পরপারে স্ত্রী ও দাফন নিয়ে নকশা স্বত্ত্বাধিকারীর আবেগঘন স্ট্যাটাস


সিটি করেসপন্ডেন্ট | প্রকাশিত: ০৪:২১ পিএম, ১১ জুন ২০১৯, মঙ্গলবার
পরপারে স্ত্রী ও দাফন নিয়ে নকশা স্বত্ত্বাধিকারীর আবেগঘন স্ট্যাটাস

আমার স্ত্রী সামসী আরা আলীম সীমা (১৯৬৫ খ্রী: ২৮ জুলাই-২০১৯ খ্রী: ১০ জুন) এখন থেকে কয়েক ঘণ্টা পূর্বে ঠিক সকাল সাড়ে এগারোটায় মৃত্যু বরণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন কর্কট রোগে ভুগছিলেন। ২০১৭ সনের ৩জুন রোগটি সনাক্ত হওয়ার পর প্রথমে কেমোথেরাপি,সার্জারি, রেডিওথেরাপি এরপর ওরাল কেমেথেরাপি সাথে সাথে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধক বা শক্তিবর্ধক ফলাফলাদির জুস খেয়ে বা সব সয়ে তিনি বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিলেন।

তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় এবং কর্কট রোগের ভয়াবহ যন্ত্রণা থেকে আরাম পেতে যাঁরা আমাদের বিরামহীন সহযোগিতা করেছেন- তাঁরা হলেন, ডা. একেএম শফিউল আলম, ডা. অনুপ কুমার, ডা. শাহাব আহমেদ, ডা. মোয়ারফ হোসেন, ডা. মফিজুর রহমান, ডা. রোবানা সাবরিন, ডা. আজিজুর রহমান, ডা. পুলক ধর, ডা. খোকন, ডা. মাহবুব হোসেন। আরও অনেক চিকিৎসক আছেন যাঁদের নাম ঠিক এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না(প্রফেসর ডা. আনোয়ার হোসাইন)(ডা. মিঠুন মল্লিক)।

যেমন সার্জারি করেছেন যিনি জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এর তদকালীন বিভাগীয় প্রধান বাহিরে রাগী ভিতরে কোমল সেই স্যারের নাম আমার মনে পড়ছে না। তাঁর সাথে যিনি সহযোগিতা করেছেন এবং আমাকে মানসিক সাপোর্ট দিয়েছেন যে চিকিৎসক তাঁর নামও মনে পড়ছে না। কিন্তু গত দুই বছর পাঁচদিনের প্রতিটি ক্ষণের ঘটনাগুলো আমার অন্তরে গাঁথা রয়েছে। যেদিন সীমা হাসপাতালে ভর্তি হয় ঠিক তার দু-একদিন পর তদকালীন স্বাস্থ যুগ্ম সচিব হাসপাতালে সীমাকে দেখতে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট আমাদের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

ঠিক তেমনি সার্জারির দিন সিনিয়র কনসালটেন্ট নারায়ণগঞ্জ খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালের ডা. একেএম শফিউল আলম, আমার প্রিয় ফেরদৌস ভাই তিনি তাঁর কঠিন ব্যস্ততার মধ্যে থেকেও অপারেশনে দিন এবং তাঁর আগে শুরুতে অন্য আরেক দিন হাসপাতালে গিয়ে আরও শক্ত একটি অবস্থান তৈরী করে দিয়েছিলেন। আমাদের সৌভাগ্যবশত ঐ সময় ফেরদৌস ভাইয়ের সহপাঠি সার্জারির প্রধান প্রফেসর ডা. আনোয়ার হোসেন (এখন নাম মনে পড়েছে) আর অনুজ প্রতিম বন্ধু ছিলেন জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়ারফ হোসেন। তাছাড়া জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এর প্রতিটি স্তরের কর্মরত সেবক সেবিকা গত দুবছরে আমাদের আন্তরিক ভাবে সেবা দেয়ার চেষ্টা করে গেছেন।

আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব প্রকাশ্যে কেউ কেউ গোপনে যে সহযোগিতা করেছেন আমার জীবনে তা তাঁরা অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ পৃথিবীতে এখনও বহু ভালো মানুষ রয়েছে যাঁরা প্রচার বিমুখ। তাদের গুণগান বলে শেষ করা যাবে না। ইচ্ছা আছে এ নিয়ে এক সময় বিশদ লেখার।

আবার এমন কিছু মানুষও পেয়েছি যাঁদের মুখ দর্শন গত দুবছর পাঁচদিনে দেখাতো দূরের বিষয় বা দূর থেকে ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ এক কেজি আনার প্রেরণ না করে ঠিক দাফনের দিন অনাধিকার চর্চার ইতিহাস গড়ার বিরল নজির রেখে যেতে। এরও খোলাখুলি বর্ণনা নিয়ে প্রাসঙ্গিক একটি লেখা আমি একদিন তৈরী করবো, ইনশাল্লাহ্।

প্রিয়জন যখন চোখের সামনে চিরতরে চলে যায় তখন বৈশিষ্ট্যে মানবিক কোমল মনের মানুষগুলোর ভিতরে শূন্যতা যে হাহাকার তৈরী হয় তা সামূদ্রিক সাইক্লোনের ন্যায় দেহের সব ক`টি তন্ত্রে যন্ত্রণার বিশাল একটি মোচড় অবিরাম চলতে থাকে। এর যে বর্ণনাতীত কি কষ্ট! সেই যন্ত্রণার মোচড় প্রথমে হৃদয় ভেদ করে অতপর: দেহটিকে শত সহস্র খন্ড-বিখন্ডে বিভক্ত করে! ঠিক ঐ সময়েই প্রয়োজন পড়ে কাছের মানুষের সব রকম উদার সান্তনার বাণী কিংবা কাতর ব্যক্তিকে বুকে টেনে নিয়ে মায়া-মমতার উষ্ণ পরশ দিয়ে তাঁকে উজ্জ্বীবিত রাখার। অথচ আজ যে অভিজ্ঞতা আমি অর্জন করলাম তা যেনো এমন ঠিক ওই সময় সহ মরণের বিধান থাকলে আমি বেঁচে যাই!

মানুষ বেশিক্ষণ প্রকাশ্যে কাঁদতে পারে না। তাঁর চোখের জল অবিরাম ঝরাতে পারে না। প্রিয়জনের মৃত্যুতে ভিতরে ভিতরে যে কান্না তাঁর চলতে থাকে তা প্রকাশ করার অপরাগতায় এক সময় সে ভীষণ অসহায় হয়ে পড়ে। এর মস্তবড় বিরূপ প্রভাব তাঁর সমস্ত দেহে চাপে। আমার আজ কি হলো এক পর্যায়ে প্রচ- মাথা ধরে গেলো। চোখ জ্বালা পোড়া শুরু করে দিলো। কঠিন পিপাসা লাগতে থাকলো গেলো বার বার। একটু পর পর বোতল বোতল পানি খেতে থাকলাম। কিন্তু শুষ্কমরু সম তৃষ্ণা আমার কোনো ভাবেই যায় না। তার উপর দাফন নিয়ে যখন তাদের অনাধিকার চর্চা শুরু হলো তার যে কঠিন শাস্তি আমি ভোগ করলাম তা ভাষাতীত! যার ফল স্বরূপ শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি থাকার পরও এখনও পর্যন্ত নির্ঘুম রাত্রি পার করছি। তাই এই গভীর রাতে শোকাহত সন্তানকে বিছানায় রেখে ওঠে এসে ভাবলাম আজকের তিক্ত অভিজ্ঞতার কিছু অংশ ওগলে দেই। তাতে করে যদি আমার যন্ত্রণা কিছুটা লাঘব হয়।

এই এক অবিশ্বাস্য একটি ঘটনা, আমার স্ত্রীর মৃত্যুর ঠিক আধা ঘন্টা পর থেকে তাঁর গোসল করানোর পূর্ব পর্যন্ত আমাকে বিভিন্ন মানুষ দিয়ে একের এক বিশ্রী চাপ সৃষ্টি করানো হয় যেনো দাফন আমার নিজ জায়গায় না করি। যা কেবলই অনাধিকার চর্চাই নয় আহত স্বামীর উপর পাশবিক চাপ প্রয়োগের শামিল! এই অপকর্ম আমার সাথে একের পর এক ঘটতে থাকায় এক পর্যায়ে আমার কাছে প্রিয়জনের মৃত্যুর পাহারসম শোক ভুলে গিয়ে কঠিন ক্রোধ তৈরী হয়। আমি চরম উত্তেজিত হয়ে পড়ি। যা ছিলো খুবই দৃষ্টিকটু। নিকটে তখন লাশের গোসল পর্ব চলছে! দূর্ভাগ্য আমার আমার পরিবারেরও বয়োজ্যাষ্ঠ কয়েকজনের নিরবতা আমাকে বড় অবাক করে!

এবং শেষ মুহূর্তে সীমার বাসস্থানের বিদায় লগ্নে হয়ে উঠলাম তাঁর কাছে অপরাধী! যে ইচ্ছা আমি বিগত পনের বছর ধরে লালন করছি। মছলন্দপুরে জায়গাটি প্রাপ্তির পর থেকে, আমার এবং আমার প্রিয়জনদের কবর একই জায়গায় হতে পারে। তা নিয়ে এমন কুশ্রী দৃশ্যপট সামনে আসবে কে জানে? আমার পরদাদার কবর আমাদের বাড়ির ঠিক মধ্যখানে। মাত্র একটি কবর তা-ও বাঁধানো। সে তো প্রায় দেড়`শ বছর আগের ঘটনা। তখন মানুষ কি ধার্মিক ছিলেন না। আমার জানা মতে তিনি নতুবা তার পিতা বা পিতামহ আরব দেশ থেকে ধর্ম প্রচারে এসে এই মছলন্দপুর মসজিদে ইমামতির কাজ নিয়ে এখানেই সংসার পাতেন। কবরস্থানের বাহিরে তাঁকে দাফন বাড়ির মধ্যে যদি অনিয়মতান্ত্রিক হতো তবে ওই সময়ের সমাজ কেনো করতে দিলেন? তখন কি তারা এই বিষয়ে অজ্ঞাত ছিলেন। না কি নিয়ম রীতি কিছুই জানতেন না? দোয়া যদি কেবল গোরের কাছে গিয়ে পড়লেই কাজে দেয় তবে অধিক ক্ষেত্রে অনেকের প্রিয়জনদের জন্য দোয়া করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। যেমন যাঁরা দূর বিদেশ-প্রবাসে কর্মরত আছেন তাদের পূর্ব পুরুষদের জন্য, পরিবারের মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা কীভাবে সম্ভব?

আমি যখন দোয়া করি তখন নির্দিষ্ট কারোর জন্য দোয়া করি না পৃথিবীর তাবত মানুষের জন্য আমার হৃদয় থেকে দোয়া চলে আসে। তাতে কি খোদার নিকট একান্ত আমার প্রিয়জন যিনি দেবদারু তলায় আড়ালে আছেন তিনি বাদ পড়ে যায়?

পরিশেষে বলবো সবার নিকট বিনীত আরজি আমার স্ত্রী সামসী আরা আলীম সীমার ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিবেন। তাঁর জন্য যেনো মহান আল্লাহ্ তায়ালা বেহেস্তের সকল পথ তৈরী করে দেন। আমিন।

এটিএম জামাল- ১১/০৬/২০১৯। সোনারগাঁ ভবন, মিশনপাড়া, নারায়ণগঞ্জ

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর