রেলওয়ে উচ্ছেদ গরীব মারার অভিযান, ধনীদের নয়!


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:২৭ পিএম, ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
রেলওয়ে উচ্ছেদ গরীব মারার অভিযান, ধনীদের নয়! ফাইল ফটো

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ডাবল রেললাইন প্রকল্পের জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নারায়ণগঞ্জ শহরে রেলওয়ের নিজ জায়গা উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে। অব্যাহত থাকা এই অভিযানে ধনী ব্যবসায়ীদের সময় সুযোগ দেয়া হলেও ক্ষুদে ব্যবসায়ীদের কোন সময় না দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে। এই দ্বৈথনীতির কারণে ভুক্তভোগিদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা এই অভিযানকে গরীব মারার অভিযান বলে উল্লেখ করছেন।

জানাগেছে, নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় রেল স্টেশন এলাকায় রেলওয়ের জায়গায় মাউরা হোটেল তাদের খাবার বিক্রির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য স্থাপনার সাথে এই হোটেলটি উচ্ছেদ করার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে এই হোটেল কর্র্তৃপক্ষকে মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ক্ষুদে ব্যবসায়ীদের কোন সুযোগ না দিয়ে সরাসরি উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। এতে কয়েক শ’ ক্ষুদে ব্যবসায়ীর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, অনেকে পথে বসে গেছে। এছাড়া রহস্যজনক কারণে শহরের ২ নং রেলগেইট সংলগ্ন মনির হোটেলের আশেপাশের স্থাপনা ভাঙা হলেও হোটেলটি ভাঙা হয়নি। এতে করে ভুক্তভোগীদের মনে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলওয়ের উচ্ছেদ অভিযানেও ধনী ব্যবসায়ীরা সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। যেকারণে ক্ষুদে ব্যবসায়ীদের বেলায় জিরো টলারেন্স দেখানো হচ্ছে। দুই নীতির কারণে ভুক্তভোগীরা নানা প্রশ্ন তুলছে। একারণে এই উচ্ছেদ অভিযান গরীব মারার অভিযান বলে অনেকে উল্লেখ করছেন। কারণে একই অভিযানে দুই রকম নীতি দেখানো হচ্ছে।

১৪ নভেম্বর সকাল ১১টায় নারায়ণগঞ্জের কেন্দ্রীয় রেল স্টেশন এলাকায় রেলওয়ে কর্তৃক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কোন নোটিশ ছাড়া বহু দোকান-পাট, গুদাম ঘর বিশেষ করে বহু প্রজন্ম ধরে বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায় সহ প্রায় ১১১টি পরিবারকেও উচ্ছেদ করা হয় বলে অভিযোগ করেছে উচ্ছেদকৃত ব্যবসায়ী ও ক্ষতিগ্রস্থা এলাকাবাসী। তবে মাউরা হোটেলটি উচ্ছেদের ব্যাপারে সময় দেয়া হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে কলোনীর পঞ্চায়েত কমিটির সদস্য শহীদ জানান, ‘‘বস্তিবাসীদের নির্ধারিত স্থানে পুনর্বাসন করে উচ্ছেদ করার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময় বলে থাকেন। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রমে দেখা যাচ্ছে তার কথার কোন কার্যকারিতা নাই। রেলওয়ে কলোনীর মন্দিরের আশেপাশের ৬৩০০ বর্গফুটের মধ্যে যত বসতবাড়ী বা স্থাপনা রয়েছে তা না ভাঙ্গার জন্য উচ্চ আদালত থেকে আমরা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এসেছি। কিন্তু উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও আমাদের ঘরবাড়ী ভেঙ্গে ফেলা হলো। ব্যবসায়ী এবং হরিজন কলোনীতে বসবাসকারী কাউকেই কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

এর আগে গত ২০ অক্টোবর উকিলপাড়া থেকে ২নং রেলগেট পর্যন্ত উচ্ছেদকৃত এলাকা থেকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত নির্মাণ সামগ্রী সরিয়ে নেয়ার কাজ করছে বেশ কিছু নির্মাণ শ্রমিক। থান কাপড়ের মার্কেটের ৪০ থেকে ৪৫ ফুট পর্যন্ত ভাঙ্গা হলেও থান কাপড়ের মার্কেটের বাকী দোকানগুলো এখনো খুলেনি মালিকরা। মনির হোটেল সংলগ্ন ১০টি দোকান নিজেরাই ভেঙ্গে নিচ্ছে মালিকপক্ষ। তবে এখন পর্যন্ত মনির রেস্তোরা ভাঙার কোন লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং পুরোদমেই চলছিল মনির রেস্তোরার খাবার বিক্রির কার্যক্রম।

১৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহরের দুই নং রেলগেইট এলাকায় রেলওয়ের জমি অবৈধ ভাবে দখল করে গড়ে উঠা একটি টিনসেড আধপাকা থান কাপড়ের মার্কেট মার্কেট, রেডিমেট জামা কাপড়ের দোকান ও বসত ঘরসহ প্রায় আড়াইহাজার ছোট বড় স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়া হয়। তবে এসময় নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের অনুরোধে ৩দিন সময় দেয়া হয় শহরের ২নং রেল গেইট এলাকার মনির রেস্তোরা ও সংলগ্ন ১০টি দোকান। মনির রেস্তোরার মালিক মনির হোসেন নাসিকের ১৪ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

১৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন এলাকায় স্টাফ কোয়াটার সহ অবৈধভাবে দখল করে গড়ে উঠা ৯ শতাধিক ছোট বড় স্থাপনা গুড়িয়ে দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ঢাকা রেলওয়ের ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে ওই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়।

উচ্ছেদ অভিযানে আরো উপস্থিত ছিলেন রেলওয়ের সহকারি প্রকৌশলী হামিদউল্লাহ, সার্ভেয়ার ইকবাল মাহমুদ, কনসালটেন্ট আবু বকর সিদ্দিক সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা। এদিকে উচ্ছেদ অভিযানে আকস্মিক স্টাফ কোয়ার্টারের ১১০টি স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েন স্টাফ কোয়ার্টারের বাসিন্দারা। অনেকই বসতঘরের ভেতর থেকে ব্যবহৃত সামগ্রী সরিয়ে নিতে না পারায় সেগুলি ধ্বংসস্তুূপে পরিণত হয়।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, আমরা অনেক কষ্ট করে পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করতে এসেছি। বেশি পুঁজি থাকলে নিশ্চই ঝুপড়ি দিয়ে ব্যবসা করতাম না। আমাদের এই মানবেতন অবস্থার কথা বিবেচনা করে অন্তত পক্ষে আমাদের সময় দেয়া উচিত ছিল। এমনকি উচ্ছেদের আগেও আমাদের মালামাল সরানোর সুযোগ দেয়া হয়নি। সব মালামাল ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এতে করে আমাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। পরিবার স্বজন নিয়ে এখন না খেয়ে মরতে হবে। অথচ মাউরা হোটেল, মনির হোটেলের মত ধনী মালিকদের বেলায় সুযোগ দেয়া হয়, সময় দেয়া হয়। যেকারণে এই অভিযান মূলত গরিব মারার অভিযান তা বুঝতে আর কারো বাকি নাই।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর