ওমর ফারুকের ওয়ার্ডে চাঁদা ছাড়া কাজ হয় না!


সিটি করেসপন্ডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:২৭ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, মঙ্গলবার
ওমর ফারুকের ওয়ার্ডে চাঁদা ছাড়া কাজ হয় না!

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। ১নং ওয়ার্ডস্থ বিভিন্ন এলাকায় বহুতল নির্মাণ করতে গেলে কাউন্সিলর ফারুককে দিতে হয় দাবিকৃত চাঁদা। নয়তো বাড়ির কাজ বন্ধ করে দেয় ফারুক।

এসব অভিযোগ অল্প দিনের নয়, কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই এসব কাজ করে চলেছে ফারুক। তবে ভয়ে কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পায়না বিধায় এসব অপকর্ম চাপা থেকে যায়।

কাউন্সিলর ফারুকের অপকর্মের মধ্যে রয়েছে সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ কাজের অনিয়ম, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজী ও মাদক ব্যবসা সহ বিভিন্ন অপকর্ম। তার পালিত সন্ত্রাস বাহিনীর দ্বারা এসব কার্যক্রম করে ফারুক।

অভিযোগ রয়েছে, হিরাঝিল মসজিদ গলি এলাকায় সমিতির মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি বহুতল ভবনের মালিকদের কাছ থেকে দশ লক্ষ টাকা চাঁদা নিয়েছে কাউন্সিলর ফারুক। ওই ভবনের পাশের অপর আরো একটি বহুতল ভবনের নির্মাণের সময় মোটা অংকের টাকা চাঁদা নেয় সে। এছাড়া হীরাঝিল এলাকায় থেকে একটি ভবন নির্মানের সময় ৩ লক্ষ টাকা চাঁদা দিতে হয় কাউন্সিলর ফারুককে। এখানেই শেষ নয়, কোন জমি সংক্রান্ত জটিলতা থাকলে তার কাছে বিচার নিয়ে আসলে পক্ষপাতিত্ব করে লাখ লাখ টাকা নিয়ে বিচার সম্পন্ন করে ফারুক।

গত বছর মিজমিজি পাগলা বাড়ী এলাকায় এক প্রবাসীর জমির জটিলতায় বিচার শালিসের জন্য ৩ লক্ষ টাকা নিয়েছে তিনি। পাইনাদী এলাকার একটি নির্মাণ কাজ শুরু করে কাউন্সিলর ফারুকের লোকজন গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়। পরে ঐ নির্মানধীন ভবনের মালিক ৩ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে কাজ শুরু করে। এছাড়াও ১নং ওয়ার্ডের হিরাঝিল এমপি গলি এলাকার এক বাড়ির মালিক সামার সিবাল নলকূপ স্থাপনের কাজ করলে কাউন্সিলরের লোকজ কাজ বন্ধ করে দেয়। পরে কাউন্সিলর ফারুককে ১ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে কাজ শুরু করে।

সিদ্ধিরগঞ্জ পুল থেকে আব্দুল আলী পুল হয়ে পুকুরপাড় পর্যন্ত যাত্রী বহনকারী নিষিদ্ধ অটো ইজিবাইক থেকে নিয়মিত চাঁদা উত্তোলন করতো ফারুকের পালিত চাঁদাবাজ মুন্না খান। এছাড়া শিমরাইল মোড়ে চিটাগাংরোডে ফুটপাত দখল করে হকারদের কাছ থেকেও নিয়মিত উত্তোলিত চাঁদার একটি অংশ আসে ফারুকে কাছে। ইতিপূর্বে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে কাউন্সিলর ফারুকের কয়েকজন চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করেছিলো।

দলীয় ক্ষমতায় থাকায় তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস করে না কেউ। চুপচাপ নিরবে এসব অত্যাচার সহ্য করে যাচ্ছে ভূক্তভোগীরা।

ইতোমধ্যে ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ কর্মজীবী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও ব্যবসায়ী হাজী চাঁন মিয়া কাউন্সিলর ফারুকের বিরুদ্ধে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। চাঁন মিয়া নিজেও ভুক্তভোগী। কাউন্সিলর ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে একটি আরসিসি সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ কাজের অনিয়ম, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজী ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেন ভুক্তভোগী চাঁন মিয়া।

সংবাদ সম্মেলনে চাঁনমিয়া কাউন্সিলর ফারুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই কাউন্সিলর ফারুক ও তার পিতা ইউনুস মিয়া আমরা বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করে আসছে। তাদের অব্যাহত ষড়যন্ত্রে আমি ও আমার পরিবার ভয় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। নাসিক ১ নং ওয়ার্ডের পাইনাদী নতুন মহল্লা এলাকার ওই সড়ক নির্মাণ করা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এলাকাবাসির। তাই এলাকাবাসির পক্ষে আমি সড়কটি নির্মাণ করার জন্য মেয়র বরাবর আবেদন করি। জনস্বার্থে মেয়র ডা.সেলিনা হায়াৎ আইভী সড়কটি নির্মাণ কাজ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সড়কটির পাশে আমার দুইটি বাড়ি থাকায় কাউন্সিলর ওমর ফারুক নির্মাণ কাজে বাধা সৃষ্টি করে। অবশেষে সকল বাধা উপেক্ষা করে মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর আন্তরিকতায় সড়কটির নির্মাণ কাজের টেন্ডার আহবান সিটি মেয়রকে অবগত করালে মেয়র প্রকৌশলী সুমন দেবনাথ সরেজমিন পরিদর্শন না করে কাউন্সিলর ফারুকের সাথে আঁতাত করে মনগড়া প্রতিবেদন দেয়।

তিনি বলেন, এ বিষয়টি মেয়রকে অবগত করালে মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী প্রকৌশলী সুমন দেবনাথকে ৩ দিনের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করেন। পাশাপাশি ১০ দিনের মধ্যে সরজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেন। এরপর এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একজন সিটি কর্পোরেশন ও আরেকজন পাবলিক সার্ভেয়ারের উপস্থিতিতে ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর মাপঝোপ করা হয়।

এতে দেখা যায় বিদ্যমান ৮ ফুট সড়কের ৬ ফুট আমার নিজস্ব জমিতে। নিয়ম অনুযায়ী, রাস্তার দুই পাশের জমির মালিক সমান জমি ছাড়তে হয়। সড়কের উত্তর পাশের বাড়ির মালিক রফিকুল ইসলাম। আমরা সমপরিমাণ জমি ছাড়লে তার বহুতল ভবন ভাঙা পড়ে। তাই আলোচনা সাপেক্ষে মানবিক বিবেচনা করে আমি আমার একাই সড়কের জন্য ৮ ফুট জায়গা দিতে সম্মতি প্রদান করি। আর রফিকুল ইসলাম তার বাড়ির বারান্দা অংশ ভেঙে ২ ফুট জায়গা দিতে সম্মতি প্রদান করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক উপস্থিত এলকাবাসীর সামনে নাসিকের প্রতিনিধি প্রকৌশলী সুমন দেবনাথ রফিকুল ইসলামের বাড়ির ২ ফুট ও আমার বাড়ির বাউন্ডির দেয়ালের ২ ফুট ভাঙার জন্য লাল দাগ দেন। কাউন্সিলর ফারুক রফিকুল ইসলামের বাড়ি রক্ষা আর আমার বাড়ি ক্ষতি সাধন করার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মেয়রকে ভুল বুঝায়। শেষ পর্যন্ত ১২ ফুটের পরিবর্তে ড্রেনসহ ১০ ফুট প্রশস্থ সড়কে নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত হয়। আমি সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেই।

চাঁন মিয়া বলেন, কাউন্সিলর ফারুক আমার ফ্যাক্টরিতে চাঁদা চাইতে আসে তখন তাদের চাঁদা না দেয়ায় আমার ফ্যাক্টরির দারোয়ানকে মারধর করে। এছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জ পাইনাদি এলাকায় ৪ কাঠা জায়গার মালিক বাড়ি কাজ করতে হলে কাউন্সিলর ওমর ফারুককে ১০ লাখ টাকা দিতে হয়। একই সাথে বাড়ি নির্মাণের মালামাল রড সিমেন্ট বালুসহ বিভিন্ন জিনিস তার কাছে কিনতে বাধ্য করে ফারুক। কোন ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা মত বাড়ি করতে পারে না। অন্যথায় তিনি বাড়ি নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেন। সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নুর হোসেনের মাদক ব্যবসা এই কাউন্সিলরের হাতে নিয়ন্ত্রাধীন বলে দাবি করেন চাঁন মিয়া।

অভিযোগের সকল বিষয় অস্বীকার করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ওমর ফারুক বলেন, ‘রাস্তার জন্য জায়গা ছাড়তে বলায় এবং তিনি নিজেই এই রাস্তার টেন্ডার করেছেন, তবে রাস্তাটি ৮ ফুট করায় চাঁন মিয়া আমার উপর ক্ষুদ্ধ হন। তিনি সামনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইলেকশন করবে তাই এমন মিথ্যা অভিযোগ করছে। রাস্তার ব্যাপারটির আগে তার সাথে আমার ভালো সম্পর্ক ছিলো। মাদকব্যবসা, চাঁদাবাজির অভিযোগ পুরোটাই চাঁন মিয়ার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁর ফ্যাক্টরিতে যদি আমি কাউকে মারধরই করি তবে তিনি কেন থানায় অভিযোগ করলেননা। আসলে এগুলো বানানো।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর