নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে শাহ আলমের লস প্রজেক্ট


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:০৬ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বুধবার
নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে শাহ আলমের লস প্রজেক্ট

সদ্য বিলুপ্ত হওয়া নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির কমিটির পদে থাকা নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী অর্থাৎ টাকাওয়ালা নেতাদের কাছে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। আর এই অভিযোগের অন্যতম প্রমাণ ছিল ফতুল্লা থানা বিএনপির ৭১ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি। এই আহবায়ক কমিটির জন্য জেলা বিএনপির পদত্যাগকারী নেতা শাহ আলম বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্র্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সেই সাথে জেলা বিএনপির অধীনে থাকা থানা কমিটিগুলোও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে জেলা বিএনপিতে শাহ আলমের বিনিয়োগ করা বিপুল পরিমাণ টাকা লস প্রজেক্ট হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। কারণ শাহ আলম যে কমিটির জন্য টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন শেষ পর্যন্ত সেই কমিটি অচল হয়ে গেছে।

সূত্র বলছে, গত ২১ ফেব্রুয়ারী দলের সহ-দফতর সম্পাদক মুহাম্মদ মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার কথা বলা হয়। সেই সাথে ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরবর্তী নতুন কমিটি গঠন না হওয়া পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলার অধীন সব উপজেলা ও পৌর বিএনপির কার্যক্রম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের পরামর্শে পরিচালিত হবে।

এর আগে ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী ঘোষিত নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির ২৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে সভাপতি পদে দায়িত্ব পান কাজী মনিরুজ্জামান আর সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পান অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। আর তাদেরকে এই পদে অধিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে ছিল বিএনপির শিল্পপতি নেতা শাহ আলমের বিনিয়োগ ছিল। আর এর বিনিময়ে তারা শাহ আলমের আনুগত্য স্বীকার করে চলবেন। একই সাথে জেলা বিএনপির কমিটিতে শাহ আলমের অনুসারী অনেকেই পদায়ন করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন তারা।

এরই মধ্যে নিজের উপর চাপ কমাতে ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী দলীয় পদবী থেকে পদত্যাগ করেন ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহ সভাপতি শাহ আলম। তবে তিনি পদত্যাগ করলেও তার অনুসারীদেরকে ছায়া হিসেবে রেখে যান। শাহ আলমের পদত্যাগের একদিন পরই ফতুল্লা থানা বিএনপির আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। আর এতে যাদেরকে পদায়ন করা হয়েছিল তাদের অধিকাংশ নেতাই শাহ আলমের অনুসারী। আর এই কমিটি অনুমোদন দিয়েছিলেন শাহ আলমের আনুগত্য স্বীকারকারী জেলা বিএনপির বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

দলীয় সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির ২৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার দুই বছরেও তারা কমিটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে না পারলেও তারা একদিনের ব্যবধানেই ফতুল্লা থানা কমিটি দিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও পরবর্তীতে জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে ফতুল্লা থানা বিএনপির আহবায়ক কমিটির পরে। ফতুল্লা থানা কমিটি দেয়ার ক্ষেত্রে শুধু জেলা সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদই অবগত ছিলেন। তাদের ছাড়া অন্য কোন নেতা অবগত ছিলেন না। কমিটি ঘোষণার দেয়ার পরেই জেলা বিএনপির অন্যান্য নেতারা অবগত হতে পেরেছিলেন।

তবে সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদক এই একক সিদ্ধান্ত অন্য কেউ মেনে নিতে পারছিলেন না। ফলে নবগঠিত ফতুল্লা থানা বিএনপির আহবায়ক কমিটি নিয়ে বিএনপিতে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। অনেকেই এই কমিটিকে পদত্যাগকারী নেতা শাহ আলমের ছায়া কমিটি বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন। জেলা সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ।

জানা যায়, ফতুল্লা থানা বিএনপির আহবায়ক পদে আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। বিগত দিনে দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ না করলেও তিনি সরকারী দলের কর্মসূচিতে ঠিকই হাজির হয়ে থাকেন। আজাদ বিশ্বাস নিজ এলাকার সরকারী দলের সংসদ সদস্যকে নেতা হিসেবে মানেন বলে বেশ কয়েকবার ঘোষণা দিয়েছেন। নিজের উপজেলার চেয়ারম্যান পদ টিকিয়ে রাখার জন্য ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আতাত করে চলেন তিনি। তার সামনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাকে গালি দেয়া আর তিনি এটা নিরবেই হজম করেন। তার এসকল কর্মকান্ডের কারণে বিগত দিনগুলোতে দলীয় নেতাকর্মীরা বহুবার আজাদ বিশ্বাসকে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। আর তাকেই ফতুল্লা থানা বিএনপির আহবায়ক হয়েছিল।

একই সাথে সদস্য সচিব পদে দায়িত্ব পাওয়া নজরুল ইসলাম পান্নার বিরুদ্ধে রয়েছে অস্ত্রবাজের অভিযোগ। তিনি বিভন্ন সময় অস্ত্রবাজীর কারণে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন অনেকবার। নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি এসকল বিষয়ক প্রাধান্য দিয়ে নিজেদের সুবিধা আদায়ে নজরুল ইসলাম পান্নাক পদে বসিয়েছেন। ফতুল্লা থানা বিএনপির অনেক পোড় খাওয়া নেতাদেরকে কমিটি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। যারা দলের দু:সময়ে কান্ডারীর ভূমিকা পালন করেছিলেন তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। ফলে জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের এই বিতর্কিত কমিটিকে মেনে নিতে পারছিলেন না তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত জেলা বিএনপির মূল কমিটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় তাদের অধীনে থাকা ফতুল্লা থানা বিএনপির কমিটিও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এরই মধ্যে দিয়ে জেলা বিএনপির পদত্যাগকারী নেতা শাহ আলমেরও বিনিয়োগ করা বিপুল পরিমাণ টাকাও লস প্রজেক্ট হিসেবেই দেখা দিয়েছে। শাহ আলম জেলা বিএনপিতে নিজের প্রভাব ধরে রাখার জন্য বিনিয়োগ করলেও কমিটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় তার প্রভাবও শূণ্যেও কোঠায় নেমে এসেছে। তার বিনিয়োগ করা টাকার বিনিময়ে জেলা বিএনপির পদে আসা নেতারা নেতৃত্বহারা হয়ে গেছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর