সেলিম ওসমান ও ভিপি বাদলের যত বাহাস


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:৪৪ পিএম, ০৪ জুলাই ২০২০, শনিবার
সেলিম ওসমান ও ভিপি বাদলের যত বাহাস

নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আলোচিতদের একজন আবু হাসনাত শহীদ বাদল। ছিলেন সরকারী তোলারাম কলেজের ভিপি। ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবলীগের সেক্রেটারী। পরে হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী। রাজনৈতিক উত্থানের ক্ষেত্রে ভূমিকা বেশী এমপি শামীম ওসমানের। কারণ তাঁরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই শামীম ওসমানের বড় ভাই সেলিম ওসমান সম্পর্কে কদাচিৎ বক্তব্য রাখছেন বাদল। আর তা নিয়েই শুরু হয়ে যায় পাল্টাপাল্টি বাহাস।

বন্দরের এমপি বিতর্ক
সবশেষ বাদলের একটি বক্তব্য নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ফরাজিকান্দা গুডলাক ক্লাবের আয়োজনে গত ২৯ জুন বৃক্ষরোপণ ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আর এই কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এক পর্যায়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল বলেন, ‘বন্দরে আওয়ামী লীগের কোনো এমপি নেই। বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রশিদ ভাই বন্দরের এমপি।’
২ জুলাই দুপুরে শহরের খানপুর এলাকায় ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধন উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমপি সেলিম ওসমান বলেন, ‘আজকে একটি পত্রিকায় দেখলাম আমার ছবি সহ একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে বন্দরের একটি ঘটনায়। তিনি চাষাঢ়া রেলওয়ে হেড কোয়ার্টারে থাকতেন। একজন এমপি সাহেবের আশীর্বাদে ওনি বলে এখন লেতা (নেতা)। ওনি নাকি এখন লেতা। এ লেতা বন্দরে গিয়ে বললো, ‘সেলিম ওসমান বন্দরের এমপি না। বন্দরের উপজেলা চেয়ারম্যান বন্দরের এমপি। প্রশ্ন থাকবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে, এমপি সিট বদলায় দিতে পারে এটি কি করে সম্ভব হতে পারে। দুই দিনের যোগি না ভাতেরে অন্য বইলেন না। আমরা দেশটা স্বাধীন করেছি। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। হাজার বার বলি সেলিম ওসমানের থাবা বাঘের চেয়েও ভয়ংকর। বাঘের চেয়েও ভয়ংকর সেলিম ওসমানের থাবা।’

তিনি বলেন, মতলব থেকে থেকে এসে নেতা হয়েছেন। ধানমন্ডিতে অট্টালিকা করেছেন। দুই নাম্বার স্কুল বানিয়েছেন। কত টাকার মালিক হয়েছেন সেলিম ওসমান দেখিয়ে দিবে। দেখবো আপনি আমাকে সরাতে পারেন কি না। ওনাকে আবার মতলব ফিরে যেতে হবে। আপনি আওয়ামী লীগ করেন যাই করেন সেটা দেখার বিষয় না।

এ সময় সেলিম ওসমান আরও বলেন, ‘আমাকে কেউ মাইরা ফেলতে পারবে না। আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় মরি নাই, পঁচাত্তরে মরি নাই, এক-এগারোতে মরি নাই আমি শহীদ না, গাজী। আমি সংসদ সদস্য না জনগণের গোলাম। জীবন যতদিন থাকবে ততদিন জনগণের গোলাম থাকবো। দেখি মতলব পার্টি আমাকে সংসদ সদস্য থেকে সরায়ে দেন। ওনাকে আবার মতলবে ফিরে যেতে হবে। উনি কত পয়সার মালিক হয়েছেন সেটা সেলিম ওসমান দেখে দিবে নে। উনি আওয়ামী লীগ করেন আর যাই করেন না কেন!’

