rabbhaban

সাধারণ সম্পাদক হতে পারলেন না দুর্ধর্ষ পলাশ


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৩১ পিএম, ০৯ নভেম্বর ২০১৯, শনিবার
সাধারণ সম্পাদক হতে পারলেন না দুর্ধর্ষ পলাশ

জাতীয় শ্রমিক লীগের সদ্য অনুষ্ঠিত সম্মেলনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী পদ হাসিলের স্বপ্নে বিভোর ছিল দুর্ধর্ষ ও শ্রমিকলীগ নেতা কাউসার আহম্মেদ পলাশ। কেন্দ্রীয় শীর্ষ পদ বাগাতে লবিং থেকে শুরু করে কোন চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। তবে শেষতক এই দুর্ধর্ষ নেতাকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রীয় শ্রমিকলীগের সভাপতি-সেক্রেটারী ঘোষণা করা হয়। এতে কর নিচের পদ পাওয়ার জন্য আরো অপেক্ষায় থাকতে হবে এই নেতাকে। এর মধ্যে বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে এই নেতার বিতর্কিত কর্মকান্ডের সকল তথ্য নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। আর সে হিসেবে শ্রমিকলীগের গুরুত্বপূর্ণ সকল পদে ঠাই না পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা হয়।

৯ নভেম্বর জাতীয় শ্রমিক লীগের সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে ফজলুল হক মন্টু ও সাধারণ সম্পাদক কে এম আজম খসরু নির্বাচিত হয়েছেন। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সংগঠনের ১১তম জাতীয় সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে তারা নির্বাচিত হন। এছাড়া সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি ছিলেন সদ্য বিদায়ী কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি।

জানা গেছে, জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি পদে সাতজন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ১২ জনের নাম প্রস্তাব করা হয়। সভাপতি পদে যাদের নাম প্রস্তাব করা হয় তারা ছিলেন হাবিুর রহমান, ফজলুল হক মন্টু, জহুরুল ইসলাম চৌধুরী, মোল্লা আবুল কালাম আজাদ, সিরাজুল ইসলাম, নূর কুতুব আলম ও ইদ্রীস আলী ভূইয়া।

এছাড়া সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রস্তাবনা আসে অ্যাডভোকেট হুমায়ূন কবির, মকর আলী, মো. আমিনুল ইসলাম, আজাদ আলী খান, সুলতান আহমেদ, আমীর খসরু, অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান শাহীন, কে এম আজম খসরু, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুল হালিম, মো. শাহাব উদ্দিন ও মোল্লা আবুল কালাম আজাদের নাম।

নির্দিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, শ্রমিকলীগের এবারের সম্মেলনের পলাশের টার্গেট ছিল সেক্রেটারী পদ। সেই লক্ষ্যে তিনি কেন্দ্রে লবিং সহ নানা চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। এ নিয়ে অনেক দৌড়ঝাপও হয়েছে। শীর্ষ দুই পদ হারিয়ে এখন গুরুত্বপূর্ণ পদ হাসিলের মিশনে আছেন বলে জানাগেছে।

প্রথম আলোর একটি সংবাদে বলা হয়, এদিকে কাউছার আহমেদ (পলাশ) শ্রমিক লীগের বিগত কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। কেন্দ্রীয় নেতা হয়েও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতির পদ দখল করে আছেন এক যুগের বেশি সময় ধরে। পোশাক খাতের নিয়ন্ত্রণ পেতে ইউনাইটেড ফেডারেশন অব গার্মেন্টস ওয়ার্কার্সের সভাপতি হয়েছেন গত জুনে। ফতুল্লায় ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, রিকশা, স্টিল মিল, ইট-বালুর ব্যবসা, ট্রাকস্ট্যান্ড, পোশাক কারখানা থেকে শুরু করে নদীতীরে জাহাজে মাল তোলা ও নামানোর কাজসহ চাঁদাবাজি সবই তাঁর নিয়ন্ত্রণে। নদীর তীর ও ওয়াকওয়ে দখলের দায়ে গত বছর তাঁর বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

কাউছার আহমেদের স্বীকৃত কোনো পেশা নেই। তবে চলাফেরা করেন দামি পাজেরো গাড়িতে। তাঁর চাঁদাবাজির কারণে ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের রপ্তানিমুখী সোয়েটার কারখানা পাইওনিয়ার সোয়েটারস লিমিটেড বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কারখানার মালিক পরিস্থিতির নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শ্রম, বাণিজ্য, স্বরাষ্ট্র ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে দুই দফা চিঠি দিয়েছিলেন। ব্যবসায়ী সূত্র বলছে, এই কোম্পানি নারায়ণগঞ্জে আর কারখানা চালু করতে পারেনি। পরে ময়মনসিংহের ভালুকায় কারখানা স্থাপন করে। পরিকল্পিত শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি করে চাঁদাবাজির কারণে গত এক দশকে সাত-আটটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশের বিরুদ্ধে এর আগে চাঁদাবাজীর অভিযোগ উঠেছিল। অটো রিকশা চালকেরা তাঁর বিরুদ্ধে ওই অভিযোগ তুলেন। কিন্তু এবার পলাশের বিরুদ্ধে অস্ত্রবাজেরও কলঙ্কের তিলক এটে যাচ্ছে। কারণ সম্প্রতি জাতীয় দৈনিক দেশ রূপান্তরের একটি সংবাদ বেশ আলোচিত হয়ে উঠেছে। ওই সংবাদের একটি অংশে নারায়ণগঞ্জের শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশের নাম রয়েছে।

ওই সংবাদে বলা হয়, গত ৯ এপ্রিল রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ‘পেশাদার অপরাধী’ সাইফুল ইসলাম টিটু, মতিন ওরফে মইত্যা ও হাজি আরমান হোসেনকে। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি পিস্তল, একটি রিভলবার, ২৮ রাউন্ড গুলি ও তিনটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। পরে চারদিনের রিমান্ড শেষে ১৫ এপ্রিল আদালতের মাধ্যমে তাদের কেরানীগঞ্জে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

আর্মস এনফোর্সমেন্ট দলের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কারাগারে যাওয়ার আগে জিজ্ঞাসাবাদে মতিন ওরফে মইত্যা জানান, কারাবন্দি ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ জানে আলমের নির্দেশনায় কেরানীগঞ্জের শুভাড্যা ইউনিয়নের যুবদল সভাপতি আরমানের দুটি রিভলবার ভাড়া নিয়েছিলেন টিটু। টিটুর মাধ্যমে ওই অস্ত্র পেয়ে তারা বিভিন্ন অপারেশনে নামেন।

আর্মস এনফোর্সমেন্ট দলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের উৎস খুঁজতে গিয়ে কেরানীগঞ্জের একটি ইউনিয়ন যুবদলের নেতা আরমানের তথ্য পাওয়া যায়। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের এপিএস ও শুভাড্যা ইউনিয়ন যুবদল সভাপতি হিসেবে পরিচয় দেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, টিটু, মতিন ও আরমানের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক লীগের নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কমিটির (পাগলা) সভাপতি কাওছার হোসেন পলাশের সখ্য রয়েছে। পেশাদার এই অপরাধীরা অস্ত্রের হাতবদলের জন্য তার কার্যালয় ব্যবহার করেছিল।

ইজিবাইক হতে চাঁদাবাজী

ব্যটারীচালিত অটোরিকশার কমিটির আহবায়ক ও জাতীয় শ্রমিকলীগের শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশের নেতৃত্বে একটি চাঁদাবাজ মহল আমাদের পেটে লাথি মেরে জোর জুলুম অন্যায় অত্যাচার করে আমাদের ঘাম ঝরানো অর্থ টোকেনের মাধ্যমে চাঁদাবাজী করে নিয়ে যায়। আমরা বিপদে আপদে পড়লে সড়কে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তারা আমাদের কোন সাহায্য সহযোগিতা করেনা অথচ সাহায্য সহযোগিতার কথা বলে প্রতিদিন আমাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে আমাদের কষ্টের উপার্জিত অর্থ। ৬ বছর আগে টোকেন বাবদ প্রতি অটোরিকশা থেকে নেয়া হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ টাকা। ৪০০ অটোরিকশা থেকে নেয়া হয়েছে সর্বমোট ২৬ লাখ টাকা। এছাড়া প্রতি ৩০ টাকা চাঁদা হিসেবে ৪০০ টি অটোরিকশা থেকে দৈনিক ১২ হাজার টাকা যা মাসে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা যা বছরে দাড়ায় ৪৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। এছাড়া ৩০০ টাকা মাসিক চাঁদা হিসেবে প্রতি মাসে ৪০০ টি অটোরিকশা থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা যা বছরে দাড়ায় ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। শ্রমিকদের কল্যাণ ফান্ডের কথা বলা হলেও গত ৬ বছরে কেউই কল্যাণ ফান্ডের কোন হিসাব পায়নি। বরং হিসাব চাওয়ায় কমিটির সদস্যদেরকেও লাঞ্ছিত করে কমিটি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। কুতুবপুর এলাকায় ব্যটারীচালিত অটোরিকশার কমিটির আহবায়ক ও জাতীয় শ্রমিকলীগের শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশের অনুগামী আজিজুল হক, মজিবর, সালু, সোহাগসহ একটি সিন্ডিকেট চাঁদাবাজি করে আসছে। এভাবে পঞ্চবটি থেকে পাগলা রুটেও বেপরোয়াভাবে চাঁদাবাজি চলে আসছে। আমাদের গরীবের ঘাম ঝরানো এই অর্থ দিয়ে কেউ কেউ রাতারাতি বিশাল অর্থের মালিক হয়ে গেছেন।

নদীর তীর দখল

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, বুড়িগঙ্গা নদীর পোস্তগোলা থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত ১২ কোটি টাকা ব্যায়ে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রভাশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা বালু, পাথর, ইট, সুরকী, কয়লা, গাছের গুড়ি ফেলে ওয়াকওয়ে দখল করে রেখেছে। আবার কোথাও কোথাও রেলিং ভেঙ্গে গাছের গুড়ি গেড়ে বালু ইট সুরকী ফেলে নদী ভরাট করে এবং বাশের খুঁটিগেড়ে জেটি বানিয়ে মালামাল লোড আনলোড করে আসছে। যার কারণে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওয়াকওয়ে ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ২০১৮ সালের ৩ মে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঢাকা বন্দর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পোস্ট অফিস থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার তীর ও ওয়াকওয়ে দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা ও ভাঙচুরের অভিযোগে জিডি করেছিল । ওই জিডিতে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক এবং ফতুল্লা আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি কাউসার আহমেদ পলাশ ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, সরকার কর্তৃক নির্মিত ওয়াকওয়ে তারা অন্যায়ভাবে ব্যবহার সঙ্গে ব্যবসার কারণে সেটা ভেঙে ফেলেছে।

সাংবাদিকদের চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে আরেক ‘নূর হোসেন ফতুল্লার গডফাদার পলাশ ও তার চার খলিফা’ শিরোনামে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়। এছাড়া পলাশের কোন নাম না থাকলেও একটি সংবাদের রেশ ধরে সময়ের নারায়ণগঞ্জ, ডান্ডিবার্তা ও অনলাইন নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের ৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন ও দুইটি তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করেন। এর মধ্যে দৈনিক যুগান্তরের ফতুল্লা প্রতিনিধি আলামিন প্রধানের বিরুদ্ধে ১০ কোটি, ইত্তেফাকের নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা ও স্থানীয় দৈনিক ডান্ডিবার্তা পত্রিকার সম্পাদক হাবিবুর রহমান বাদলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি এবং দৈনিক সময়ের নারায়ণগঞ্জ পত্রিকার সম্পাদক জাবেদ আহমেদ জুয়েলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন। একই সঙ্গে আলামিন প্রধান ও নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের নির্বাহী সম্পাদক তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে দুইটি ৫৭ ধারায় মামলা করেন। ওই সংবাদ প্রকাশের পর শুধু মামলা নয় তার বাহিনীর সদস্যরা ফতুল্লায় মিছিল করে সাংবাদিকদের চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি দেয়।

সূত্র বলছে, শ্রমিক লীগের আসন্ন কাউন্সিলকে ঘিরে চলছে নানা ধরনের সমীকরণ। সেই লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জের ৪ জন শ্রমিক নেতার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যাপক তদন্ত হয়েছে। এতে উঠে এসেছে বিগত দিনে শ্রমিক ইস্যু, নৌ চাঁদাবাজী, সরকারী জমি দখল সহ সহ বিভিন্ন সেক্টর দখলের বিশদ অভিযোগ উঠে এসেছে। ফলে আগামীতে নারায়ণগঞ্জ সহ কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়া তাঁদের জন্য দুস্কর হয়ে দাঁড়াবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর