জামায়াত রাজাকার ইস্যুতে দুই মেরুর যুদ্ধ


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৩৪ পিএম, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯, বুধবার
জামায়াত রাজাকার ইস্যুতে দুই মেরুর যুদ্ধ

নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগের দুই মেরু জামাত ও রাজাকার ইস্যুতে একে অপরকে বেকায়দায় ফেলতে চেষ্টা করছে। যেকারণে একদিকে জামাত কানেকশন ইস্যুতে দুই মেরু পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছে। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে এবার মেয়র আইভী রাজাকারের সন্তানদের নিয়ে সমালোচনার ঝড় তুলেছেন। এতে করে দুই মেরুর যুদ্ধ দৃশ্যমান হচ্ছে।

১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের এক অনুষ্ঠানে মেয়র আইভী বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করেছে। যা প্রায় ১১ হাজার। শুধু তাই নয়, আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘আমরা রাজাকারদের বংশধরদের কোথাও দেখতে চাইনা।’ সেই সুবাদে আমি বলতে চাই, একজন প্রখ্যাত রাজাকারের ছেলে কিভাবে নারায়ণগঞ্জে চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হয়। প্রখ্যাত রাজাকার গোলাম রব্বানী যিনি তার ভাই চেঙ্গিস, তার ভাই বাদল এই গলাচিপার মধ্যে অনেক মানুষকে হত্যা করেছে লুটপাট করেছে। সেই কুলাঙ্গারের সন্তানেরা কিভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান রাইফেল ক্লাবের মত জায়গায় সাধারণ সম্পাদক হয়, চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হয়। যারা তাদের বানিয়েছে তাদেরকেও বিচার করা উচিত।

আইভী আরো বলেন, সংসদ সদস্যের ছত্রছায়ায় নৌকাকে ফেল করিয়ে রাজাকারের সন্তান মাকসুদকে চেয়ারম্যান বানানো হয়। আমি নারায়ণগঞ্জের মানুষকে বলবো সোচ্চার হওয়ার জন্য। বিশেষ করে আমার পাশে যে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা বসে আছে, এতো ভয়ভীতি কিসের! যখন যুদ্ধে গিয়েছিলেন তখন তো মৃত্যুকে ভয় পান নাই। আজ যখন রাজাকারের সন্তানরা বসে থাকে আপনাদের সামনে, আপনারা তাদের নেতৃত্বে আনেক কিছু করেন। তাদের বিরুদ্ধে কেন কথা বলেননা। রাজাকারের সন্তানদের এখান থেকে নামানোর জন্য দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলুন।

এর আগে গত ৭ ডিসেম্বর নাসিম ওসমান মেমোরিয়াল পার্কে (নম পার্ক) ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামায়াত সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে শামীম ওসমান বলেন, গত বছর নারায়ণগঞ্জ জামায়াতে ইসলামের আমীর মাওলানা মাঈনউদ্দিন আহমদ নাশকতার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জামাতের আমীর সাহেব যে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন সেই সব কথাবার্তার রেকর্ড কিছু সাহসী সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল। সেখানে জামাতের আমীরের বক্তব্যে উঠে এসেছে, ১৯৭৫ এর ১৫আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর নারায়ণগঞ্জে যখন আওয়ামীলীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী জেলাখানায়, বাড়ীঘরে থাকতে পারেনি, তখন মেয়র আইভীর পিতা মরহুম আলী আহাম্মদ চুনকা সাহেব রাজাকারদের নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ও আলবদর প্রধান মাওলানা আলী আহসান মুজাহিদকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে মিটিং করতেন। আলী আহাম্মদ চুনকা সাহেব আদমজীর অফিসারদের জায়গা দখল করে নিয়েছিলেন এবং এই আলী আহসান মুজাহিদের সাথে মিলে মাত্র ১০হাজার টাকা মূল্যে ১৯৭৬ সালে বিক্রি করে দিয়েছিলেন আদর্শ স্কুলের জন্য।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেন, ‘২২ মাস পরে মেয়র মামলা করেছে। শাহ নিজাম, জাকিরুল আলম হেলাল, সাজনুকে আসামী করে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন, আপনি কি প্রিয়া সাহার মতো, খালেদা জিয়ার মতো হতে চান। এই মামলা আওয়ামী লীগের জন্য অসনি সংকেত। উনি মামলায় বিবাদী করেছে সরকারকে। সরকারী দলের লোক হয়ে সরকার দলীয় লোকদেরকে বিবাদী করেছেন। উনি এই মামলার মাধ্যমে কি প্রমাণ করতে চান।’

খোকন সাহা আরো বলেন, ‘উনার (আইভী) সাথে সংঘর্ষ হয়েছে হকারদের। আর উনি মামলা করেছেন নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। আমরা জানি কার ইঙ্গিতে এসব করা হচ্ছে। এর পিছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী চিন্তা। মার খেয়েছে নিয়াজুল। মামলা করার কথা নিয়াজুলের। কিন্তু নিয়াজুল নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করে নাই। বিএনপি জামায়াতকে খুশি করার জন্যই এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না।’

এর প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি আব্দুল কাদির বলেন, জামায়াতের সম্পৃক্ততার কথা যে বলে তার (শামীম ওসমানের) সাথে জামায়াতের সখ্য অনেক। বিগত দিনগুলোতে হেফাজতে ইসলামের মানুষ দিয়ে সে মিছিল মিটিং বৈঠক করেছে। কোর্ট থেকে বের করে জামায়াতে ইসলামের লোকের সাথে কথা হয়েছে, এগুলো আমরা পত্রিকার মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই। মিথ্যা ছলনা দিয়ে নারায়ণগঞ্জের পরিবেশকে নষ্ট করার কাজে শামীম ওসমান জড়িত। মিথ্যার মধ্যে তিনি ডুবে থাকেন। এখন আর কথা খায় না। একদিন মিথ্যা মিথ্যায় তার জীবনটা রচিত হবে।

কাদির শামীম ওসমান প্রসঙ্গে আরো বলেন, তিনি তো প্রত্যেকটা কথার মধ্যে ধরা খেয়ে যান। বিএনপি জামায়াত, জাতীয় পার্টির লোকজন যারা স্বাধীনতার বিরোধীতা করছে তারা তার কমিটির মধ্যে রয়েছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় যেসব নির্বাচন হচ্ছে, সবগুলোতেই স্বাধীনতা বিপক্ষের শক্তিকে পাওয়া যায়। নারায়ণগঞ্জ ক্লাব ও রাইফেল ক্লাব সহ অনেক জায়গায় জামায়াত শিবিরের লোকদের কমিটিতে আনছে। তারা নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ ধ্বংসের ধারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। ভালো লোকের মূল্যায়ণ নাই। মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে না। শামীম ওসমান একজন রাজনৈতিক বিচক্ষণ ব্যক্তি। তার প্রপাগান্ডার কারণেই সে জাতীয় নেতা হতে পারে না। মিথ্যা ও আর জামায়াত শিবিরের লোকদের নিয়ে কাজ করে অন্যের উপর দোষ চাপাতে চায়। সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনেও আইভীর বিপক্ষের প্রার্থী সাখাওয়াতকে টাকা দিয়েছে। শামীমরা আওয়ামী লীগকে কিভাবে ধ্বংস করবে সেটা নিয়েই তারা ব্যস্ত থাকে। শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জের মধ্যে জাতীয় নেতা হিসেবে পদ পাইতেন। তার দুইটা কারণেই নিজকে নারায়ণগঞ্জের গন্ডির মধ্যে রেখে দিছে। একটি হলো সে বেশি মিথ্যা কথা বলে। আরেকটি হলো, সে মনে করে আমিই নারায়ণগঞ্জে থাকবো, আর কেউ থাকবে না। এই দুই কারণেই তার অবস্থান তুলে ধরতে পারেন না। তিনি সবসময় তার প্রতিপক্ষ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। তার গুণাবলী ছিল সে গুণাবলি সত্যভাবে উপস্থাপন করতে পারলে সে জাতীয় নেতা হতে পারতো।

সূত্র বলছে, দুই মেরুর প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনীতির কারণে একে অপরকে ঠেকানোর মিশনে নেমেছে। সেই লক্ষ্যেই উভয়পক্ষ পরস্পর বিরোধী বিষোদাগারে তৎপর হয়ে উঠেছে। এতে করে দুই মেরুর লড়াই আরো জমে উঠেছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
রাজনীতি এর সর্বশেষ খবর
আজকের সবখবর