১৪ রোজা : ইসলামে যৌতুক গ্রহণ হারাম


সিটি করেসপন্ডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:০০ পিএম, ০৭ মে ২০২০, বৃহস্পতিবার
১৪ রোজা : ইসলামে যৌতুক গ্রহণ হারাম

ইসলামে শর্ত আরোপ করে যৌতুক গ্রহণ সম্পূর্ণরূপে হারাম বা নিষিদ্ধ। শরিয়তের বিধানে বিয়ের শর্ত হিসেবে যৌতুক আদায় করা শুধু নাজায়েজই নয়, বরং সুস্পষ্ট জুলুম হিসেবে গণ্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।` (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-১৮৮)। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, `কারো সম্পদ হালাল হয় না, যতক্ষণ না সে সন্তুষ্টচিত্তে তা প্রদান করে।`

অন্যায়ভাবে বা যা ন্যায্যপ্রাপ্য নয়, তা কোনোভাবেই গ্রহণ বা দাবি করা যাবে না উল্লেখ করে হাদিসে বলা হয়েছে, যদি কেউ তা জোরপূর্বক আদায় করে, তাহলে তার শাস্তি ভয়াবহ। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যে কেউ সীমা লঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে তা করবে, তাকে অগ্নিতে দগ্ধ করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত-৩০)। ধর্মীয় নীতিমালায় যৌতুকের আদৌ কোনো স্থান নেই। ইসলাম বিয়ের মধ্যে লেনদেনের যে বিধান দিয়েছে, বর্তমান যৌতুক প্রথা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। বৈবাহিক বিষয়ে লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা হলো, স্বামীরাই স্ত্রীকে কিছু অর্থ-সম্পদ ফরজ তথা আবশ্যিকভাবে প্রদান করবে। বিয়েকে বৈধ করার জন্য দেনমোহর অন্যতম মাধ্যম। ইসলামে বিবাহবন্ধনে মোহরানার গুরুত্ব অত্যধিক। এটি ইসলামের আবির্ভাব থেকেই মুসলিম সমাজে কড়াকড়িভাবে আরোপিত। মোহরানা কন্যার ন্যায্য প্রাপ্য অধিকার। বিয়ে উপলক্ষে নারীকে সন্তুষ্টচিত্তে তার মোহর প্রদানের তাগিদ দিয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, `আর তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রদান করবে।` (সূরা আন-নিসা, আয়াত-৪)

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মুহাররামাত ব্যতীত তোমাদের জন্য সব নারীকে হালাল করা হয়েছে। শর্ত হচ্ছে, তোমরা তোমাদের অর্থের বিনিময়ে বিয়ের উদ্দেশ্যে তাদেরকে সন্ধান করো; ব্যভিচারের উদ্দেশ্যে নয়। (সূরা আন-নিসা, আয়াতথ ২৪)। শরিয়তের দৃষ্টিতে মোহর প্রদান স্বামীর অন্যতম দায়িত্ব; এবং তা স্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। এভাবে বিয়ের মাধ্যমে নারী তথা স্ত্রীর যাবতীয় ব্যয়ভার স্বামীকেই বহন করতে হয়। সুতরাং বিবাহসংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনে পুরুষের কোনোভাবেই লাভবান হওয়ার সুযোগ নেই। যৌতুকের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, `যে ব্যক্তি সম্মান লাভের জন্য কোনো নারীকে বিয়ে করে, আল্লাহ তার লাঞ্ছনা বৃদ্ধি করে দেন। যে তাকে সম্পদ লাভের আশায় বিয়ে করে, আল্লাহ তার দারিদ্র্য বৃদ্ধি করে দেন। আর যে তাকে বংশ গৌরব লাভের আশায় বিয়ে করে, আল্লাহ তার অমর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আর যে তাকে দৃষ্টি অবনত রাখতে পুণ্য অথবা অশ্লীলতা থেকে নিজেকে পবিত্র রাখার জন্য বিয়ে করে অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য বিয়ে করে, আল্লাহ তাকে ওই স্ত্রীর মাধ্যমে বরকত দান করবেন; এবং স্ত্রীর জন্যও তাকে বরকতময় করে দেবেন।’

রাসূলুল্লাহ (সা.) নারীর অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করে বলেন, ‘তোমরা নারীদের মোহরানার হক আদায়ের মাধ্যমে জীবনসঙ্গিনীকে হালাল কর।’

মহানবী (সা.) সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, `কোনো মানুষের জন্য তার ভাইয়ের সম্পদ তার সন্তুষ্টি ব্যতিরেকে ভোগ করা বৈধ নয়।` ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, সুখময় জীবন গঠনের প্রথম ধাপ হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন।

রাসূল (স.) বলেন, যে ব্যক্তি বিয়ে করল, তার অর্ধেক ঈমান পূর্ণ হয়ে গেল। সে যেন বাকি অর্ধেকের (ইমান) ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করে। (মিশকাত শরীফ, খ--২, পৃষ্ঠা-২৬৪)। এদিকে, হাদিয়া, উপহার, সালামি কিংবা বখশিশের নামে যৌতুক আদায়কারীদের হুশিয়ার করে দিয়ে নবী করিম (সা.) বলেন, `কন্যার অভিভাবক বা আত্মীয়-স্বজন যদি স্বেচ্ছায় এবং সম্পূর্ণ চাপমুক্ত থেকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু প্রদান করে, তাহলে সেটাই শুধু হাদিয়া, উপহার বা বখশিশ হিসেবে গণ্য হবে। অন্যথায় তা যৌতুক তথা হারামের অন্তর্ভুক্তই থেকে যাবে।`

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে উপহার খুশিমনে দেয়া হয়, সেটাই শুধু বৈধ।` (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নাম্বার-২০৭১৪; বায়হাকি, হাদিস নাম্বার-১১৮৭৭)

হাদিসে এসেছে, বিয়ে যেহেতু সবার জন্য অত্যাবশ্যক, তাই মহান রাব্বুল আলামিন অতি সহজে বিয়ে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিয়ের মধ্যে ব্যয়বহুল এবং অতিরিক্ত আড়ম্বরকে নিষেধ করা হয়েছে। এজন্যই নবী মুহাম্মাদ (সা.) নিজ কন্যা হজরত ফাতিমা (রা.)-এর বিয়ের অনুষ্ঠান অত্যন্ত সাধাসিধাভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। ফাতিমা (রা.)-কে বিয়ে করার জন্য প্রথমে হজরত আবু বকর (রা.) রাসূল (সা.)-এর কাছে প্রস্তাব পাঠান। তারপর হজরত উমর (রা.) ফাতিমাকে বিয়ে করার জন্য মহানবী (সা.)-এর কাছে প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু রাসূল (সা.) তাদের উভয়কে ফাতিমা (রা.)-এর বয়স কম বলে ফিরিয়ে দেন। পরবর্তীকালে হজরত আলী (রা.) ফাতিমা (রা.)-কে বিয়ে করার জন্য রাসূল (সা.)-এর কাছে প্রস্তাব পাঠালে তৎক্ষণাৎ হজরত জিব্রাইল (আ.) রাসূল (সা.)-এর নিকট ওহী নিয়ে আসেন। ওহী পেয়ে রাসূল (সা.) আলী (রা.)-এর প্রস্তাব কবুল করেন এবং ফাতিমা (রা.)-এর সঙ্গে তার বিয়ের ব্যবস্থা করেন। তখন হজরত আলী (রা.)-এর বয়স ছিল ২১ বছর এবং ফাতিমা (রা.)-এর বয়স ছিল ১৫ বছর। রাসূল (সা.) তৎক্ষণাৎ সাহাবাদের ডেকে নিজেই খুতবা পড়ে বিয়ে পড়িয়ে দিলেন এবং উপস্থিত মেহমানদের মাঝে খুরমা ও খেজুর বণ্টন করলেন। তার বিয়েতে মোহর ধার্য করলেন মাত্র ৪০০ মিছকাল (১০ দিরহাম)। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, `সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে হচ্ছে সুন্নতি বিয়ে, অর্থাৎ যে বিয়েতে খরচ কম হয় এবং কোনো জাঁকজমক থাকে না।` (মিশকাত শরিফ)

হজরত উমর (রা.) বলেন, `হে মুসলমান সম্প্রদায়! তোমরা বিয়ে-শাদিতে মোটা অঙ্কের মোহর, জাঁকজমক এবং যৌতুক দাবি করো না। কেননা, আল্লাহর কাছে এর কোনো মর্যাদা নেই। যদি থাকত, তাহলে রাসূল (সা.) তার মেয়ে ফাতিমা (রা.)-এর বিয়েতে তা করতেন। (তিরমিযি শরিফ)।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর