। ১৮ এপ্রিল ১৭নং ওর্য়াড কাউন্সিলর আবদুল করিম বাবু ওরফে ডিস বাবুকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার করা হয়। ২৩ এপ্রিল চাঁদা দাবী করার মামলায় সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম ওরফে ছোট নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অস্ত্র ও মাদক সহ সন্ত্রাসী মোফাজ্জল হোসেন চুনুœকে গ্রেফতার, সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান নাজিমউদ্দিন বিরুদ্ধে মামলা, মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজামের বিরুদ্ধে জিডি, কথিত স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মীর হোসেন মীরুর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

তবে এসব ঘটনায় পুলিশের দাবীমতে যথেষ্ঠ প্রমাণ, স্বাক্ষী ও অভিযোগ থাকার ফলে আওয়ামীলীগ নেতারা তেমন কিছু বলতে পারে নাই। এর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জে ছেলে ধরা সন্দেহে দুই বাকপ্রতিবন্ধীকে গণপিটুনির ঘটনায় একজন মৃত্যুবরণ করে। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের হয়ে সেখানে আসামিদের তালিকায় আওয়ামীলীগের অনেক নেতাদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়। তা নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। আর এই সুযোগে আওয়ামীলীগ নেতারা বেশ সোচ্চার হয়ে ঢালাওভাবে বক্তব্য দিতে শুরু করে। শামীম ওসমানও কিছুটা খোলস থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনিও এ ব্যাপারে ঝাঁজালো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি পুলিশ প্রশাসনের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করেছেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তেমন কোন বিশেষ কোন ঘোষণা দেননি।

৭ সেপ্টেম্বরের সমাবেশে এমপি শামীম ওসমান বলেন বলেন, ‘সিদ্ধিরগঞ্জে ঘটনা ঘটেছে ১নং ওয়ার্ডে। মামলার আসামী দেওয়া হলো ১ হতে ১০নং ওয়ার্ডে। ৭৫ জনের নাম উল্লেখ সহ ৪৯৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলো। তারা সকলেই আওয়ামী লীগের সাচ্চা কর্মী ও ব্যবসায়ী। মামলার বাদী পরে বলেছেন মামলায় তার সাক্ষর জালিয়াতি করেছেন। সেখানে সেলিম নামের পুলিশ এসব কাজ করেছেন। আসামীর তালিকা করেছেন। সিদ্ধিরগঞ্জ হলো নারায়ণগঞ্জের গোপালগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারকে ডেকেছিলাম। তিনি অনেক চৌকষ পুলিশ অফিসার। পুলিশ সুপার আশ্বাস দিয়েছেন নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হবে না। অতি উৎসাহী পুলিশ অফিসার ষড়যন্ত্র করছে। কিছু অফিসার আছে সংখ্যায় কম নিজেরা শিবির টিবির করতো, নয়তো বাপ দাদা রাজাকার ছিল। তিনি আমাকে কথাও দিয়েছেন নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হবে না। আর যেসব পুলিশ কর্মকর্তারা গেম করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শামীম ওসমান বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের অনেক পুলিশ অফিসার জুনিয়র জুনিয়ার অফিসাররা অনেক নেতার বিরুদ্ধে নিউজ করতে সাংবাদিকদের কারো কারো টেক্সট করে। তাদের সাথে রাজাকার সমর্থিত পত্রিকার ভালো সম্পর্ক। টেক্সট করে বলে নিজাম, হেলাল, সাজনু, জুয়েলদের বিরুদ্ধে নিউজ করেন। আরে ওরা তো নারায়ণগঞ্জের ছেলে। আমি তো ওদের ভাই। আমি তাদের নাম বলতে চাই না। ছোটখাট অফিসার যারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস মারো তারা বুইঝা রাখো সময় এক যায় না। এগুলো করে লাভ নাই। আমরা ছোটকাল থেকেই পুলিশ পুলিশ খেলা খেইলা অভ্যস্ত।’

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা এখন চাইলে নারায়ণগঞ্জকে অবরুদ্ধ করে করতে পারি। আমরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেটের মহাসড়ক কেউ খোলার ক্ষমতা রাখে না। এই খেলা আমাদের খেলার অভ্যাস আছে। এইগুলি নিয়া কেউ খেইলেননা। সুতরাং আমাদের সঙ্গে খেলবেন না। কাকে খেলা শেখাবেন। আমরা তো অনেক ছোট বেলার খেলোয়াড়। যাদের এসএ আরএস সিএস পর্চার আওয়ামী লীগ তাদেরকে খাস বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে আর যারা খাস ছিলো তারা আজকে আওয়ামী লীগ। এসব যখন দেখি তখন কষ্ট লাগে। খুব কষ্ট লাগে।’

এদিকে আরেক রাজনীতিক ইস্যুতে শামীম ওসমান বলেছেন, ‘এ মিশনপাড়া এলাকাতেই একটি বাড়িতে জামায়াতের কার্যালয় ছিল। এ বাড়ি থেকেই আমার ছোট বোনকে টাকা দেওয়া হয়। কিছুদিন আগে দেখলাম একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। জামাতের নেতা আলী আহসান মুজাহিদের স্ত্রীর সঙ্গে আমাদের কার কার সম্পর্ক সেটা আছে। মুজাহিদ যখন ফাঁসির দড়ির সামনে তখন কে তার স্ত্রী পরিবারের লোকজনদের সনদ দিয়েছে। কে নামমাত্র মূল্যে আদর্শ স্কুলের জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু সময় হলে আবার নৌকার জন্য কাঁদবেন সেটা আর হবে না।’

এখানে উল্লেখ্য যে, এমপি শামীম ওসমান স্থানীয় দুটি পৃথক বিষয়ে বক্তব্য রেখেছেন। একটি হচ্ছে, তার দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। সেকারণে তিনি কি করতে পারেন তা বক্তব্যের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে কোন বিশেষ ঘোষণা দিচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত জামাত-শিবিরের সাথে তার কোন এক বোনের টাকা লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে যার নাম তিনি স্পষ্ট করছেননা।

অথচ বিগত দিনের রাজনীতিতে শামীম ওসমানকে প্রকাশ্যে যে কোন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অবস্থান করতে দেখা গেছে। এমনকি বিএনপির চেয়ারম্যানের গাড়ি বহরও তিনি এক সময় আটকে দিয়েছিলেন। সেই নেতা এখন এতোটাই সহনশীল হয়েছেন যে, নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েও আইনি ব্যবস্থার উপর আস্থা রাখছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর