পাপিয়ার পাপাচারে নারায়ণগঞ্জে আতঙ্ক


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৩:৪২ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বুধবার
পাপিয়ার পাপাচারে নারায়ণগঞ্জে আতঙ্ক

সবশেষ ক্যাসিনো কান্ডে ইসমাইল হোসেন সমরাট ও ওই সময়ে ঠিকাদার জিকে শামীম সহ আরো কয়েকজন গ্রেপ্তারের পর দেশে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান দৃশ্যতা কিছুটা শ্লথগতিতে ছিল। আর এ কারণে নারায়ণগঞ্জের অপরাধীরাও আবারো নিজেদের মেলতে শুরু করেছিল। কিন্তু যুব মহিলা লীগ নেত্রী পাপিয়া গ্রেপ্তারের পর ফের নড়েচড়ে বসেছে অপরাধীরা।

শুদ্ধি অভিযান অনেক দিন থমকে গেলেও নারায়ণগঞ্জের পার্শ্ববর্তী জেলা নরসিংদি জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়ার অনৈতিক কর্মকান্ড টক অব দ্যা কান্ট্রি তে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে থমকে যাওয়ার পর নতুন করে এই গ্রেফতারের বিষয়টি ফের বিতর্কিতদের মতে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ এর আগে শুদ্ধি অভিযানে নারায়ণগঞ্জের বিতর্কিতদের অনেকে ধরা পড়ে। এর ফলে ফের শুদ্ধি অভিযানের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে-এমন আশঙ্কায় ভুগছে নারায়ণগঞ্জ জেলার বিতর্কিতরা।

জানাগেছে, গত ২২ ফেব্রুয়ারীতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে দেশ ত্যাগের সময় পাপিয়াসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৭টি পাসপোর্ট, নগদ দুই লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ টাকার জাল মুদ্রা, ১১ হাজার ৯১ ইউএস ডলারসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা জব্ধ করা হয়। পরবর্তীতে ফার্মগেটের এলাকায় ২৮ নম্বর ইন্দিরা রোডে অবস্থিত রওমন’স ডমিনো রিলিভো নামক বিলাসবহুল ভবনে তাদের দুটি ফ্যাটে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি পিস্তলের ম্যাগজিন, ২০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ ও নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেক, বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি ভিসা ও এটিএম কার্ড জব্দ করে র‌্যাব। পরে গ্রেফতারকৃত পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমানের ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জর করে আদালত।

রিমান্ড আবদেনের প্রতিবেদনে পুলিশ উল্লেখ করে, পাপিয়াসহ চার আসামি সংঘবদ্ধভাবে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, জাল নোটের ব্যবসা, চাঁদাবাজি, তদবির বাণিজ্য, জমি দখল-বেদখল, অনৈতিক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অর্থ বিত্তের মালিক হয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে নারীদের দিয়ে অনৈতিক কার্যকলাপ করার নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর দুপুরে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের প্রস্তাবিত কমিটির সহ সভাপতি গোলাম কিবরিয়া (জি কে) শামীমকে রাজধানীর নিকেতনে তার কার্যালয় থেকে তাকে আটক করে র‌্যাব। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার সনমান্দি ইউনিয়নের মৃত মোঃ আফসার উদ্দিন মাস্টারের ছেলে জি কে শামীম। শামীম কেন্দ্রীয় যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে বহিষ্কার করা হয়। গুলশানের নিকেতনের কার্যালয় থেকে বিপুল অস্ত্র-মাদক ও টাকাসহ আটক করা হয়। তাছাড়া রাজধানী সহ সারা দেশের শুদ্ধি অভিযানের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগ সহ দলের বিভিন্ন বিতর্কিত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

জানাগেছে, রাজধানী সহ সারা দেশের শুদ্ধি অভিযান চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রলীগ, যুবলীগ সহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীরাও এই শুদ্ধি অভিযানের জালে আটকা পড়ছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের কয়েকজন বিতর্কিত নেতাও গ্রেফতার হয়েছে। ইতোমধ্যে ফতুল্লার ইউনাইটেড ক্লাবে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করে ৭ জুয়ারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এতে করে শুদ্ধি অভিযানের পক্ষে দাবি জানিয়ে আসছে দলের ত্যাগী নেতারা। কারণ শুদ্ধি অভিযানের দলের বিতর্কিত নেতা ও ব্যক্তিরা ধরা পড়ছে যা দল, সমাজ ও জাতির জন্য নিঃসন্দেহে মঙ্গল বয়ে আনবে।

এখানে উল্লেখ্য যে, গত ৩ অক্টোবর রাতে ফতুল্লায় দ্যা ইউনাইটেড অ্যাসোসিয়েশন ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ৭ জুয়ারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আসামিদের কাছ থেকে ৩ বান্ডেল কার্ড, নগদ ২০ হাজার ৫শ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জে অনেক বিতর্কিত নেতাকর্মী বিভিন্ন সময় পুলিশ প্রশাসনের হাতে ধরা পড়েছে। এসব নেতাদের অনেকে জামিন পেয়ে মুক্তি পেয়েছে। আবার অনেকে আইনের ফাঁকা দিয়ে ছাড়া পেয়ে গেছে। আবার অনেকে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় ধরাকে সরা জ্ঞান করে চলছে। যদিও এর আগে ধারাবাহিকভাবে শুদ্ধি অভিযান ও নারায়ণগঞ্জে সিংহাম খ্যাত সাবেক পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদের সময়ে ক্ষমতাসীন দলের বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে দফায় দফায় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়। সেই আতঙ্ক ফের নতুন করে দেখা দিয়েছে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে।

নির্দিষ্ট সূত্র বলছে, শুদ্ধি অভিযান শুরু হলেই বিতর্কিতরা গাঁ ঢাকা দেয়। যখনই এরুপ কোন শুদ্ধি অভিযানে পুলিশ প্রশাসন তৎপর হয়েছেন তখনই বিতর্কিতরা গাঁ ঢাকা দিয়ে তাদের বিতর্কিত কর্মকান্ড গুটিয়ে নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ অস্থায়ীভাবে সব বন্ধ করে দিয়েছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে ফের স্বরুপে ফিরেছে। এবারও একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে। রাজধানীতে পাপিয়া গ্রেফতারের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের বিতকির্তরা বেশ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে তাদের বিতর্কিত কর্মকা-ের অনেক কিছুই অস্থায়ীভাবে গুটিয়ে নেয়া হয়েছে। কেউ কেউ আবার সতর্কতা অবলম্বন করছেন।

উল্লেখ্য, একটি অনুষ্ঠানে পুলিশের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে গত ২৯ মার্চ নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজামের বিরুদ্ধে জিডি করেন ফতুল্লা মডেল থানার ওসি শাহ মো: মঞ্জুর কাদের। ১৮ এপ্রিল নগরীর পাইকপাড়া থেকে একটি চাঁদাবাজি মামলায় ১৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল করিম বাবুকে গ্রেফতার করা হয়। আব্দুল করিম বাবুকে গ্রেফতারের পরপরই তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়। ফেনসিডিল সহ গত ১ আগস্ট পুলিশের জালে আটকা পড়ে ২৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফ উদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধান। চাঁদাবাজী ও একজন ব্যবসায়ীকে মারধরের অভিযোগ নারায়ণগঞ্জের আলোচিত মিনহাজউদ্দিন ভিকিকে ৩১ আগস্ট রাতে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। অঘোষিত গডফাদার হিসেবে পরিচিত উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা কৃষক লীগের সভাপতি নাজিমউদ্দিনের বিরুদ্ধে মারধর, লুটপাটের অভিযোগে দুটি মামলা হয়েছিল। এছাড়াও অনেক রাঘববোয়ালরা এখনো অধরা রয়ে গেছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর