রাজাকার পরিবারের ভয়ংকর কাহিনী


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৪:৫৩ পিএম, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯, বুধবার
রাজাকার পরিবারের ভয়ংকর কাহিনী বা থেকে - রফিক, মাকসুদ ও আনোয়ার

নারায়ণগঞ্জে এখন আলোচিত একটি ইস্যু হলো রাজাকার। বন্দরের মুছাপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনের পুরো পরিবার ছিল রাজাকার সম্পৃক্ত। মাকসুদ চেয়ারম্যানের বাবা ও চাচাদের যেমন রয়েছে বর্বর কাহিনী তেমনি মাকসুদ চেয়ারম্যানের প্রয়াত ভাই সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের ছিল ভয়ংকর কাহিনী।

সম্প্রতি বিজয় দিবসে জিমখানা স্টেডিয়ামে এক অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী মাকসুদ হোসেনকে সরাসরি রাজাকারের ছেলে বলে উল্লেখ করেন। মেয়রের এই বক্তব্যের পর বন্দর তথা নারায়ণগঞ্জের সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

সর্বশেষ ২০১৬ সালে মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টি সমর্থক প্রার্থী মাকসুদ হোসেন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নৌকা প্রতীকের আব্দুল কাদির।

প্রেম করে বিয়ে করায় সংখ্যালঘু যুবককে পাশবিক নির্যাতন

মাকসুদ চেয়ারম্যানের প্রয়াত ভাই আনোয়ার হোসেন ছিলেন একই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। বন্দরে প্রেম করে বিয়ে করার অপরাধে সংখ্যালঘু এক যুবকের উপর চালানো হয়েছিল বর্বর অমানুষিক পাশবিক নির্যাতন। শালিসি বৈঠকে ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের নির্দেশে শত শত মানুষের সামনে ওই যুবকের পুরুষাঙ্গে ইট বেঁধে তাকে হাটানো হয়েছে ২ কিলোমিটার পথ। ওই চেয়ারম্যান নিজেই তাকে বেধড়ক পিটিয়েছে।

বর্বর নির্যাতনের শিকার যুবকের নাম বাবু চক্রবর্তী। সে বন্দর উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন (লাঙ্গলবন্দ) মহাত্না গান্ধী মন্দিরের পূজারী রমেশ চক্রবর্তীর ছেলে। ঘটনাটি সাংবাদিকদের জানানোর অপরাধে বিমল ও তার ভাই সুকুমার নামের আরোও দুই সংখ্যালঘু সহোদরকে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছে চেয়ারম্যানের লোকজন।

আলোচিত এ ঘটনার মূল হোতা ছিলেন বন্দর উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রয়াত চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন।

জানা গেছে, ২০১১ সালের জুলাইতে ওই ঘটনা ঘটে। ওই সময়ে বন্দর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আলেয়া বেগম লৌমহর্ষক এ ঘটনাটি উত্থাপন করেন। এ ঘটনা শুনে সভায় উপস্থিতিরা হতবাক হয়ে পড়েন।

সভায় আলেয়া বেগম জানান, বাবু চক্রবর্তীর সঙ্গে তার মুছাপুর এলাকার ব্রজেন্দ্র দাসের মেয়ের দীর্ঘদিনের প্রেম ছিল। ৩ মাস আগে তারা দুজনে বিয়ে করে। মেয়ের পিতা ব্রজেন্দ্র এ বিয়ে মেনে না নিয়ে তিনি মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের কাছে বিচার দাবি করে। ২০১১ সালের ১৬ জুলাই বিকালে মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদের নব-নির্বাচিত চেয়ারম্যান আনোয়ার মন্দিরে বসে এক সালিশের আয়োজন করে। এলাকার শত শত মানুষের উপস্থিতিতে মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবন সংলগ্ন মহাত্নাগান্ধীর মন্দিরে সালিশে আনোয়ার হোসেন একক ভাবে রায় দিয়ে নিজে গাছের ডাল দিয়ে বাবু চক্রবর্তীকে বেধড়ক মারধর করে গুরুতর আহত করে তাকে। পরে বাবুর পুরুষাঙ্গে ইট বেঁধে দুই কিলোমিটার এলাকা হাঁটতে বাধ্য করে। খবর পেয়ে সংবাদিকরা ঘটনাস্থলে যায়। সাংবাদিকরা চলে যাওয়ার পর রাত ১০টায় নবনির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন তার দলবল নিয়ে নন্দিবাড়ী এলাকার বিমল রায়ের বাড়িতে গিয়ে তাকে মারধর করে। এ সময় বাধা দিলে তার বড় ভাই সুকুমার রায়কেও মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে তাদেরকে ধারালো ছুরি দিয়ে হত্যার চেষ্টা করলে এলাকাবাসী এগিয়ে আসে। এসময় আনোয়ার হোসেন হত্যার হুমকি দিয়ে তার বাহিনী নিয়ে চলে যায়।

আনোয়ার হোসেন ধামগড় ইউনিয়ণ পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কুখ্যাত রাজাকার প্রয়াত রফিকের ছেলে। আনোয়ারও বন্দর থানার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে জেলার বিভিন্ন থানায় হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে দুই ডজন মামলা রয়েছে। ২০১১ সালের ৯ জুন অনুষ্ঠিত ধামগড় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আনোয়ার হোসেন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে বন্দর থানায় হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপহরণ, অবৈধ অস্ত্র রাখা প্রভৃতি অপরাধে ৮টি মামলা রয়েছে। বন্দর থানা-পুলিশ জানিয়েছে, এর আগেও তাকে অনেকবার গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রতিবারই জামিনে বেরিয়ে এসে এলাকায় কায়েম করে ত্রাসের রাজত্ব।

ওই ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি), বন্দর থানার ওসিকে তলব করেছিল হাইকোর্ট। নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তা জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, নারায়ণগঞ্জের এসপি, বন্দর থানার ওসি ও মুছাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন এর জবাব দিতে দুই সপ্তাহ সময় পেয়েছেন।

ওই ঘটনার কয়েকদিন পরেই আনেয়ার হোসেন ট্রাকের চাপায় নিহত হন। পুলিশ জানায়, চেয়ারম্যান আনোয়ার ও তাঁর সহযোগী সেলিম রাত ১১টার দিকে সোনারগাঁ উপজেলা থেকে মোটরসাইকেলে করে বন্দরে ফিরছিলেন। পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনাখালী এলাকায় একটি ট্রাক পেছন দিক থেকে তাঁদের মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। এতে চেয়ারম্যান আনোয়ার মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়লে পেছন থেকে আসা অপর একটি ট্রাক তাঁকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় এলাকাবাসী তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

মাকসুদ চেয়ারম্যানের বাবা রফিক বাহিনীর সন্ত্রাস

রাজাকারের ছেলে বলার অপরাধে কয়েক বছর আগে বন্দর থানার কুঁড়িপাড়া বাজারে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিনকে। এখনও ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, অপহরণ এমন কোন অপকর্ম নেই যা করছে না তার সন্ত্রাসী ছেলেরা। সন্ত্রাসী ছেলেদের নেতৃত্বে রয়েছে এই ঘৃণিত রাজাকার। রাজাকার রফিক বাহিনীর আতঙ্কে এখনও দিন কাটায় ধামগড় ইউনিয়নের মানুষ। তার ছেলেরা যা খুশি তা-ই করে। ভয়ে টু শব্দ করে না মানুষ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বন্দর থানার ধামগড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিল এমএ রফিক। সে হাত মিলায় পাকহানাদার বাহিনীর সাথে। স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হয়। মেতে ওঠে হত্যার উৎসবে।

এলাকাবাসী জানিয়েছে, ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল একদিনেই তার নেতৃত্বে হত্যা করা হয় এলাকার ৪ নিরীহ লোককে। তার হাতে ঐদিন নৃশংসভাবে খুন হয় ধামগড় গ্রামের বাসিন্দা গিয়াসউদ্দিন, আমিন উদ্দিন, মতি মিয়া ও আ. হামিদ।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ঘৃণিত রাজাকারের বাহিনী আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় ১৩টি গ্রাম। ১৪ ডিসেম্বর ’৭১ রাজাকার রফিকের বাহিনী গুলি করে হত্যা করে ধামগড় গ্রামের নূর ইসলাম, নয়ামাটি গ্রামের আবদুল হামিদ, ইদ্রিস আলী, লালখারবাগ গ্রামের ইদ্রিস আলী, কুটিরবন্ধ গ্রামের আবুল হাশেম, মোছেরছড়া গ্রামের জলিল মিয়া ও হরিপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজকে। পিস কমিটির চেয়ারম্যান রফিকের নেতৃত্বে ছালামত, খালেক, মিন্নত আলী, আবদুস সালাম, গোলাম মাওলা, আলী হোসেন প্রমুখের সমন্বয়ে গঠিত রাজাকার বাহিনী তান্ডব চালায় ধামগড় ইউনিয়নে। এখনও অনেকে এই ঘৃণিত রাজাকার বাহিনীর নৃশংসতার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে। স্বাধীনতার পর ভোল পাল্টায় রাজাকার রফিক। কিছুদিন আত্মগোপনের পর আবার ফিরে আসে এলাকায়, আবির্ভূত হয় স্বরূপে। গড়ে তোলে বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। ছলে বলে কৌশলে নির্বাচিত হয় ধামগড় ইউপি চেয়ারম্যান। আবার অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে এই কুখ্যাত রাজাকার।

কয়েক বছর আগে রাজাকার রফিকের সন্ত্রাসীরা কুড়িপাড়া বাজারে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিনকে। আলাউদ্দিনের অপরাধ, তিনি রফিকের ছেলেকে বলেছিলেন- ‘রাজাকারের ছেলে’। এই নৃশংস হত্যাকান্ড চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে বন্দরে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বন্দর কমান্ড মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিনের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন, মিছিল-মিটিং পর্যন্ত করে। আইনের ফাক গলে বেরিয়ে আসে রাজাকার রফিক ও তার সন্ত্রাসীরা। রাজাকার রফিক বিয়ে করেছে ৪টি। ৪ পক্ষে তার ছেলে রয়েছে ৮ জন। প্রায় সবাই চিহ্নিত সন্ত্রাসী। রাজাকার রফিকের দ্বিতীয় স্ত্রীর তৃতীয় ছেলে মুর্শেদ ওরফে মুন্সীও দুর্ধষ সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে অসংখা মামলা রয়েছে বন্দর থানায়। চতুর্থ ছেলে মোয়াজ্জম ওরফে কালুর বিরুদ্ধে রয়েছে ২ হত্যাসহ ৯টি মামলা। এলাকাবাসী জানিয়েছে, রাজাকার রফিকের অন্যান্য ছেলেও সন্ত্রাসী। তাদের ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটায় এলাকার মানুষ। মানুষের জমিজমা দখল করে এখন অগাধ সম্পত্তির মালিক রাজাকার রফিক। স্থানীয় মিলকারখানায় একচ্ছত্র আধিপত্য। দ্বিতীয় স্ত্রীর তৃতীয় ছেলে মুর্শেদ ওরফে মুন্সীও দুর্ধষ সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে অসংখা মামলা রয়েছে বন্দর থানায়। চতুর্থ ছেলে মোয়াজ্জম ওরফে কালুর বিরুদ্ধে রয়েছে ২ হত্যাসহ ৯টি মামলা।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
রাজনীতি এর সর্বশেষ খবর
আজকের সবখবর