বাদলের ভিন্নমত
সেলিম ওসমানকে নিয়ে নিজের বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে পত্রিকায় প্রচার করা হয়েছে দাবি করেছেন বাদল। একই সাথে সাংবাদিক অভিভাবকদের কাছে বিচারেরও চেয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা কেউ হয়তো নরসিংদী থেকে আসছি। কেউ আবার ফরিদপুর থেকে। একই ভাবে আমার পূর্ব পুরুষরা মতলব থেকে আসছে। এটাতো কোন বিষয় না। বিষয়টা হলো আমরা সকলেই এখন এক জায়গায়, একসাথে বসবাস করছি। পাশাপাশি রাজনীতির টিমটাও ওসমান পরিবারের। আমার রিজিক, জীবন কিংবা মৃত্যুর মালিক আল্লাহ। আমি মানুষের জন্য কাজ করছি, কাজ করে যাবো। আমার দল, বঙ্গবন্ধুর দল। এই দল স্বাধীনতা পূর্ববর্তী থেকেই দেশের মানুষের ধারক-বাহক। আমি সেই দলের নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক। যতক্ষন পর্যন্ত নেত্রী আমাকে ক্ষমতা দিয়েছেন। আমি এই দলটার ভাবমূর্তী রক্ষায় অনর-অটল থাকবো। যে কেউ, যে কোন কথা বলুক না কেন? আমি কারো কথায় ভীত নয়। আমার দলের নেতাকর্মীদের আমি আদর করে কত কথাই বলি। তাছাড়া আমার দলের নেতাকর্মীরা এমপি, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ অনেক কিছুই হওয়ার মতো যোগ্যতা রাখে।

ভিপি বাদল আরও বলেন, ‘সেলিম ভাই সম্মানিত লোক। তাকে আমি এ ধরণের কথা কি ভাবে বলবো। উনারা দুই ভাই আট-দশটা মন্ত্রীর চেয়েও বেশি ক্ষমতা রাখেন। নারায়ণগঞ্জের জন্যও অনেক কিছু করেছেন। সেলিম ভাই মহাজোটের নেতা। মহাজোট থেকে তাকে প্রার্থীতা দিয়েছে। একই সাথে তিনি আমাদের অভিভাবকও। এটাকে ভায়লেট করার দুঃসাহস কার হতে পারে? আমি উনাকে নিয়ে এই ধরণের কোন বক্তব্য রাখিনি। আমার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে পত্রিকায় প্রচার করা হয়েছে। এ ধরণের কর্মকান্ডের জন্য আমি হলুদ সাংবাদিকদের প্রতি নিন্দা জানাই। একই সাথে আমাদের সাংবাদিক অভিভাবকদের কাছে বিচারেরও দাবি করছি।’

সেই বাহাস
২০১৮ সালটি ছিল নির্বাচনের বছর। ওই বছরের ১৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সকলের সাথে সুর মিলিয়ে আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদল নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে নৌকার প্রার্থী দাবি করে বলেন, ‘কোন গার্মেন্টে বসে আর কাউকে লাঙলের প্রার্থী দেওয়া যাবে না। নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনেই নৌকার প্রার্থী দিতে হবে।’

পরদিন প্রতিক্রিয়ায় সেলিম ওসমান শহীদ বাদলকে ¯েœহের বাদল উল্লেখ করে বলেন, আমার দাদা খান সাহেব ওসমান আলী প্রায়শই একটি কথা বলতেন। আমার দাদার সেই কথাটিই বলছি ‘আগের দিন আর নাইরে নাতি, খাবলাইয়া খাবলাইয়া খাতি’। ২০১৪ সালের ২৬ জুন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে আমার উপনির্বাচনের সময় বাদল অনেক পরিশ্রম করেছিল। তিনিও দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সাথে থেকে তাঁর কাছ থেকে উন্নয়নের রাজনীতি শিখতে পারেনি। তিনি দলে বিভেদ সৃষ্টি করার রাজনীতি শিখেছেন। আমি মনে করি বাদলকে উন্নয়নের রাজনীতি শিখতে হলে আগে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জ কলেজের তহবিলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া দরকার। যে প্রতিষ্ঠানটিতে উনি দীর্ঘ সময় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। উনি সরকারী তোলারাম কলেজের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উইজডম অ্যাটায়ার্স লিমিটেডে আমার ছোট ভাই শামীম ওসমানের থেকেও ভিপি বাদলের যাতায়াত বেশি ছিল। উইজডমে বসে রাজনৈতিক কার্যক্রম করা যাবে না সংবিধানে এমন কোন নিষেধাজ্ঞা নাই। নারায়ণগঞ্জ জাতীয় পার্টির কোন দলীয় কার্যালয় নাই। তাই উইজডম অ্যাটায়ার্স সবার জন্য উন্মুক্ত। আমি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য হয়েও শহরে কোথাও জমি দখল করে জাতীয় পার্টির কার্যালয় বানাই নাই। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগের জন্মস্থান। আমার পৈত্রিক নিবাস বাইতুল আমানে আওয়ামীলীগের জন্ম। আওয়ামীলীগ এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের রক্তে প্রবাহিত। যে কারণে আমি নিজেও বলেছি নারায়ণগঞ্জে ৫টি আসনেই নৌকার প্রার্থী চাই। তারপরেও আমি তাদের দলীয় কোন্দল থামতে দেখি নাই। নিজেরা একে অপরের গীবত নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমি তাঁর কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই মার্কাটা বড় কথা নাকি নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন হওয়াটা বড় কথা? দীর্ঘ দিন আওয়ামীলীগের রাজনীতি করে শহরে রেলওয়ের জমি দখল করে আওয়ামীলীগ অফিস বানিয়ে পরসমালোচনা করে মানুষকে বিভ্রান্তি করার কোন কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। ¯েœহের বাদলের কাছে অনুরোধ রইলো আপনি নারায়ণগঞ্জ কলেজে সভাপতি থাকালীন কলেজের ফান্ডের অবস্থা এবং বর্তামনে কলেজ ফান্ডের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানুন। তাহলে অন্তত উন্নয়ন কাকে বলে বুঝতে পারবেন। অন্যথায় নারায়ণগঞ্জের মানুষ বুঝবে রূপগঞ্জ আর মতলবীরা কখনোই নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নের কথা ভাবতে পারেন না। নারায়ণগঞ্জে রাজনীতি করতে হলে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন নিয়ে ভাবতে হবে। তাই পরিশেষে বলবো নির্বাচনে মার্কা নৌকা বা লাঙ্গল না ভেবে উন্নয়ন নিয়ে ভাবুন। আওয়ামীলীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত বিচক্ষন। সময় হলে উনিই সিদ্ধান্ত দিবেন।’

তবে পরেই আবার বক্তব্য থেকে সরে আসেন বাদল। তিনি সেলিম ওসমানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সেলিম ওসমান দানশীল মানুষ। আমি তাকে শ্রদ্ধা করি। তিনি আমাকে উপদেশ দিতে পারেন। সেলিম ওসমান জাতীয় পার্টির এমপি হিসেবে লাঙল প্রতিক চাইতে পারেন। এই লাঙ্গল প্রতিক তার গার্মেন্টেসে বসে চাইবেন না অন্য কোথাও বসে চাইবেন এটা তার ব্যাপার। সেলিম ওসমান বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিচক্ষণ ব্যক্তি, সময়মতো তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত দিবেন। এজন্য সেলিম ওসমানকে আমাদের অভিনন্দন জানানো উচিত।

তিনি আরো বলেন, অনেক পাগল-ছাগল আছে যারা আজে বাজে কথা বলে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করতে চাই। আপনারা এসব গুজবে কান দিবেন না। আমি সবসময় আওয়ালীগের সাথে আছি জীবনের শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত আওয়ামীলীগের সাথে থাকবো। পিঠ ফেরানোর কোনো প্রশ্নই আসে না। আমার বন্ধু শামীম ওসমানের সাথে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করে এসেছি। তিনি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ছিল। আমি তার জায়গায় দায়িত্ব পালন করছি। প্রয়াত নাসিম ওসমানকে অনেক সম্মান করি। যিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর প্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

নারায়ণগঞ্জ কলেজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শ্রদ্বেয় নাসিম ওসমান আমাকে নারায়ণগঞ্জ কলেজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আমি নারায়ণগঞ্জ কলেজের দায়িত্ব ছেড়ে আসার সময় ১০ কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিট এবং ৩ কোটি টাকা কলেজের ফান্ডে রেখে আসছিলাম। আমার সময় তিনবার নারায়ণগঞ্জ কলেজ শ্রেষ্ঠ হয়েছিল। সেলিম ওসমান এমপি, আর একজন এমপি কলেজের দায়িত্ব নিলে কলেজের ফান্ড বড় হতেই পারে এটাই স্বাভাবিক।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর