নারায়ণগঞ্জে বিএনপিতে সক্রিয় নিষ্ক্রিয়তার হিসেব নিকেশ


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:২০ পিএম, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
নারায়ণগঞ্জে বিএনপিতে সক্রিয় নিষ্ক্রিয়তার হিসেব নিকেশ

দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির নারায়ণগঞ্জ জেলার মূল দল ও সহযোগি সংগঠনের রাজনীতিতে সক্রিয়তার তুলনায় নিষ্ক্রিয়তার ঝুড়ি বেশ পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় এক যুগের মত ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে দিন যত অতিবাহিত হচ্ছে বিএনপি তত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। তবে পুলিশি বাধা সত্ত্বেও কখনো কখনো বিএনপি জেগে উঠেছে। কিন্তু পুলিশি হামলা মামলায় তা ফের মুখ থুবড়ে পড়েছে। এভাবেই দলটির সক্রিয় নিষ্ক্রিয়তার হিসেব নিকেশে এবার চমক দেখা গেছে। কারণ বিএনপির যখন একেবারে নিষ্ক্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে গেছে তখন পুলিশের চোখ রাঙানি অনেকটাই কমে গেছে। এই অবস্থায় বিজয় দিবসে বিএনপির গণজোয়ার দেখে সেই নিষ্ক্রিয়তার ঝুড়ি অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে। আর সবাইকে তাঁক লাগিয়ে বিএনপি সক্রিয়তার হিসেব বিকেশের খাতায় নানা গড়মেলে জটিল অংশ কষেছে। এ নিয়ে রাজনীতক মহল সহ বিভিন্ন মহলে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

এখানে উল্লেখ্য ২০০৭ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ক্ষমতার বাইরে রয়েছে বিএনপি। পরবর্তীতে ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে দলটিএ ২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারীতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দুর্নীতি মামলায় জেলে পাঠানোর পর থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দফায় দফায় মামলা ও জেলা জুলুমের চিত্র দেখা যায়। এতে দলটি একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এমনকি দলীয় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও পালন করতে পারেনি দলটি। এরপর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কিছুটা সক্রিয় হলেও তেমনভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি। তবে এবার বিজয় দিবসে সেই চমক দেখিয়েছে।

১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে সকাল থেকেই বিএনপি ও তার সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সংগঠন ও নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে বিজয় মিছিল বের করে। সকাল ১০ টা থেকে শহরের রাজপথ সরগরম হয়ে উঠে। একে একে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি, মহানগর বিএনপি, যুবদল, জেলা ছাত্রদল, মহানগর ছাত্রদল, শ্রমিকদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল সহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা লাল-সবুজের পতাকা হাতে বিজয়ের মিছিল বের করে। বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এতো বড় মিছিল কিংবা জমায়েত আগে দেখা যায়নি। তাই বিএনপির অনেক নেতাকর্মীরা বেশ হতবাক হয়েছে।

এসময় বাদ্য বাজনা সহ বিজয়ের উল্লাসে মেতে উঠে বিএনপির নেতাকর্মীরা। এছাড়া বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে নানা প্ল্যাকার্ড ও ফেসটুন নিয়ে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তোলে। হাজার হাজার নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে পুরো শহর কম্পিত হয়ে উঠে। পুলিশ প্রশাসনে যথেষ্ঠ পরিমাণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীর কাছে তা নিতান্তই কম পড়ে যায়। এদিকে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিজয় মিছিলে বাধা দেয়াকে কেন্দ্র করে শহরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের কর্মকর্তাকে মারধর ও লাঞ্ছিত করে।

বিএনপির প্রতিটি র‍্যালিই ছিল হাজারো নেতাকর্মীর। আর তাই এত বড় মিছিলগুলো কয়েকজন পুলিশ বাধা দিয়ে আটকে দিচ্ছিল এটি যেন অনেক নেতাকর্মীই মানতে পারছিলেন না। এর মধ্যেই মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সম্পাদক জিয়ার একটি মিছিল ২ নং রেলগেটে আসলে তাদের আটকে দেন সদর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জয়নাল আবেদীন, আর তাতে তার সাথে কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন নেতাকর্মীরা। পরে তিনি অতিরিক্ত পুলিশ এনে নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেন। এরপর শহরের বিভিন্ন স্থানেই বিএনপির প্রতিটি মিছিলেই পুলিশের সাথে বাদানুবাদ হয় বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের। আর এতে রাতে মামলা ঠুকে দেয় পুলিশ। মামলায় অভিযোগ আনা হয় অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা, সড়কে প্রতিবন্ধকতা, পুলিশের উপর হামলা ও তাদের অস্ত্র ছিনতাইয়ের চেষ্টার। বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় বিভিন্ন মিছিলে থাকা ১৯ জন নেতার নামে মামলা দেয়া হলেও অনেককেই অজ্ঞাত কারণে মামলা থেকে বাদ দিয়েছে পুলিশ।

এদিকে বিএনপির এই হঠাৎ জেগে উঠাকে অনেকে ভালভাবে মেনে নিতে পারছেনা। কারণ দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি হামলা, মামলায় জর্জরিত হয়ে ব্যাকফুটে ছিল। সেখান থেকে কিভাবে এতোটা সক্রিয় হয়ে পুরো রাজপথ কম্পিত করলো। এই প্রশ্ন এখন সবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আর তাতে করে রাজনীতিক বোদ্ধাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রথমত, দেশের রাজনীতিতে বড় ধরণের পরিবর্তনের গ্রীন সিগন্যাল মিলেছে। যেকারণে তৃণমূল জেগে উঠেছে। এর ধারাবাহিকতায় এরুপ সক্রিয়তা দৃশ্যমান হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, সরকার পরিবর্তনের জন্য আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই। তাই আন্দোলনের জ্বলে উঠতে আগে থেকেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এরুপ গণজোয়ারের আয়োজন করা হয়েছে। আর সে হিসেবে তারা সফল হয়েছে। কারণ নারায়ণগঞ্জের রাজপথ কম্পিত করে সেই প্রমাণ কেন্দ্রে পৌছে গেছে।

তৃতীয়, বিএনপির পিঠ দেলায়ে ঠেকতে ঠেকতে এখন সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। যেকারণে প্রকৃতিগত কারণে বিএনপি জ্বলে উঠেছে। এমনটা ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই তিনটির যে কোন একটি সফল হলেই বর্তমান সরকারের জন্য বেশ কঠিন সময় অপেক্ষা করছে বলা চলে।

বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছে, বিএনপি যে ইচ্ছে করলেই আন্দোলন সংগ্রাম কিংবা চমক দেখাতে পারে তার প্রমাণ হয়ে গেছে। তবে কোন শক্তি বিএনপিকে দমিয়ে রাখতে পারবেনা তা সবাই এই গণজোয়ারের মধ্য দিয়ে বুঝে গেছে। এখন অপেক্ষা শুধু শীর্ষ নেতৃত্বদের গ্রীন সিগন্যাল।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর