rabbhaban

১৭ রোজা : বদর প্রান্তরে ইসলামের বিজয়ের প্রথম সূর্যোদয়


সিটি করেসপন্ডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:৩৯ পিএম, ২২ মে ২০১৯, বুধবার
১৭ রোজা : বদর  প্রান্তরে ইসলামের বিজয়ের প্রথম সূর্যোদয়

১৭ রমজান। মাহে রমজানের অপরাপর মোবারক দিনের ঊর্ধ্বে ইসলামের ইতিহাসে এ দিনটি অবিস্মরণীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। রমজানের রোজা ফরজ হয়েছে হিজরতের দ্বিতীয় বছর থেকে। অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরি সনে। আর সে বছরই রমজান মাসের ১৭ তারিখে সংঘটিত হয়েছে ইসলামের প্রথম সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী যুদ্ধ, ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার প্রথম-রক্তঝরা মহাসংপ্রাম : জঙ্গে বদর, গজওয়ায়ে বদর বা বদরের যুদ্ধ।

মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) নবুয়ত প্রাপ্তির পর দীর্ঘ ১৩ বছর অতিবাহিত করেন মক্কা মোকাররমায়। এরপর তিনি আল্লাহর হুকুমে মক্কায় বসবাসরত সাহাবিদের নিয়ে পর্যায়ক্রমে মদিনায় হিজরত করেন। হিজরতের দ্বিতীয় বছরেই নবী (সা.)-এর নেতৃত্বে গঠিত মদিনা রাষ্ট্রটি মক্কার কাফির শক্তির পক্ষ থেকে হুমকির মুখোমুখি হয়।

সিরিয়া থেকে ফেরার পথে মক্কার কাফিরদের একটি বাণিজ্য কাফেলা মুসলিম শক্তির প্রতিরোধের মুখে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে মক্কা থেকে এক হাজার কাফির সেনার একটি সশস্ত্র দল মদিনা থেকে ৮০ মাইল দূরে অবস্থিত `বদর` ময়দানে এসে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করে। এ অবস্থায় মাত্র ৩১৩ জন সাহাবিকে নিয়ে বদর ময়দানের আরেক পাশে উপস্থিত হন শান্তি ও মানবতার নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)। ইমানি শক্তিতে বলীয়ান স্বল্প সংখ্যক সাহাবিদের নিয়ে কাফিরদের বিশাল বহরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা সেদিন মুমিন যোদ্ধাদের সহায়তা করেছিলেন। কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে ‘আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন। অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। আল্লাহকে ভয় কর, কৃতজ্ঞ হও (আলে ইমরান: ১২২)। আর বিজয়ের জন্য আল্লাহ তায়ালার শর্ত হচ্ছে, ‘তোমরা হতোদ্যম হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা সত্যিকার অর্থে মুমিন হয়ে থাক।’ (সূরা আলে ইমরান-৩/১৩৯) আল্লাহর রাসূল (সা.) এ দুটো শর্ত পূরণ করেই রমজান মাসে বদর ও মক্কা বিজয় করেছিলেন।

ধর্মগ্রন্থসমূহে বর্ণিত আছে, দ্বিতীয় হিজরীর শা`বান মাসে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে ৩৫-৪০ জনের একটি বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে ফেরার পথে আশঙ্কা পোষণ করল যে, মদিনার মুসলমানগণ তাদের ওপর আক্রমণ করতে পারে। কারণ দুটো- প্রথমত প্রতিশোধ গ্রহণ, দ্বিতীয়ত তাদের সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার আশরাফী মূল্যের ধন-সম্পদ লুট করে নেয়া। এমন আশঙ্কা থেকে আবু সুফিয়ান তার কাফেলার একজনকে তাদের সাহায্যের জন্য মক্কায় পাঠিয়ে দেয়। মক্কার কাফিরগণ তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ভেবে আবু সুফিয়ানের ডাকে সাড়া দিয়ে কুরাইশ সর্দারদের নেতৃত্বে ১ হাজার সশস্ত্র যোদ্ধার বিরাট বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমণে রওনা করে। রাসূল (সা.) যথাসময়ে ব্যাপারটি জানতে পেরে কুরাইশদের মোকাবেলায় নিজেদের ও ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষায় সব মুসলমানকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বললেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, প্রথমত মুসলমানদের জীবন-মরণ ও ইসলামের অস্তিত্বের লড়াই। এ লড়াইয়ে হেরে গেলে ইসলামের আওয়াজ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে আর মুসলমানের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।

রাসূল (সা.) আনসার ও মুহাজির সবাইকে ডাকলেন এবং বিষয়টি খোলামেলা সবার সঙ্গে আলাপ করলেন, কাফিরদের অবস্থানও বর্ণনা করলেন। কাফিরদের বাণিজ্য কাফেলা ছিল মদিনার উত্তর প্রান্তে আর দক্ষিণ দিকে ছিল কুরাইশ সৈন্য দল। রাসূল (সা.) আরো বললেন যে, আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করছেন, ‘এর যে কোনো একটি তোমরা লাভ করতে পারবে।’ (সূরা আনফাল-৮/৭) বলো এখন তোমরা কোনটি চাও? সাহাবাদের মধ্যে ভিন্ন মতামত আসলে রাসূল (সা.) পুনরায় একই প্রশ্ন করলে হযরত মিকদাদ বিন আমর (রা) দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আল্লাহ আপনাকে যে দিকে নির্দেশ দেন সে দিকেই চলুন।

রাসূল (সা.) আনসারদের নীরব থাকতে দেখে তিনি আনসারদের সরাসরি সম্বোধন করে আবারো প্রশ্নটি করলেন। এবার সা`দ বিন মা`আয (রা) দাঁড়িয়ে বললেন, `হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আমরা আপনার প্রতি ইমান এনেছি, আপনাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি, আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা সবই সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছি, সর্বোপরি আপনার আনুগত্যের শপথ নিয়েছি। অতএব, আপনি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাই কার্যে পরিণত করুন। সে মহান সত্তার শপথ আপনি যদি আমাদের নিয়ে সমুদ্রে গিয়েও ঝাঁপ দেন, তবু আমরা আপনার সঙ্গে থাকব এবং এ ব্যাপারে একটি লোকও পিছিয়ে যাবে না। আমরা শপথ নিয়েছি যুদ্ধকালে তা আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। আমরা যে কোনো মূল্যে শত্রুর মোকাবেলা করব। আর আল্লাহ আপনাকে এমন জিনিস দেখাবেন, যা দেখে আপনার চক্ষু শীতল হয়ে যাবে। অতএব, আপনি আল্লাহর রহমত ও বরকতের ওপর ভরসা করে আমাদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলুন।

এবার সিদ্ধান্ত হলো বাণিজ্য কাফেলার পরিবর্তে কুরাইশ সৈন্যদের মোকাবেলা করা হবে। মুসলমানদের রসদ ও যুদ্ধ-সম্ভারের দৈন্যদশা আর অপ্রতুল লোকবল সত্ত্বেও আল্লাহর ওপর ভরসা করে দ্বিতীয় হিজরির ১২ রমজান (৬২৩ খিস্টাব্দের ২৫ ফেব্রুয়ারি) মাত্র তিনশত তেরজন মুজাহিদের একটি ছোট্ট কাফেলা রাসূল (সা.)-এর নেতৃত্বে মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করে সোজা দক্ষিণ-পশ্চিমে যেদিক থেকে কুরাইশ বাহিনী আসছিল সেদিকেই পা বাড়ালেন। ১৬ রমজান তারা বদর প্রান্তরে পৌঁছলেন। স্থানটি মদিনা থেকে ৮০ মাইল দূরে অবস্থিত। ইতোমধ্যে কুরাইশ বাহিনীও বদর প্রান্তরের ওপারে এসে পৌঁছেছে। রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে সেখানেই তাঁবু ফেলা হলো।

কুরাইশ বাহিনীর ১ হাজারেরও বেশি সুসজ্জিত যোদ্ধা, ১শ` সর্দার, ৩শ` ঘোড়া ও পর্যাপ্ত রসদসহ উৎবা বিন রাবিয়া অথবা আবু জাহল ছিল প্রধান সেনাপতি। মুসলমানগণ যখন বদরে পৌঁছল তখন কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলা তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে গেল। জাহরা ও আদী গোত্রের সর্দাররা বললো আমাদের আর যুদ্ধ প্রয়োজন নেই, আবু জাহলের স্বীকৃতি ব্যতীত তারা মক্কা ফিরে গেল। কাফেলার বাকি সব লোক বদরের দিকে অগ্রসর হলো। বদর প্রান্তরের যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত স্থানটি ছিলো কুরাইশদের দখলে। অপরদিকে মুসলমানদের অংশ ছিল লবণাক্ত, সেখানে মুজাহিদদের পা মাটিতে দেবে যাচ্ছিল। এমনি অবস্থায় সবাই রাতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। রাসূল (সা.) সারারাত ইবাদত করে কাটিয়ে দিলেন। ১৭ রমজান ফজরের সময় রাসূল (সা.) জিহাদ সম্পর্কে উদ্দীপ্ত ভাষণ দিলেন এবং যুদ্ধের জন্য সৈনিকদের শ্রেণিবিন্যাস করলেন। এ বছরই সবেমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশনা এসেছিল, `হে ইমানের দাবিদারগণ, তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হলো যেমনি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীগণের ওপর। আশা করা যায়, এতে করে তোমরা তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করতে পারবে` (সূরা বাকারা-২/১৮৩)।

আল্লাহ তায়ালা এ নির্দেশনার পর আবার অপ্রতুল জনশক্তি আর আর্থিক দৈন্যদশা নিয়ে বিশাল ও সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনীর মোকাবেলায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া এ এক কঠিন পরীক্ষা। আল্লাহর মেহেরবানীতে মুসলমানগণ প্রশান্তি ও সুনিদ্রায় রাত কাটালেন এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক হিম্মত বেড়ে গেল, দ্বিতীয়ত পরের রাতে প্রচুর বৃষ্টি হলে লবণাক্ত জমি শক্ত হয়ে মুসলমানদের পক্ষে ময়দান উপযোগী হয়ে গেল, তাদের অযু- গোসলের জন্য নিম্নভূমিতে পানি জমা হয়ে গেল। পক্ষান্তরে কুরাইশদের নিম্নভূমি প্লাবিত হয়ে কর্দমাক্ত হয়ে গেল, তাতে তাদের পা কাদামাটিতে দেবে যেতে লাগল। যার ফলে মুসলমানদের মন থেকে ভয় কেটে গেল, তারা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্তে শত্রুর মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিলেন।

এমনি অবস্থায় কাফির সেনা ও মুজাহিদগণ মুখোমুখি দাঁড়ালে এক অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হলো। কাফিরদের এক-তৃতীয়াংশ মুজাহিদকে আল্লাহ তায়ালা শত্রু সৈন্যের সামনে হাজার হাজার হিসেবে দেখালেন। মনে হচ্ছিল, যেন আল্লাহ তায়ালা নিজেই যুদ্ধে সেনাপতিত্ব করছেন।

যুদ্ধে কঠিন পরীক্ষায় পড়েছিল মুহাজিরগণ। তাদের প্রতিপক্ষ আপন পিতা-ভাই, আত্মীয়-স্বজন। যাদের নিজ হাতে হত্যা করতে হয়েছিলো। তবে আনসারদের পরীক্ষাও কম ছিল না। মক্কার কাফিরদের দৃষ্টিতে তাদের অপরাধ ছিল তারা মুসলমানদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে কুরাইশরা পরাজিত হয়। তাদের ৭০ জন ব্যক্তি নিহত ও ৭০ জন বন্দি হয়, তাদের মধ্যে রাসূল (সা.)-এর ছোট চাচা আব্বাস (রা)ও ছিলেন, যিনি পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। যুদ্ধ বন্দিদের খুবই মামুলি শর্তে মুক্তি দেয়া হয়।

শত্রুর হক সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ, তোমরা আল্লাহর পথে সেসব লোকদের সঙ্গে লড়াই কর, যারা তোমাদের সঙ্গে লড়াই করে, কোনো অবস্থায়ই সীমালঙ্ঘন করো না।` (সূরা বাকারা-২/১৯০) শত্রুপক্ষ আক্রমণ করলে প্রতিরোধ করা যাবে` (সূরা বাকারা-২/১৯১)। শত্রু আশ্রয় চাইলে আশ্রয় ও নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছে দেবে।` (সূরা তওবাহ-৯/৬) আর মুসলমানদের মধ্য থেকে ৮ জন আনসারসহ মোট ১৪ জন মুজাহিদ শাহাদাতবরণ করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও কোনো যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের মধ্যে এতো কম ক্ষয়ক্ষতির নজির নেই। রমজান মাসে সংঘটিত যুদ্ধে মুসলমানগণ রমজান মাসের সিয়ামের ব্যাপারে যেমন আল্লাহকে ভয় করে সিয়াম পালন করেছিল, ঠিক তেমনি যুদ্ধের ময়দানেও আল্লাহর হুকুম মেনে যুদ্ধ করার কারণে অল্প ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয় এসেছিল।

বদর যুদ্ধের বিজয় আমাদের এ শিক্ষাই দিচ্ছে, বাতিল যত শক্তিশালী হোক না কেন আমরা যদি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহর হুকুম মেনে, ঐক্যবদ্ধভাবে বাতিলের সামনে রুখে দাঁড়াই তাহলে পৃথিবীর যে কোনো অপশক্তিই ইমানদারদের কাছে পরাজিত হতে বাধ্য। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, `তোমরা হতোদ্যম হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা সত্যিকার অর্থে ইমানদার হয়ে থাক।` (সূরা আলে ইমরান-৩/১৩৯)।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর