ভিপি বাদল একা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৭:৪৮ পিএম, ০৯ জুলাই ২০২০, বৃহস্পতিবার
ভিপি বাদল একা

বর্তমান সময়ে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আলোচিত বিষয় হিসেবে পরিণত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল। তার একটি বিস্ফোরক মন্তব্যে পুরো জেলাজুড়েই তিনি সমালোচনার পাত্র হিসেবে পরিণত হয়েছেন। যদিও এর আগে অনেকবার নানা বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তবে সেকল মন্তব্য পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও এবার আর আবু হাসনাত শহীদ বাদলকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার পাশে জেলা আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকে পাচ্ছেন না। বরং সকলেই তার বিরুদ্ধে একের পর এক মন্তব্য করে যাচ্ছেন। সেই সাথে বেরিয়ে আসছে বাদলের অজানা যত কাহিনী।

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই এঁেকবেঁকে চলার চেষ্টা করছেন আবু হাসনাত শহীদ বাদল। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নিজেকে আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। আর এই প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে প্রায় সময়ই নানা বিস্ফোরক মন্তব্য ছুড়ছেন। যা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী রাজনীতিতে নানা আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়। আর এই মন্তব্যের করার ক্ষেত্রে যাদের হাত ধরে তিনি নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তাদেরকেও তিনি ছাড়ছেন না। ফলে তাকে বারবার বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

তারই ধারাবাহিকতায় সবশেষ বাদলের একটি বক্তব্য নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ফরাজিকান্দা গুডলাক ক্লাবের আয়োজনে গত ২৯ জুন বৃক্ষরোপণ ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আর এই কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এক পর্যায়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল বলেন, ‘বন্দরে আওয়ামী লীগের কোনো এমপি নেই। বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রশিদ ভাই বন্দরের এমপি।’

আর এর জবাব দিতে গিয়ে সেলিম ওসমানও বাদলকে ছাড় দিয়ে কথা বলেননি। গত ২ জুলাই দুপুরে শহরের খানপুর এলাকায় ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধন উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমপি সেলিম ওসমান বলেন, ‘আজকে একটি পত্রিকায় দেখলাম আমার ছবি সহ একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে বন্দরের একটি ঘটনায়। তিনি চাষাঢ়া রেলওয়ে হেড কোয়ার্টারে থাকতেন। একজন এমপি সাহেবের আশীর্বাদে ওনি বলে এখন লেতা (নেতা)। ওনি নাকি এখন লেতা। এ লেতা বন্দরে গিয়ে বললো, ‘সেলিম ওসমান বন্দরের এমপি না। বন্দরের উপজেলা চেয়ারম্যান বন্দরের এমপি। প্রশ্ন থাকবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে, এমপি সিট বদলায় দিতে পারে এটি কি করে সম্ভব হতে পারে। দুই দিনের যোগি না ভাতেরে অন্য বইলেন না। আমরা দেশটা স্বাধীন করেছি। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। হাজার বার বলি সেলিম ওসমানের থাবা বাঘের চেয়েও ভয়ংকর। বাঘের চেয়েও ভয়ংকর সেলিম ওসমানের থাবা।’

সেলিম ওসমানের এই বক্তব্যের পরপরই বাদলের নানা অজানা কাহিনীও বেড়িয়ে আসতে শুরু করে। এরই মধ্যে বাদল সেলিম ওসমানের মৃত্যু কামনা করেছেন বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। আর এ বিষয়টি নিয়ে বাদলকে আরও বেশি বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।

এ নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি আরজু রহমান ভূইয়া ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যমকে বলেছেন, বাদল হচ্ছে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল মার্কা নেতা। সে তার স্বার্থের জন্য সবকিছু করতে পারে। একজন মানুষের মৃত্যু কামনা করা কোনো ভাল মানুষে পর্যায়ে পড়ে না। সেলিম ওসমানের বক্তব্য অনুযায়ী তার বাড়ী যেমন মতলব তেমনি তার কাজও মতলববাজ।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা ছিল সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটি ঘোষণা এবং কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের সাথে ঘনিষ্ঠতা। আর এই দুই ঘটনাতেই সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল নেপথ্যে থেকে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ ছিল।

জানা যায়, সোনারাগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির অনুমোদন দেন জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল। কমিটিতে সামসুল ইসলাম ভূইয়াকে আহবায়ক এবং সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমানকে যুগ্ম আহবায়ক করা হয়েছে। আর এই কমিটির ঘোষণা পরপরই নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়ে যায়। জেলা আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতারা সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগে সভাপতি আব্দুল ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদলের সিদ্ধান্তের প্রতি অনাস্থা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগে অভিযোগ করেন জেলা আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারা।

এই ঘটনার আড়াল হতে না হতেই নতুন করে বিতর্কের জন্ম নেয় রাজধানী ঢাকার নিকেতন থেকে গ্রেফতারকৃত যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের সাথে আব্দুল হাই ও আবু হাসনাত শহীদ বাদলের ঘনিষ্ঠতা। আর এই সম্পর্কের বিষয়টিকে তারা অস্বীকার করলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঠিকই তাদের ছবি প্রকাশিত হয়েছে। যা তাদের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় কমিটিতে রাখার জন্য এই জি কে শামীমের নামই প্রস্তাব করা হয়েছিল। আর এই নাম প্রস্তাব করেছিলেন সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল। জেলা আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারাও নাম প্রস্তাবের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

ওই সময়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছিলেন, ‘জিকে শামীমকে আমরা চিনি না। অথচ তাকে জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি করতে প্রস্তাব দেন সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল। তখন আমরা এ নিয়ে বিরোধীতা করেছিলাম। স্পষ্ট বলেছিলাম রাজনীতিতে সক্রিয় ও সকলে চিনে এমন কাউকেই অন্তর্ভুক্ত করতে। টাকার বিনিময়ে জিকে শামীমকে কমিটিতে ঢুকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।’

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেছিলেন, ‘সহ সভাপতি হিসেবে জিকে শামীমের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। তাকে আমরা কেউ চিনি না। এ নিয়ে তখন তর্ক হয়েছিল। বাদল তার নাম বলেছিল। তখন তাকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি।’

এভাবে একের পর এক ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। আর তার পক্ষে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কোনো নেতা এগিয়ে আসছেন না। তার ঘনিষ্ট বন্ধু নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান যার হাত ধরে বাদল নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তিনিও কোনো বিবৃতি দিচ্ছেন না। ফলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল দিন দিন একা হয়ে যাচ্ছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর