rabbhaban

দুর্ধর্ষ পলাশের পদ প্রাপ্তিতে বাধা হতে পারে যেসব কারণ


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৫৩ পিএম, ০৬ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
দুর্ধর্ষ পলাশের পদ প্রাপ্তিতে বাধা হতে পারে যেসব কারণ

৯ নভেম্বর জাতীয় শ্রমিক লীগের কাউন্সিল। চার বছর আগেই মেয়াদ শেষ হয়েছে শ্রমিক লীগের কমিটির। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই শ্রমিক লীগের সবশেষ সম্মেলন হয়। দুই বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে চার বছরের বেশি সময় আগে।

শ্রমিক লীগের আসন্ন কাউন্সিলকে ঘিরে চলছে নানা ধরনের সমীকরণ। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার শ্রমিক লীগের নেতৃত্ব সৃষ্টি করবেন জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশের কেন্দ্রীয় পদ পেতে এবার বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বেশ কিছু নেতিবাচক ইস্যু।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশের বিরুদ্ধে এর আগে চাঁদাবাজীর অভিযোগ উঠেছিল। অটো রিকশা চালকেরা তাঁর বিরুদ্ধে ওই অভিযোগ তুলেন। কিন্তু এবার পলাশের বিরুদ্ধে অস্ত্রবাজেরও কলঙ্কের তিলক এটে যাচ্ছে। কারণ সম্প্রতি জাতীয় দৈনিক দেশ রূপান্তরের একটি সংবাদ বেশ আলোচিত হয়ে উঠেছে। ওই সংবাদের একটি অংশে নারায়ণগঞ্জের শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশের নাম রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে পলাশের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিলেও সেটা বন্ধ পাওয়া গেছে।

ওই সংবাদে বলা হয়, গত ৯ এপ্রিল রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ‘পেশাদার অপরাধী’ সাইফুল ইসলাম টিটু, মতিন ওরফে মইত্যা ও হাজি আরমান হোসেনকে। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি পিস্তল, একটি রিভলবার, ২৮ রাউন্ড গুলি ও তিনটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। পরে চারদিনের রিমান্ড শেষে ১৫ এপ্রিল আদালতের মাধ্যমে তাদের কেরানীগঞ্জে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

আর্মস এনফোর্সমেন্ট দলের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কারাগারে যাওয়ার আগে জিজ্ঞাসাবাদে মতিন ওরফে মইত্যা জানান, কারাবন্দি ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ জানে আলমের নির্দেশনায় কেরানীগঞ্জের শুভাড্যা ইউনিয়নের যুবদল সভাপতি আরমানের দুটি রিভলবার ভাড়া নিয়েছিলেন টিটু। টিটুর মাধ্যমে ওই অস্ত্র পেয়ে তারা বিভিন্ন অপারেশনে নামেন।

আর্মস এনফোর্সমেন্ট দলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের উৎস খুঁজতে গিয়ে কেরানীগঞ্জের একটি ইউনিয়ন যুবদলের নেতা আরমানের তথ্য পাওয়া যায়। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের এপিএস ও শুভাড্যা ইউনিয়ন যুবদল সভাপতি হিসেবে পরিচয় দেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, টিটু, মতিন ও আরমানের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক লীগের নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কমিটির (পাগলা) সভাপতি কাওছার হোসেন পলাশের সখ্য রয়েছে। পেশাদার এই অপরাধীরা অস্ত্রের হাতবদলের জন্য তার কার্যালয় ব্যবহার করেছিল।

সিটিটিসির জিজ্ঞাসাবাদে আরমান জানান, ১২ বছর আগে দুটি পিস্তল কিনেছিলেন রাজনৈতিক কারণেই। বেশ কিছু দিন আগে তিনি যখন কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন তখন শীর্ষ সন্ত্রাসী জানে আলমের সঙ্গে তার পরিচয়। সেখানে টিটুর সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ হয়। কারাগারে থাকা জানে আলমের নির্দেশেই তার ব্যবহৃত দুটি অস্ত্র টিটুর কাছে সরবরাহ করেছিলেন। ভাড়া হিসেবে অস্ত্র দুটি নেওয়ার পর টিটু সেই অস্ত্র মেরে দেওয়ার পাঁয়তারা করেছিল। জানে আলমকে বিষয়টি জানানোর পর তিনি ওই অস্ত্র ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন টিটুকে। এরপরই পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে।

আর্মস এনফোর্সমেন্ট দলের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলের পদ-পদবি ও ব্যবসার আড়ালে অনেকেই অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করছেন। অনেকে পেশাদার অপরাধীদের কাছে অবৈধ অস্ত্র দিচ্ছেন; তাদের কাছে ভাড়াও দিচ্ছেন। এমন অনেকেই পলাতক আছেন, যাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সাবেক এমপি কবরীকে গুলি করেছিল পলাশ

গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই সক্রিয় ছিলেন পলাশ। ২০১১ সালের ৪ জানুয়ারী এ নিয়ে তখনকার এমপি সারাহ বেগম কবরীর সঙ্গেও মারামারির ঘটনা পলাশের। সেদিন কবরী বলেছিলেন, ‘অসৎ কাজে বাধা দেওয়ায় পাগলার শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশ দুপুরে আমাকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেছে। প্রথম দফায় ছোড়া গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় আমাকে বহনকারী গাড়ি লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে গেছি।’

পরিবহন শ্রমিক নেতাকে পিটুনী

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের প্রার্থী শামীম ওসমানকে পাগলা এনে নির্বাচনী সভা করায় ট্রাক মালিক সমিতির নেতাকে পেটানোর অভিযোগ উঠে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহমেদ পলাশের বিরুদ্ধে। ১৭ জানুয়ারী বিকেলে এ ঘটনা ঘটে ট্রাক চালক ইউনিয়নের পাগলা শাখার কার্যালয়ে। তবে পলাশের দাবী, তিনি কাউকে মারধর করে নাই।

ইজিবাইক হতে চাঁদাবাজী

সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে মালিক ও শ্রমিকরা জানান, আমরা এই ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা (ইজিবাইক) চালিয়ে কোন রকমে আমাদের পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন যাপন করি। অথচ ব্যটারীচালিত অটোরিকশার কমিটির আহবায়ক ও জাতীয় শ্রমিকলীগের শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশের নেতৃত্বে একটি চাঁদাবাজ মহল আমাদের পেটে লাথি মেরে আমাদের পরিবারের হক নষ্ট করে জোড় জুলুম অন্যায় অত্যাচার করে আমাদের ঘাম ঝরানো অর্থ টোকেনের মাধ্যমে চাঁদাবাজী করে নিয়ে যায়। আমরা বিপদে আপদে পড়লে সড়কে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তারা আমাদের কোন সাহায্য সহযোগিতা করেনা অথচ সাহায্য সহযোগিতার কথা বলে প্রতিদিন আমাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে আমাদের কষ্টের উপার্জিত অর্থ। ৬ বছর আগে টোকেন বাবদ প্রতি অটোরিকশা থেকে নেয়া হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ টাকা। ৪০০ অটোরিকশা থেকে নেয়া হয়েছে সর্বমোট ২৬ লাখ টাকা। এছাড়া প্রতি ৩০ টাকা চাঁদা হিসেবে ৪০০ টি অটোরিকশা থেকে দৈনিক ১২ হাজার টাকা যা মাসে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা যা বছরে দাড়ায় ৪৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। এছাড়া ৩০০ টাকা মাসিক চাঁদা হিসেবে প্রতি মাসে ৪০০ টি অটোরিকশা থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা যা বছরে দাড়ায় ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। শ্রমিকদের কল্যাণ ফান্ডের কথা বলা হলেও গত ৬ বছরে কেউই কল্যাণ ফান্ডের কোন হিসাব পায়নি। বরং হিসাব চাওয়ায় কমিটির সদস্যদেরকেও লাঞ্ছিত করে কমিটি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। কুতুবপুর এলাকায় ব্যটারীচালিত অটোরিকশার কমিটির আহবায়ক ও জাতীয় শ্রমিকলীগের শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশের অনুগামী আজিজুল হক, মজিবর, সালু, সোহাগসহ একটি সিন্ডিকেট চাঁদাবাজি করে আসছে। এভাবে পঞ্চবটি থেকে পাগলা রুটেও বেপরোয়াভাবে চাঁদাবাজি চলে আসছে। আমাদের গরীবের ঘাম ঝরানো এই অর্থ দিয়ে কেউ কেউ রাতারাতি বিশাল অর্থের মালিক হয়ে গেছেন।আমরা আর কোন চাঁদাবাজকে চাঁদা দিতে চাইনা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার মহোদয়ের সুদৃষ্টি কামনা করছি অচিরেই যেন আমাদের এই চাঁদা দেয়া বন্ধ হয়।

নদীর তীর দখল

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, বুড়িগঙ্গা নদীর পোস্তগোলা থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত ১২ কোটি টাকা ব্যায়ে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রভাশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা বালু, পাথর, ইট, সুরকী, কয়লা, গাছের গুড়ি ফেলে ওয়াকওয়ে দখল করে রেখেছে। আবার কোথাও কোথাও রেলিং ভেঙ্গে গাছের গুড়ি গেড়ে বালু ইট সুরকী ফেলে নদী ভরাট করে এবং বাশের খুঁটিগেড়ে জেটি বানিয়ে মালামাল লোড আনলোড করে আসছে। যার কারণে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওয়াকওয়ে ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ২০১৮ সালের ৩ মে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঢাকা বন্দর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পোস্ট অফিস থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার তীর ও ওয়াকওয়ে দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা ও ভাঙচুরের অভিযোগে জিডি করেছিল । ওই জিডিতে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক এবং ফতুল্লা আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি কাউসার আহমেদ পলাশ ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, সরকার কর্তৃক নির্মিত ওয়াকওয়ে তারা অন্যায়ভাবে ব্যবহার সঙ্গে ব্যবসার কারণে সেটা ভেঙে ফেলেছে।

সাংবাদিকদের চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে আরেক ‘নূর হোসেন ফতুল্লার গডফাদার পলাশ ও তার চার খলিফা’ শিরোনামে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়। এছাড়া পলাশের কোন নাম না থাকলেও একটি সংবাদের রেশ ধরে সময়ের নারায়ণগঞ্জ, ডান্ডিবার্তা ও অনলাইন নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের ৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন ও দুইটি তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করেন। এর মধ্যে দৈনিক যুগান্তরের ফতুল্লা প্রতিনিধি আলামিন প্রধানের বিরুদ্ধে ১০ কোটি, ইত্তেফাকের নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা ও স্থানীয় দৈনিক ডান্ডিবার্তা পত্রিকার সম্পাদক হাবিবুর রহমান বাদলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি এবং দৈনিক সময়ের নারায়ণগঞ্জ পত্রিকার সম্পাদক জাবেদ আহমেদ জুয়েলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন। একই সঙ্গে আলামিন প্রধান ও নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের নির্বাহী সম্পাদক তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে দুইটি ৫৭ ধারায় মামলা করেন। ওই সংবাদ প্রকাশের পর শুধু মামলা নয় তার বাহিনীর সদস্যরা ফতুল্লায় মিছিল করে সাংবাদিকদের চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি দেয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর